গল্প

এটি একটি গল্প হয়ে উঠতে পারত...

মাহবুব রেজা
 | প্রকাশিত : ০৭ মার্চ ২০২০, ১১:২৬

তখন আমার হাতে কোনো কাজকর্ম ছিল না। একেবারে বেকার ছিলাম। আমার তখন মারাত্মক রকমের দুর্দিন যাচ্ছে। মেসের ভাড়া আর খাবার বিল জমে গেছে কয়েক মাসের। এর তার কাছ থেকে চেয়ে চিনতে চলি। মাঝে মাঝে হোটেল রেস্টুরেন্টে দু-এক দিন বদলি দিই মানে অন্যের কাজ করে দিই, তাতে খুব অসহায়ের মতো দিন চলে। দিনে দুইটার বেশি সিগারেট খেতে গেলে হিসাব করতে হয়। মিলানের সেই দিনগুলো আমার কাছে অসহনীয় রকমের বিষাদগ্রস্ত হয়ে উঠছিল। আমি তাড়া খাওয়া বন্য জন্তুর মতো মিলান শহরের এজেন্সি অফিসগুলোর দরোজায় ধরনা দিতে থাকলাম, তাতেও কিছু হচ্ছিল না। এজেন্সির লোকেরা হাসি মুখে আমার কাগজপত্র রেখে দিয়ে আশ্বাস দেয়। তাদের আশ্বাসেও আমার কাজ হয় না।

একদিন এক পরিচিত ভদ্রলোক আমাকে বললেন, মিলান শহরে কাজের আশা না করে এর বাইরে গিয়ে কাজের চেষ্টা করেন। কপাল ভালো থাকলে মিল ফ্যাক্টরিতে কাজ-বাজ পেয়েও যেতে পারেন। অনেকের তো এভাবে কাজ হচ্ছেÑ আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন।

মাস ছয়েক হয় এসেছি এই বিজন দেশে। ভাষাও নেই জানা। কাজ সারার জন্য যে ভাসা ভাসা ভাষা শিখেছি, তাতে কোনোরকমে চলে যাবে। প্রথম দিন মিলান শহরে নেমে আমার মনে হয়েছিল আমি বুঝি পুরান ঢাকা ছেড়ে আরেক পুরান ঢাকায় চলে এসেছি। পাথর দিয়ে মোড়ানো মিলান সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে বেরিয়ে কেন জানি না কী এক অজ্ঞাত কারণে প্রথম দিনই আমি এই শহরের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম। পরে প্রেমটা যখন ঘন হয়ে উঠতে শুরু করল তখন আমি বুঝতে পারলাম এর জন্য আসলে দায়ী পুরান ঢাকা। পুরান ঢাকার সঙ্গে মিলান শহরের অনেক মিল আছে।

নতুন শহর।

নতুন জায়গা।

পথঘাটও তেমন চেনা নেই।

ভরসা শুধু বাসÑ মেট্রো রুটে পৌরসভার ঝুলিয়ে নির্দেশিকা।

সাপের মতো কিলবিল করে কোথাকার পথঘাট কোথায় গিয়ে যে মিলেছে!

মিলান সেন্ট্রাল স্টেশন থেকে এক না সকাল না দুপুরের মাঝামাঝি এক সময়ে ট্রেনে উঠে পড়লাম। মিলান শহরের আকাশে তখন হাওয়ারা তালি মেরে মেরে উড়ে উড়ে ভেসে যাচ্ছিল এদিক থেকে সেদিকে। সেদিক থেকে এদিকে। ট্রেন ছুটে চলল। ট্রেনটা যখন মিলান স্টেশন থেকে বেরিয়ে পড়ল আমার তখন এই নতুন শহরের জন্য মন পুড়তে থাকল। আমি জানালার পাশে বসে হাওয়াদের দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমাকে নামতে হবে ছয় স্টেশন পরে পাদোভা শহরে। আমি সেই শহরের কিছুই চিনি না। অচেনা পথ আমাকে পথ চিনিয়ে দেবে কি না আমার জানা নেই।

দুই.

শহরের বাইরের দিকে এজেন্সিগুলোয় দোমান্দা দিলে ওরা নাকি কাজের জন্য ডাকে। ইতালিতে দোমান্দা মানে কাজের জন্য তাগাদা দেওয়া। আর আমার কাছে দোমান্দা মানে কাজের জন্য ধান্ধা করা।

যখনই কাজের জন্য এজেন্সিতে জীবন বৃত্তান্ত নিয়ে দোমান্দা দিতে গেছি তখন আমার কাছে কেন জানি বাংলা সিনেমায় কাজের সন্ধানে নায়ক কারখানায় কারখানায় ঘুরছে আর ক্লোজ শটে কারখানার সদর দরোজার ওপরে ঝোলানো নোটিশ বোর্ডে লেখা ‘কর্ম খালি নাই’ মার্কা দৃশ্যের কথা মনে পড়ে।

পাদোভা শহরের স্টেশনটা মাঝারি টাইপের। স্টেশনে নেমে একটা চায়না বারে ঢুকে সত্তর সেন্ট দিয়ে এক কাপ কাফে মাকিয়াতো খেয়ে বেরিয়ে সিগারেট ধরালাম। স্টেশনের পাশে কয়েকটা হোটেল। বার। আলিমেন্টারি। একটু দূরের হাঁটা পথে গেলাম এজেন্সিতে। আশপাশে বাড়িঘর নেই। কিছুটা দূরে কয়েকটা ম্যাড়ম্যাড়ে রঙের দোতলা তিনতলা বাড়ি, তাও পুরোনো আমলের।

এজেন্সির দরোজা দিয়ে ঢুকতেই কম বয়সী মেয়েটা মুখে হাসি ঝুলিয়ে দিয়ে বন জোরনো (তোর দিন শুভ হোক) বলে বেশ আগ্রহের সঙ্গে কাগজপত্র নিল। নিয়ে বলল, বুনো লাভোরো ( তোর কাজ শুভ হোক)...

এই মেয়ে বলে কি! ছয় মাস ধরে হাত-পা ঝাড়া বেকার আমি। আর এ আমাকে বলে কি না বুনো লাভোরো!

কাজ হোক না হোক আমি আরও দুটো এজেন্সিতে কাগজপত্র জমা দিলাম। এজেন্সি থেকে বেরিয়ে আবার ফিরতি পথে হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের দিকে ফিরে আসছি। মাথার ওপর দুপুরবেলার ঝাঁঝাল রোদ। রোদের তেজটাও বেশ অনুভূত হচ্ছে। আজ জুলাই মাসের কয় তারিখ?

হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার পাশে একটা পার্ক চোখে পড়ল। ঝিম মারা দুপুরে এরকম শুনশান পার্ক পেয়ে আমার দু’দণ্ড বসে যেতে মন চাইল। এরকম পার্ক দেখলে পৃথিবীর যে কারোরই এরকম শখ আহ্লাদ ঝিলিক দিয়ে উঠবে বলে আমার বিশ্বাস।

আমি পার্কের ভেতরে ঢুকে পড়লাম। চারদিকে সবুজ আর সবুজ। পার্কের পাশ দিয়ে ছোট্ট লেকÑসেই লেক দিয়ে ঘোলা জল কুলুকুলু রবে প্রবাহিত হচ্ছে। জলের নিচে পাথরের জঙ্গল।

আমি হাঁটতে হাঁটতে পার্কের অনেক ভেতরের দিকে চলে গেলাম। খুব একটা মানুষজন নেই। আমি পার্কের নির্জন প্রান্তরে একাকী বসে থাকা একটা সবুজ কাঠের লম্বা বেঞ্চিতে পিঠ ঠেকিয়ে বসে পড়লাম। জায়গাটা একেবারে নীরবতায় ঢাকা। গাছগাছালির ফাঁকফোকর দিয়ে আলো হাওয়া আর ছায়ারা এসে গড়িয়ে পড়ছে। আমি বেঞ্চিতে আরাম করে হেলান দিয়ে হাত-পা ছড়িয়ে বসে থাকলাম।

দুপুর যত না ক্লান্ত আমি তার চেয়ে ঢের।

চারদিকে কেউ নেই।

বিজন দেশের বিজন পার্কে দুপুরবেলায় আমি একাকী দুপুরকে সঙ্গে নিয়ে বসে থাকি।

আমার তখন দেশের কথা মনে পড়ে না।

আমার তখন পরিবারের কারো কথা মনে ধরে না।

আমার তখন পরিচিতজনদের কথা মনে পড়ে না।

এমনকি আমার নিজের কথাও মনে পড়ে না...

তিন.

আমি সেই না দুপুর না বিকেলবেলা পার্কের বেঞ্চিতে বসা থাকতে থাকতে কখন যে শুয়ে পড়েছি আর শুয়ে পড়ার পর কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি মনে পড়ে না। বিকেলের প্রথম ভাগে আমার ঘুম ভাঙল কিছু দেবশিশুর কলকাকলিতে। তারা দল বেঁধে পার্কের সবুজ ঘাস আর পাথরের বাঁধানো সরু পথে সাইকেল চালাতে চালাতে গাছগাছালিতে ছাওয়া নির্জন বেঞ্চিতে আমাকে অমন ঘুমিয়ে থাকতে দেখে নিজেদের মধ্যে কি যেন বলাবলি করছিল আর হাসাহাসি করছিল।

এরকম অসময়ে দেবশিশুদের সমবেত কোলাহলে আমার ঘুম উধাও হয়ে গেল।

আমার ঘুম ভেঙে গেলে আমি অবাক হয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে থাকি। তারাও আমাকে দেখতে থাকে।

চার.

ঘুম ভেঙে গেলে আমার খুব পানির তৃষ্ণা পায়Ñ একথা কীভাবে যেন দেবশিশুরা জেনে গিয়েছিল। নাকি আমি যে অভুক্ত এটা জেনে তারা আমার দিকে পানির বোতল দ্রুত এগিয়ে দিতে দিতে বলল,

‘সিনোরে, প্রেন্দি আকুয়া (ভদ্র মহোদয় এই যে আপনার জন্য পানি)...

আমাকে পানির বোতল দিয়ে ‘চাউ’ বলে দেবশিশুদের দল তাদের সাইকেল আর তাদের সমবেত কলকাকলি নিয়ে ক্রমশ আমার থেকে দূরবর্তী হতে থাকে।

আমার বুক ফেটে তখন পানির তৃষ্ণা যত না জেগে ওঠে তার চেয়ে বেশি জেগে ওঠে বুকের গহিনে জমে থাকা হাহাকার।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত