একজন রাশেদ মাকসুদ ও পুঁজিবাজারের ভয়াবহ প্রতিক্রিয়া

সোমবারের ঘটনা। একটি অনলাইন সংবাদে সংবাদ প্রকাশিত হলো যে, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। এই সংবাদে দেশের দুই শেয়ারবাজারে লাফিয়ে ওঠে সূচক। ঢাকার বাজারে সূচক বাড়ে শত পয়েন্ট। পরদিন অর্থাৎ আজ মঙ্গলবার বিএসইসি চেয়ারম্যান সাংবাদিকদের জানান, খবরটি সত্য নয়। তিনি পদত্যাগ করছেন না এবং পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্বে থাকবেন। এই খবরে বাজারে সূচক পড়ে আগের দিনের দ্বিগুণ- দুই শতাধিক পয়েন্ট।
দুই দিনের ঘটনায় একটি বিষয় স্পষ্ট করে সামনে আসে। একজন ব্যক্তির পুঁজিবাজারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকা-না থাকার খবরও এখন এর ভবিষ্যতের বিরাট অনুঘটক। আবারও প্রমাণ হলো— এই বাজারের সবচেয়ে বড় সংকট সূচকের ওঠানামা নয়, আস্থার সংকট। দীর্ঘদিন ধরেই এ কথা ঘুরছে বাজারে।
কোনো নিয়ন্ত্রকের কার্যকারিতা বোঝার একটি সহজ উপায় আছে—বাজারের প্রতিক্রিয়া। রাশেদ মাকসুদের অপসারণের সম্ভাবনার খবরে সূচকের উল্লম্ফন এবং তার থাকার ঘোষণায় বড় পতন—এটি নিছক কাকতালীয় বলা কঠিন। এটি আস্থার ভোট। একজন চেয়ারম্যানের প্রতি যদি বাজারের বড় অংশের এমন অনাস্থা তৈরি হয়, তবে তিনি আইনগতভাবে দায়িত্বে থাকলেও নৈতিকভাবে প্রশ্নের মুখে পড়েন। নিয়ন্ত্রকের সবচেয়ে বড় শক্তি আইনি ক্ষমতা নয়, আস্থা। সেই আস্থা যখন ক্ষয়ে যায়, তখন পদে টিকে থাকা প্রতিষ্ঠানকেই দুর্বল করে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা কানাঘুষা করছেন, একজন নিয়ন্ত্রক প্রধানের অবস্থান যদি এমন হয় যে তার থাকা-না থাকা নিয়ে বাজারের এমন তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়, তবে তিনি কতটা কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারছেন?
পুঁজিবাজার কেবল শেয়ার কেনাবেচার জায়গা নয়; এটি অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নের প্রধান প্ল্যাটফর্ম। শিল্পায়ন, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা সৃষ্টি—সবকিছুর সঙ্গে এর নিবিড় সম্পর্ক। অথচ গত দেড় দশকে বাজার বারবার ধাক্কা খেয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি, কারসাজির অভিযোগ এবং জবাবদিহির ঘাটতি বাজারকে বারবার বিপর্যস্ত করেছে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। প্রত্যাশা ছিল— সংস্কার হবে, দায় নির্ধারণ হবে এবং বাজারে স্বচ্ছতা ফিরবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কাঠামোগত পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং সূচক কমেছে, লেনদেন কমেছে, নতুন বিনিয়োগ কমেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—আস্থা আরও কমেছে।
এই বাস্তবতায় নিয়ন্ত্রক সংস্থার প্রধান হিসেবে রাশেদ মাকসুদের দায়িত্ব অনস্বীকার্য। বাজার সংস্কারের জন্য প্রয়োজন সুস্পষ্ট রোডম্যাপ, অংশীজনদের সঙ্গে নিয়মিত সংলাপ এবং বাস্তবভিত্তিক নীতি প্রয়োগ। কিন্তু বাজারসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ—এসব ক্ষেত্রে কমিশন দৃশ্যমান নেতৃত্ব দিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘ সময়েও নতুন ও মানসম্মত আইপিও বাজারে আসেনি—যা একটি সক্রিয় পুঁজিবাজারের জন্য অপরিহার্য। নতুন কোম্পানি না এলে বাজারের গভীরতা বাড়ে না, বিনিয়োগের বিকল্প তৈরি হয় না, লেনদেনও গতিশীল হয় না। এই স্থবিরতার দায় এড়ানো যায় না।
রাশেদ মাকসুদ কমিশনের আমলে বড় অঙ্কের জরিমানার সিদ্ধান্ত আলোচিত হয়েছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থার শাস্তি দেওয়ার এখতিয়ার অবশ্যই আছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—শাস্তি কি আস্থা পুনর্গঠনের সঙ্গে সমন্বিত ছিল? বাজারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে যদি ভীতি তৈরি হয়, তাহলে উদ্যোক্তারা বাজারে আসতে নিরুৎসাহিত হন। বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত হন। নিয়ন্ত্রকের প্রতি আস্থার বদলে ভয় জন্মায়। একটি সুস্থ পুঁজিবাজার ভয় দিয়ে নয়, স্বচ্ছতা ও পূর্বানুমানযোগ্য নীতির মাধ্যমে টিকে থাকে।
এ কথা সত্য, পুঁজিবাজারের সংকট বহু বছরের। একদিনে তৈরি হয়নি, একদিনে শেষও হবে না। কিন্তু একটি সময় আসে যখন ইতিবাচক ও কার্যকরী নেতৃত্বের ভূমিকা সংকট উত্তরণে প্রয়োজন হয়ে পড়ে। শুধু ব্যবস্থার কথা বলে ব্যক্তিগত দায় এড়িয়ে যাওয়া যায় না। রাশেদ মাকসুদের নেতৃত্বে বাজারে দৃশ্যমান আস্থা ফেরেনি—এটি এখন স্পষ্ট বাস্তবতা। বিনিয়োগকারীদের বড় অংশ হতাশ। ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের আর্থিক ক্ষতি সামাজিক উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের তরফে বাজারে একটি শক্ত বার্তা দেওয়া প্রয়োজন যে, বর্তমান কমিশন ব্যর্থতার দায় স্বীকার করছে। নতুন নেতৃত্ব এবং নতুন রোডম্যাপ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের সুযোগ দরকার। অতীতের সিদ্ধান্ত ও বিতর্ক নিয়ে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করা দরকার।
বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কমিশন নিয়ে যে নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছে, তা কাটাতে প্রতীকী ও বাস্তব—দুই ধরনের পরিবর্তনই দরকার। অনেকে বলবেন—ব্যক্তি নয়, ব্যবস্থা বদলাতে হবে। কথাটি ঠিক। কিন্তু ব্যবস্থা বদলানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় নেতৃত্ব পরিবর্তনের মাধ্যমে। যখন নেতৃত্ব নিজেই আস্থার সংকটে, তখন তাকে দিয়ে সংস্কার সম্ভব নয়।
পুঁজিবাজার কোনো ব্যক্তির পদাধিকার রক্ষার জায়গা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির স্পন্দন। একজন ব্যর্থ হলে নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে স্পন্দন সচল রাখতে হয়। এ বিষয়ে নতুন সরকার নিশ্চয়ই ভাবছে বলে আমলা আশা করি।
এ ক্ষেত্রে একটি মতামত থাকবে। চেয়ারম্যান নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, পেশাগত দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নৈতিকতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কমিশনকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদারকি প্রয়োজন। আইপিও বাজার সক্রিয় করা, বাজার কারসাজি প্রতিরোধ, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বিনিয়োগকারীদের আর্থিক শিক্ষা—সবকিছু একসঙ্গে এগোতে হবে।
পুঁজিবাজারের বর্তমান অবস্থার দায় ইতিহাসের ওপর চাপিয়ে দিয়ে লাভ নেই। নেতৃত্বের ব্যর্থতা থাকলে তা স্বীকার করতে হয়। বাজারের ভাষা পরিষ্কার—আস্থা ফেরেনি। ব্যক্তি নয়, বাজার বড়—এই বোধ থেকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। গত দুই দিনে পুঁজবাজারের প্রতিক্রিয়া মোটেই ভালো লক্ষণ নয়।
লেখক: সংবাদকর্মী।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































