যেভাবে সরকারি জমি বন্ধক রেখে ১৫ কোটি ঋণ নেন ফারুক

সরকারি জমি বন্ধক রেখে একটি সু্প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকের অসাদু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দুই দফায় ১৫ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছেন প্রতারক মো. গোলাম ফারুক। গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর উত্তরা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় তার এক সহযোগী ফিরোজ আল মামুন ওরফে ফিরোজকে গ্রেপ্তার করে র্যাব।
শুক্রবার দুপুরে কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান, আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
তিনি বলেন, সম্প্রতি বাড্ডা থানাধীন মেরুল বাড্ডা এলাকায় জাল দলিল সংক্রান্ত বিরোধের জেরে একটি হত্যা চেষ্টার ঘটনা ঘটে। যেখানে ভিকটিমকে নিজ জমি থেকে জোরপূর্বক উৎখাত করার উদ্দেশ্যে প্রতারক গোলাম ফারুক ও তার প্রধান সহযোগী ফিরোজ আল মামুনসহ অন্যারা গত ২৬ মার্চ ও ৬ এপ্রিল হত্যার উদ্দেশ্যে হামলা করে। ওই ঘটনায় ভিকটিম আদালতে একটি নালিশী দরখাস্ত করে। আদালত বিষয়টি আমলে নিয়ে রাজধানীর বাড্ডা থানাকে এফআইআর হিসেবে এটিকে গণ্য করার আদেশ দেন। এ বিষয়ে বাড্ডা থানায় একটি মামলা হয়। র্যাব ওই ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে গোয়েন্দা নজরদারী বৃদ্ধি করে।
বৃহস্পতিবার রাতে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাতকারী এবং হত্যা চেষ্টা মামলার প্রধান আসামী গোলাম ফারুক ও ফিরোজ আল মামুনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা রাজধানীর বাড্ডায় হত্যাচেষ্টা, চাদাবাজি, প্রতারণা, জালিয়াতি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের সাথে জড়িত বলে তথ্য দেয়। মহাসড়কের জমি ব্যাংকে বন্ধক রেখে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর তথ্যও দিয়েছে তারা।
মামলার বাদী যা বলছেন: মামলার বাদী ও ভুক্তভোগী জামির আলী বলেন, আমার উত্তরার ২৭ শতাংশ জমি গ্রেপ্তার ফারুক দখল করার জন্য পাঁয়তারা করে আসছিল। তাদের কাছে ওই জমির কোন দাগ খতিয়ান নেই। ওই জায়গা বন্ধক দিয়ে সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংকের প্রধান শাখা থেকে ১৫ কোটি টাকা লোন নিয়েছে। যা আমার অনুপস্থিতিতে আমার উপর দায় চাপানোর চেষ্টা করেছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশকে অভিযোগ করলে তারা ব্যবস্থা নেয়নি। অভিযুক্তরা নকল দলিল থানায় দেখিয়েছে। তবে আদালত তাদের দলিল বা জমি ক্রয় খারিজ করে দেয়। তারপর গোলাম ফারুক আমাকে হুমকি দিয়ে বলে, 'আমার সঙ্গে পারবেন না। হয় এককোটি টাকা দেন না হয় জমির মায়া ছেড়ে দেন।'
মহাসড়ক বন্ধক ও ঋণ: ২০২১ সালের এপ্রিলে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে মহাসড়কের জমি ব্যক্তি নামে নিবন্ধন, বিক্রয়, ব্যাংকে বন্ধক ও ব্যাংক কর্তৃক নিলামে বিক্রি চেষ্টার ঘটনায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে আসে। ওই ঘটনায় ভূমি মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্তে একটি প্রতারক চক্র মহাসড়ক শ্রেনীভুক্ত সরকারি জমি কয়েকটি সরকারি অফিসের কতিপয় অসাধু কর্মচারীর যোগসাজশে সরকারি ভূমি ব্যক্তি মালিকানায় নিবন্ধন করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে নেয়। যদিও এসব জমি সড়ক ও জনপদ অধিদপ্তর কর্তৃক অধিগ্রহণ করা।
গাড়ী আমদানি ব্যবসা করতে গিয়ে প্রতারণা শুরু : জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার গোলাম ফারুক জানান, তিনি ২০০০ সাল থেকে গাড়ি আমদানিকারক হিসেবে তার ব্যবসা শুরু করে। একটি বেসরকারি ব্যাংকে কোন বন্ধকি সম্পত্তি ছাড়া এলসি আবেদন করে গাড়ি আমদানি শুরু করেন। বিদেশি ব্যাংকের টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা থাকায় বেসরকারি ব্যাংকটি আমদানিকৃত গাড়ি বিক্রি করে ব্যাংকের অর্থ পরিশোধ করার শর্তে তাকে ৭ কোটি টাকা ডিম্যান্ড লোন দেয়। কিন্তু ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করায় ব্যাংক তাকে সম্পত্তি বন্ধক দেয়ার জন্য চাপ প্রয়োগ করলে তিনি সরকারি জমিকে অসদুপায়ে ব্যক্তি নামে নিবন্ধন করার পরিকল্পনা করেন।
অধিগ্রহণ পূর্ব জমির মালিককে খুঁজে নামমাত্র মূল্যে ক্রয় : ১৯৪৮ সালে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের উত্তরার আজমপুর অংশের অধিগ্রহণ হওয়ার পূর্বের জমির মালিকের ছেলেকে খুঁজে বের করেন। জালিয়াতির সাহায্যে তিনি ২০০৬ সালে মিথ্যা তথ্য দিয়ে একটি ভূয়া দলিল তৈরি করেন। পরবর্তীতে ওই দলিলমূলে তৎকালীন মালিকের ছেলের নিকট থেকে গ্রেপ্তার গোলাম ফারুক তার স্ত্রীর নামে ২০১০ সালে মাত্র ৩০ হাজার টাকায় ক্রয় করে আরেকটি দলিল তৈরি করেন। একই বছরে তার স্ত্রী হতে ওই জমি নিজের নামে দলিল করে নেন। যার সাফ কবলা দলিল নম্বর ৮৮৮০।
মহাসড়কের জমি নিজের দেখিয়ে ব্যাংক লোন: জালিয়াতির মাধ্যমে দলিল ও মহাসড়কের জমিকে নিজের বলে জমি দেখিয়ে সোস্যাল ইসলামি ব্যাংকে বন্ধক দেখান। এজন্য তিনি আরও ১৫ কোটি টাকা ব্যাংক ঋণ নেন। কিন্তু ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ না করায় ২০১৩ সালে ব্যাংক অর্থ আদায়ের উদ্দেশ্যে বন্ধকি জমি নিলামে বিক্রয় করার নোটিশ জারি করলে ব্যাংক সরেজমিনে গিয়ে দেখতে পায় যে ঐ জমিটি সরকারি সম্পত্তি।
পরবর্তীতে তিনি ভুল সংশোধন দলিল করে পূর্বের বন্ধককৃত জমির দাগ নম্বর পরিবর্তন করে মামলার বাদীর ও ভুক্তভোগী জামির আলীর জমির দাগ নম্বর উল্লেখ করেন। তখন ব্যাংক সেই জমিতে বন্ধকি সম্পত্তির সাইনবোর্ড স্থাপন করতে গিয়ে জানা যায় সেটিও ভূয়া।
কমান্ডার মঈন বলেন, গ্রেপ্তার গোলাম ফারুকের বিরুদ্ধে জমি জমা সংক্রান্ত, প্রতারণা, হত্যা চেষ্টা, এনআই এ্যাক্ট, জালিয়াতির অপরাধে রাজউক কর্তৃক একটি, বেসরকারি ব্যাংক কর্তৃপক্ষের চারটি ও পাবলিক বাদী হয়ে ৩টিসহ মোট ৮টি মামলা রয়েছে।
গ্রেপ্তার ফিরোজ আল মামুন গোলাম ফারুকের সকল অপকর্মের অন্যতম সহযোগী। তিনি উত্তরা এলাকায় বিভিন্ন অপরাধ বিস্তারে কিশোর গ্যাং এর পৃষ্ঠপোষকতা করে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
ঢাকাটাইমস/১৫এপ্রিল/আরকেএইচ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
মন্তব্য করুন













































