দেশে দেশে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ, যেভাবে সতর্ক থাকবেন

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:২৮
অ- অ+

দেশে দেশে প্রাণঘাতী নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রতিবেশী দেশ ভারতে সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর এশিয়ার বিভিন্ন দেশে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়ে যাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বাড়তি সতর্কতার আহ্বান জানিয়েছেন।

নিপাহ ভাইরাস একটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রাণঘাতী রোগ। এটি সরাসরি মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) সৃষ্টি করতে পারে অথবা শ্বাসতন্ত্রকে মারাত্মকভাবে আক্রান্ত করে। এ ভাইরাসের কোনো সুনির্দিষ্ট চিকিৎসা, কার্যকর টিকা কিংবা নির্দিষ্ট ওষুধ এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। আক্রান্তদের ক্ষেত্রে কেবল উপসর্গ অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া হয়।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নিপাহ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উদ্বেগ ছড়িয়ে দিয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পশ্চিমবঙ্গ থেকে ফ্লাইট পরিচালিত হয়—এমন তিনটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যাত্রীদের স্বাস্থ্য স্ক্রিনিং শুরু করেছে থাইল্যান্ড। একই সঙ্গে নেপাল কাঠমান্ডু বিমানবন্দর এবং ভারতের সঙ্গে সংযুক্ত স্থল সীমান্তগুলোতে আগত যাত্রীদের স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার করেছে।

চলতি মাসের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গে পাঁচজন স্বাস্থ্যকর্মী নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হন, যাদের মধ্যে একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে। আক্রান্তদের সংস্পর্শে আসা অন্তত ১১০ জনকে কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণী থেকে মানুষের মধ্যে ছড়াতে সক্ষম এই ভাইরাসে মৃত্যুহার ৪০ থেকে ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।

বাংলাদেশে নিপাহ ভাইরাস নতুন করে বড় ধরনের উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, ২০০১ সাল থেকে এখন পর্যন্ত দেশে নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন ৩৪৭ জন। এর মধ্যে ২৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। শুধু ২০২৪ সালে এ ভাইরাসে পাঁচজন এবং ২০২৫ সালে আরও চারজন মারা যান। অর্থাৎ সর্বশেষ দুই বছরে আক্রান্ত হওয়া নয়জনের প্রত্যেকেরই মৃত্যু হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী নিপাহ ভাইরাসে গড় মৃত্যুহার প্রায় ৭২ শতাংশ হলেও বাংলাদেশে সাম্প্রতিক চিত্র আরও ভয়াবহ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। বর্তমানে দেশের অর্ধেকের বেশি জেলায় নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গত ২৫ বছরে অন্তত ৩৫টি জেলায় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে। এর মধ্যে ফরিদপুর, রাজবাড়ী, নওগাঁ ও লালমনিরহাট জেলায় আক্রান্তের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিপাহ ভাইরাস এখন আর শুধু শীতকাল বা কাঁচা খেজুরের রসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। এটি সারা বছরই এবং বিভিন্ন ফলের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে। বাদুড়ের খাওয়া বা লালা-মলমূত্রে দূষিত ফল ও রস পান করলে সংক্রমণ ঘটতে পারে। এ ছাড়া রুগ্ন শূকর এবং সংক্রমিত মানুষ বা পশুর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমেও ভাইরাসটি ছড়ায়।

নিপাহ ভাইরাস প্রথম শনাক্ত হয় ১৯৯৯ সালে মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে। মালয়েশিয়ার সুঙ্গাই নিপাহ নামক একটি গ্রামের নামানুসারে রোগটির নামকরণ করা হয়। সে সময় সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে লাখ লাখ শূকর নিধন করা হয়েছিল।

সংক্রমণের সাধারণত ৪ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে লক্ষণ প্রকাশ পায়। প্রাথমিকভাবে তীব্র জ্বর, মাথাব্যথা, পেশিতে ব্যথা, বমিভাব, গলাব্যথা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। রোগ মারাত্মক হলে মস্তিষ্কে প্রদাহ সৃষ্টি হয়ে মাথা ঘোরা, অজ্ঞান হওয়া কিংবা খিঁচুনি দেখা দেয়। যারা সুস্থ হন, তাদের অনেকের মধ্যেই পরবর্তীতে দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

প্রতিরোধের বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, কোনোভাবেই কাঁচা খেজুরের রস পান করা যাবে না। প্রয়োজনে রস ফুটিয়ে খেতে হবে। ফল খাওয়ার আগে ভালোভাবে ধুয়ে খোসা ছাড়িয়ে খেতে হবে এবং বাদুড় বা পাখির আধখাওয়া ফল এড়িয়ে চলতে হবে। নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া এবং সংক্রমিত ব্যক্তির সেবা করার সময় মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

করোনাভাইরাসের ধকল থেকে দেশ পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়লে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, এই মুহূর্তে জনসচেতনতা বৃদ্ধি, কাঁচা খেজুরের রস পান থেকে বিরত থাকা এবং সন্দেহজনক উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যোগাযোগ করাই নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

(ঢাকাটাইমস/২৯ জানুয়ারি/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সিগারেট খাওয়াকে কেন্দ্র করে পূজামণ্ডপে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষ, আটক ৭
ভারতের সঙ্গে সংলাপ: হাসিনাসহ হাদির খুনিদের ফেরত চাইবে বাংলাদেশ
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে ডিএমপির বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিটের মহড়া
অফিসার্স ক্লাব থেকে সাবেক অতিরিক্ত সচিবের রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার