‘প্রণোদনার ঝুঁকি ব্যাংকের ওপর চাপিয়ে দেয়া ঠিক হবে না’

জহির রায়হান, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ২০:৩৫ | প্রকাশিত : ১৪ এপ্রিল ২০২০, ১৫:০৬

করোনাভাইরাসে অচল হয়ে পড়া অর্থনীতির ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকার তৈরি পোশাকশিল্পসহ বেশ কয়েকটি খাতে প্রণোদনার ঘোষণা দিয়েছে। সরকার ঘোষিত এসব প্রণোদনার বেশিরভাগই ব্যাংকনির্ভর। অর্থাৎ ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্কের ভিত্তিতে এ প্রণোদনা দেয়া হবে। কিন্তু এখানে ঋণ খেলাপি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। আর এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকের ওপর একতরফা ঝুঁকিটা যেন চাপিয়ে দেয়া না হয় সেজন্য সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে।

গতকাল সোমবার ঢাকা টাইমসের সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে সরকার ঘোষিত প্রণোদনার বিষয়ে এসব কথা বলেন বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ আবাসিক মিশনের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন।

সাক্ষাতকারে করোনার এই সংকটকালীন সময়ে প্রনোদনার বিভিন্ন বিষয়ে আলোকপাত করেন এই অর্থনীতিবিদ। কথা বলেন সোমবার সিপিডির প্রস্তাবনা নিয়েও। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি দুই মাস দরিদ্রদের নগদ টাকা সহায়তা দিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

জাহিদ হোসেনও বলছেন, অন্তত চার মাস নিম্ন আয়ের মানুষকে খাবার দেয়া প্রয়োজন। এছাড়া পিকেএসএফের মাধ্যমে কৃষি ঋণ বিতররন করে কৃষকদের জীবন স্বাভাবিক রাখার পরামর্শও দিচ্ছেন এই অর্থনীতিবিদ। তার মতে, কৃষকরা দ্রুত কৃষি ঋণ পেলে টাকার অভাবে কৃষকের বোরো ধান কাটতে অসুবিধা হবে না।

প্রণোদনার টাকা ঋণ হিসেবে ব্যাংকের মাধ্যমে দেয়া হবে এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংকগুলো এ ঝুঁকি কীভাবে সামলাবে জানতে চাইলে ড. জাহিদ বলেন, ‘ব্যাংকে রিফাইন্যান্সি দিতে হবে। ঋণের ঝুঁকিটা ভাগাভাগি করে নিতে হবে। ধরেন ব্যবসায়ীদের ঋণ দিতে হবে। ক্ষুদ্র মাঝারি ব্যবসায়ীদের তদারকি খরচ অনেক বেশি। নয় শতাংশ রেটে প্রাইভেট ব্যাংক তাদের নিজস্ব তহবিল থেকে এত ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় ঋণ দিতে আগ্রহী হবে কি না সেটাও দেখার বিষয়।’

সেজন্য ব্যাংক অথবা যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যে ঋণ দেয়া হবে সেখানে যদি খেলাপি হয় তাহলে সে ঝুঁকিটাও সারকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের নেয়া উচিত বলে মনে করেন তিদনি। বলেন, ‘এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে ঋণ দেয়ার আগ্রহ ওখানে খুব একটা থাকবে না। যদি না সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক এই ঝুঁকিটার দায়িত্ব নেয়।’

প্রনোদনার এত টাকা ঋণ দেয়ার জন্য ব্যাংকের কাছে পর্যাপ্ত তহবিল প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে এ বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘ব্যাংকের এই তহবিলটার ব্যবস্থাও করতে হবে। প্রাইভেট ব্যাংকের কাছে তো এখন ডিপোজিট নেই। তারা আগে যে ঋণ দিয়েছিল জুন পর্যন্ত সেটা ফেরত আসছে না। জুনের পরেও খুব একটা ফেরত আসবে না।’

‘একদিকে ডিপোজিট গ্রোথ দুর্বল। কারণ মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে নিচ্ছে। লকডাউনে বাসায় থাকলে টাকা ছাড়া মানুষ থাকতে অস্বস্থি বোধ করে। সেই অবস্থায় আর ওদের ঋণের টাকা ফেরত আসছে না। সেই ক্ষেত্রে উণের তহবিল কোথায়? আর এজন্য জন্য তো বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে রেপো বাজার থেকে এক বছরের জন্য ঋণ নিয়ে এক বছরের জন্য দিবে। সেটা তো কোনো ব্যাংকই করতে চাইবে না। কারণ ব্যাংকিং ব্যবসার সঙ্গে যায় না। সেজন্য তহবিলের ব্যবস্থা করতে হবে আর সেটা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিফাইনান্সিংয়ের মাধ্যমে করা উচিত।’

প্রনোদনার বিষয়ে সামগ্রিকভাবে এই অর্থনীতিবিদের পরামর্শ হলো- গতানুগতিক চিন্তাধারার মধ্যে দিয়ে যদি এসব তহবিল পরিচালনা করা হয় তাহলে ফলাফলগুলিও গতানুগতিক হবে। মানে যাদের পাওয়া উচিত না তারাও টাকা পাবে। যাদের প্রণোদনা আসলে পাওয়া দরকার তারা পাবে না। এর ফলে করোনা কেটে গেলেও বিপদ কাটবে না। কাজেই গতানুগতি চিন্তাধারা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

এক্ষেত্রে সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকারদের অর্থায়ন করেন। রিফাইন্যান্সিসং দেন। ঝুঁকিটা ভাগাভাগি করেন অন্তত। সব ঝুঁকি ব্যাংকারদের ওপর চাপিয়ে দিবেন না। সরকার অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকে তাদের ঝুঁকি নিতে হবে।

আর প্রণোদনার অর্থছাড়ে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় যেন না পরতে হয় সে ব্যপারে লক্ষ্য রাখার পরামর্শ দিয়ে এই অর্থনীতিবিদ আরো বলেন, ‘আর শুধু আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর না করে পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসেফ) মতো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ দেওয়া যায়। এনজিওদের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে একত্রে কাজ করা যায়। কারন এখানে স্পিড অব রেসপন্স আর টার্গেটিং দুটোই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে দীর্ঘসূত্রিতার কোনো সুযোগ নেই।’

‘অন্তত চার মাস দরিদ্রদের নগদ সহায়তা দেয়া হোক’

দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ১ কোটি ৯০ লাখ পরিবারকে প্রতি মাসে আট হাজার টাকা করে দুই মাস প্রণোদনা দেওয়ার সুপারিশ করেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)।

এটি অবশ্যই করা উচিৎ মন্তব্য করে জাহিদ হোসেন বলেন, ‘এখানে প্রায় দুই কোটি পরিবারের কথা বলা হয়েছে। তাহেল প্রতি পরিবারে চারজন হলে আট কোটি জনগন আওতায় চলে আসে। তবে এ টাকা শুধু দুই মাস না। তবে আমি মনে করি এটা চার মাস দেওয়া উচিত।’

‘এখানে মানবতার বিষয় আছে। তবে এটা শুধু যে দরিদ্র জনগোষ্ঠিকে সহায়তা দিচ্ছেন মানবতার খাতিরে সহায়তা দিচ্ছেন তা নয়। যেটা গুরুত্বপূর্ণ যে আপনি করোনা সংক্রমণ রোধের জন্য যে কার্যক্রমগুলো হাতে নিয়েছেন- লকডাইন, সেফটি, এগুলোর সুফল আমরা পাবো না যদি যারা প্রধান ঝুঁকির সম্মুখিন তাদের সবাইকে আমরা সহায়তা দিতে না পারি।’

এ বিষয়ে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘খাবারের অভাবে কেউ যেন কষ্ট না করে সেদিকে সরকাররের নজর দিতে হবে আগে। এর মধ্যে যদি ক্ষুদ্র অংশও বাদ পরে যায় আর তারা যদি রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হয় তাহলে তো বিপদ। কারণ ক্ষুধার জ্বালায় মানুষতো আর করোনার ঝুঁকিকে ডরাবে না।

ড. জাহিদ হোসেন বলেন ‘আমার মতে ৪ থেকে ৫ কোটি মানুষ একেবারে হতদরিদ্র অথবা ক্ষুধার ঝুঁকিতে আছে। তাই এখানে চার মাস দিতে হবে টাকা। জুন মাসে বাজেট । এই বাজেটের বাকি আছে তিন মাস। তাই একবারে কর্মসূচি নেয়াই ভালো। কারণ এখন তো আশা করতে পারি না জুনের মধ্যে এই সংকট কেটে যাবে। তাই এক সঙ্গে এখই চার মাসেরটার জন্য প্রস্তাবনা করা। প্রতিমাসে আটহাজার করে চার মাস দেয়া হবে দরিদ্র মানুষকে। যদি ৪ কোটি মানুষকে চার মাসের জন্য দেয়া হয় তাহলে জিডিপির মাত্র এক দশমিক দুই শতাংশ লাগবে। এটা আরও বাড়ানো যেতে পারে ডিজিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ যদি করা হয় তাহলে হয়তো ১০ কোটি মানুষকে দেয়া যাবে।

প্রান্তিক কৃষকের হাতে ৫ হাজার কোটি টাকার প্রনোদনার তুলে দেয়াকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন ড. জাহিদ হোসেন। তিনি বলেন, ‘এটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক কৃষক করোনার কারনে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আর সামনে হওয়ার ঝুঁকিও আছে। বড় কথা হলো বোরোধানের যারা চাষি তাদের প্রয়োজনটাতো ইমিডিয়েট। কৃষকদের যে সংখ্যা আছে সেখানে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি কিছু নয়। আমার মনে হয় ইমিডিয়েট যে টার্গেট কারা উচিত বোরোধান কাটার জন্য যে অর্থের প্রয়োজন সেখানে।’

কারণ এখানে শ্রমিক পাচ্ছে না। মাইগ্রেশন যেহেতু সম্ভব হচ্ছে না। হাওর অঞ্চল থেকে তো শুরু করতে হবে ধান কাটা। পত্রিকায় দেখেছি ওরা শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে । তারা বলেছে শ্রমিক খুঁজে পাচ্ছে না। অনেকে শ্রমিক যেতে চাচ্ছে না। যেতে চাইলেও তাদের কীভাবে নিয়ে যাওয়া হবে স্বাস্থ্য ঝুঁকি না নিয়ে সেইটা এখও ঠিক করতে পারেনি। সেখানে কৃষকে যন্ত্রপাতি দিয়েই কাটতে হবে। সেই যন্ত্রপাতি ভারা করা অথবা কেনা সেটার সেটার জন্যতো তাদের অর্থের প্রয়োজন আছে। সেই অর্থ যাতে ঠিক সময় পৌছায়। বোরোধান কাটার জন্য দ্রুত তাদের আগামী সপ্তাহের জন্য ব্যবস্থা করে দিতে হবে। বোরো ধানটা যদি মাঠে পরে থাকে তাহলে হাওল অঞ্চল গুলো বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর অন্যান্য অঞ্চলে মাঠে এমনিই পরে থাকবে। নষ্ঠ হয়ে যাবে।’

সেজন্য আগে দেশের খাদ্য নিরাপত্ত নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ জানিয়ে এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘কেননা আন্তর্জাতিকভাবে একটা খাদ্য সংকট হতে পারে। আর সেসময় আমাদের জাতীয় খাদ্য মজুটা যেন যথেষ্ট থাকে। বিশেষ করে চালের মজুদ। বোরোতো আমাদের সবচেয়ে বড় চাল। সেজন্য বোরো ধানটা কাটা যাতে ঠিক মতো করা যায়, কোনো অর্থিক সংকটের কারনে কৃষক যাতে ধানকাটার অসুবিধায় না পড়েন সেটা নিশ্চিত করতে হবে।’

কৃষকদের ঋণের বিষয়ে ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘আমার তো প্রেফারেন্স হবে কৃষি ঋণ পিকেএসেফের মাধ্যমে দেয়া উচিত। কারণ এগুলোতো চিহ্নিত করতে হবে। প্রান্তিক চাষিকে তো চিনতে হবে। আর দ্বিতীয় হলো ঝুঁকিটা কে নিবে। এখানে তো অনেক ক্ষেলাপি হবে। তখন ক্ষেলাপি হলে আপনি যদি কৃষি ব্যাংকের মাধ্যমে করেন তখন ঝুঁকিটা কৃষি ব্যাংকের ওপর দিয়ে দেন তাহলে কেমন হবে? কৃষি ব্যাংকের এমনিতেই আর্থিক অবস্থা ভালো না। পিকেএসএফফের বেলায়ও একই কথা বলা যায়। তারা কেমনে ৫ হাজার কোটি টাকার ঝুঁকি বইবে? সোজা কথা এখানে সরকারি একটা গ্যারান্টি থাকতে হবে অথবা বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টি থাকতে হবে।

(ঢাকাটাইমস/১৪এপ্রিল/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

অর্থনীতি এর সর্বশেষ

এই বিভাগের সব খবর

শিরোনাম :