১৪ ফেব্রুয়ারি কেন ভালোবাসা দিবস, জানুন এর পেছনের রক্তাক্ত অধ্যায়

শীতের শেষে যখন বাতাসে বসন্তের হালকা ছোঁয়া মিশে আসে, তখন ভ্যালেন্টাইনস ডে নেমে আসে মানুষের মনে বিশেষ রঙ ছড়িয়ে দিতে। এই সময়ে বিশ্বজুড়ে মানুষ ভালোবাসা উদযাপনে মেতে ওঠে। তবে ভালোবাসা শুধুই এক দিনের বিষয় নয়; এটি প্রতিদিনের অকৃত্রিম অনুভূতি, যা জীবনের সুখ ও সম্পর্কের স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে।
ভালোবাসা হলো মনের গভীর অনুভূতি। এটি মায়ের মমতা, সঙ্গীর প্রীতি বা এমনকি খাবারের প্রতি আকর্ষণ—ভিন্ন ভিন্ন রূপে প্রকাশ পেতে পারে। বিশেষ কোনো মানুষের জন্য মনের গভীর স্নেহের বহিঃপ্রকাশই হলো ভালোবাসা। মানুষ যখন ভালোবাসে, তখন তার মনের ভাব প্রকাশ করা জরুরি। মনের কথা প্রকাশ না করলে ভালোবাসা মনের মধ্যে আটকে থাকে এবং সম্পর্কের সম্ভাবনা সীমিত হয়।
ভালোবাসা উদযাপনকে শুধুমাত্র ফেব্রুয়ারির ১৪ তারিখে সীমাবদ্ধ রাখার প্রয়োজন নেই। নতুন যুগলরা প্রায় ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকেই নিজেদের মধ্যে ভালোবাসা উদযাপন শুরু করে। গোলাপ, চকোলেট, টেডি বিয়ার, এবং সঙ্গীর প্রতি অঙ্গীকার—ধাপে ধাপে এগুলো সম্পর্ককে গভীরতা দেয়।
ভালোবাসা প্রকাশের কিছু কার্যকর কৌশল:
বন্ধুত্ব তৈরি করুন: প্রথম ধাপে বন্ধুত্ব গড়ে তুলুন, এতে মনের কথা সহজে বলা যায়।
সঙ্গীর মনের খবর রাখুন: সময়মতো পাশে থাকা ও সঠিক সময়ে অনুভূতি জানানো সম্পর্ককে শক্তিশালী করে।
প্রশংসা করুন: সঙ্গীর ইতিবাচক দিকগুলো প্রশংসা করলে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পায়।
একসাথে সময় কাটান: বাইরে বেড়ানো, খাবার খাওয়া, আনন্দময় মুহূর্ত ভাগ করা সম্পর্ককে গভীর করে।
লাভ ইমোজি বা ছোট সংকেত ব্যবহার করুন: ধীরে ধীরে মনের বার্তা পৌঁছানো সহজ হয়।
নিজের ব্যক্তিত্ব বজায় রাখুন: বাড়াবাড়ি না করে স্বাভাবিক আচরণ ও সামর্থ্যের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিন।
বিজ্ঞান বলছে, ভালোবাসার জৈবিক ভিত্তি কামনা, আকর্ষণ ও সংযুক্তিতে। কামনা হলো যৌন বাসনার ধাপ, আকর্ষণ হলো নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রতি অনুভূতি, আর সংযুক্তি হলো সম্পর্ককে দীর্ঘস্থায়ী রাখার বন্ধন। দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্কের ক্ষেত্রে অক্সিটোসিন ও ভ্যাসোপ্রেসিনের মতো হরমোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
ইতিহাসের পাতায় ফিরে গেলে দেখা যায়, সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগের স্মরণে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ভ্যালেন্টাইনস ডে। তিনি রোম সম্রাটের আদেশ অমান্য করে প্রেম ও বিবাহের স্বাধীনতা প্রচারের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন। সেই আত্মত্যাগই আজকের দিনে প্রেমিক যুগলদের উদযাপনের প্রেরণা।
তবে ১৪ ফেব্রুয়ারিই কেন ভালোবাসা দিবস? ভালোবাসার সঙ্গে ভ্যালেন্টাইনের সম্পর্কই বা কী? ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যাবে রক্তাক্ত এক ইতিহাস বহন করছে ভ্যালেন্টাইনস ডে দিনটি। ভ্যালেন্টাইনস ডের সূচনা হয় প্রায় ১৭শ বছর আগে পৌত্তলিক রোমকদের মাঝে প্রচলিত ‘আধ্যাত্মিক ভালোবাসা’র মধ্য দিয়ে। ২৬৯ সালে ইতালির রোম নগরীতে সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নামে একজন খ্রিস্টান পাদ্রী ও চিকিৎসক বসবাস করতেন। আর সেই সময় রোমে নিষিদ্ধ ছিল খ্রিস্ট ধর্মের প্রচার। রাজার আদেশ অমান্য করেই খ্রিস্ট ধর্ম প্রচারের কাজে নামেন সেন্ট ভ্যালেন্টাইন।
কিন্তু রোমের সিংহাসনে বসা সম্রাট ক্লডিয়াস তা মেনে নিতে পারেননি। ক্লডিয়াস বিশ্বাস করতেন যে, প্রেম, বিয়ে ইত্যাদি করলে পুরুষের শক্তি এবং বুদ্ধি কমে যায়। তার কর্মচারি কিংবা সৈন্য সকলেরই নিষেধ ছিল বিয়ে কিংবা সম্পর্কে জড়ানো। সেই সময়ের রোমে খ্রিস্টধর্মের প্রচারও নিষিদ্ধ করেন সম্রাট। কিন্তু নিয়মের রাজত্বে কেউ কেউ থাকেন নিয়ম ভাঙার জন্যই। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন রাজার এই আদেশের বিরোধিতা করলেন সোচ্চারে। স্বভাবতই রাজদ্রোহের দায়ে কারাবন্দি হলেন ক্লডিয়াস। কিন্তু বন্দি জীবনেও মানুষের সেবা তাকে ফের জনপ্রিয় করে তুলল। কারাগারে থাকাকালীন এক মহিলাকে চিকিৎসা করে তাঁর দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে দেন পেশায় ডাক্তার ভ্যালেন্টাইন। ফের রাজার রোষানলে পড়েন তিনি। ফলে ১৪ ফেব্রুয়ারি তাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেন নির্দয় সম্রাট ক্লডিয়াস। সেই সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের স্মরণেই আজ বিশ্বজুড়ে পালিত হয় 'ভ্যালেন্টাইনস ডে'।
তবে ভ্যালেন্টাইনস ডে উদযাপনের শুরু ইউরোপ থেকেই। লুপারকেলিয়া নামে এক আঞ্চলিক উৎসবের প্রচলন ছিল রোমে। এটি ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪-১৫ তারিখ নাগাদ অনুষ্ঠিত হত৷ লুপারকেলিয়া উৎসবটিকে বসন্তের আগমন হিসেবেই ধরা হত ৷ এই অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে একটি বক্স থেকে কোনও ছেলে বা মেয়েকে একটি নাম লেখা কাগজ তুলতে হত ৷ এই ভাবেই একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতেন ছেলে-মেয়ের দল। এমনকি তারা বিয়েও করতেন ৷ কালক্রমে এই উৎসব আর সেন্ট ভ্যালেন্টাইনের আত্মত্যাগ মিলেমিশে আজকের ভ্যালেন্টাইনস ডে’র রূপ পেয়েছে। তবে ভালোবাসা হোক প্রতিদিনের, অকৃত্রিম ও নি:স্বার্থ। বেঁচে থাকুক যুগ যুগ ধরে নি:স্বার্থ ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য বন্ধনে।
তবে, ভালোবাসা শুধুই একদিনের আয়োজন নয়। ভালোবাসা হোক প্রতিদিনের, অকৃত্রিম ও নিঃস্বার্থ। যুগ যুগ ধরে বেঁচে থাকুক সেই ভালোবাসার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন।
(ঢাকাটাইমস/১৪ ফেব্রুয়ারি/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































