ঢাকায় ভূমিকম্প আতঙ্ক, উচ্চঝুঁকিতে ৫৬ শতাংশ ভবন

রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ঘন ঘন ভূমিকম্পের ঘটনায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার চারপাশে সক্রিয় ভূমিকম্প বলয় গড়ে উঠেছে, যেখানে মাঝেমধ্যেই ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূকম্পন ঘটছে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার ৫৬ শতাংশের বেশি ভবন ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে।
সর্বশেষ গত ২২ জুন রাজধানীর অদূরে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার কেন্দ্র ছিল ঢাকা থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে এবং ভূগর্ভের প্রায় ১০ কিলোমিটার গভীরে। এতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও জনমনে ব্যাপক আতঙ্ক সৃষ্টি হয়।
এর আগে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্প হয়। গত বছরের ২১ নভেম্বর নরসিংদীর মাধবদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে ১০ জন নিহত হন এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। ওই ভূমিকম্পকে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অন্যতম শক্তিশালী স্থানীয় ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে নরসিংদী ও আশপাশের এলাকায় একাধিক ভূমিকম্প অনুভূত হয়, যার কেন্দ্র ঢাকার খুব কাছাকাছি ছিল। এসব ঘটনায় রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের ভূকম্পন ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশ তিনটি প্রধান টেকটোনিক প্লেট—ইন্ডিয়ান, ইউরেশিয়ান ও বার্মিজ প্লেটের সংযোগস্থলের কাছাকাছি অবস্থিত হওয়ায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি। পাশাপাশি সক্রিয় ও সম্ভাব্য ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’গুলো পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সাম্প্রতিক ভূকম্পনগুলো সক্রিয় ফল্ট বা টেকটোনিক কার্যকলাপের ফল হতে পারে। অন্যদিকে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) বিশেষজ্ঞদের মতে, ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প সরাসরি বড় ধসের ইঙ্গিত না দিলেও দীর্ঘমেয়াদে বড় ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
এইচবিআরআইয়ের সর্বশেষ গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকার কংক্রিট ভবনের ৫৬ দশমিক ২৬ শতাংশ ভূমিকম্পের উচ্চঝুঁকিতে রয়েছে এবং ৩৬ দশমিক ৮৭ শতাংশ মাঝারি ঝুঁকিতে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোতে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বিল্ডিং কোড অমান্য এবং ঘনবসতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একাধিক ওয়ার্ডকে গবেষণায় ‘খুব উচ্চঝুঁকি’ এবং ‘উচ্চঝুঁকি’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে গুলশান, মিরপুর, ধানমন্ডি, মতিঝিলসহ বিস্তীর্ণ এলাকা ভূমিকম্পে বড় ক্ষতির ঝুঁকিতে রয়েছে।
রাজউকের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে বর্তমানে ৩২১টি অতিঝুঁকিপূর্ণ ভবন এবং প্রায় ৫ হাজার বিধিবিধান লঙ্ঘনকারী ভবন রয়েছে। তবে ২০১৬ সালের পর থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের পূর্ণাঙ্গ হালনাগাদ তথ্য নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার মাটি ও ভূতাত্ত্বিক গঠন তুলনামূলকভাবে ভিন্ন হলেও সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ভবনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও অপ্রশস্ত সড়কব্যবস্থা। ভূমিকম্প হলে উদ্ধার কার্যক্রমও বড় চ্যালেঞ্জে পড়তে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভূতত্ত্ব বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, সিলেট থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত অঞ্চলে ৮ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প সৃষ্টির মতো শক্তি সঞ্চিত রয়েছে, যা ভবিষ্যতে বড় বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে ঢাকা ও আশপাশে ১ লাখ স্বেচ্ছাসেবী প্রশিক্ষণ, ৪৫০টি অ্যাসেম্বলি পয়েন্ট নির্ধারণ এবং জরুরি উদ্ধার সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে বলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রধান করণীয় হলো ভবনগুলোর জরুরি যাচাই, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন চিহ্নিতকরণ, ভূমিকম্প সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ এবং নিয়মিত মহড়া ও জনসচেতনতা বৃদ্ধি।
(ঢাকাটাইমস/২৫ জুন/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































