মেট্রোরেল চালুর জন্য গাবতলী টার্মিনাল সরে যাচ্ছে সাভারে, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আজ

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০৮| আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩৪
অ- অ+

মেট্রোরেল প্রকল্পের এমআরটি লাইন-৫-এর নির্মাণকাজ নির্বিঘ্ন করতে রাজধানীর গাবতলী আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল সাভারের তেঁতুলঝোড়া ইউনিয়নের দীপবরনপুর এলাকায় সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে। প্রস্তাবিত জায়গার জমি হস্তান্তর নিয়ে জটিলতা কাটাতে আজ সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় সভায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) আয়োজিত এ সভায় জমি হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করার পাশাপাশি টার্মিনাল স্থানান্তরের পরবর্তী কার্যক্রম নিয়েও আলোচনা হবে। ডিসেম্বরের মধ্যে গাবতলী টার্মিনাল নতুন জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান।

ডিটিসিএ সূত্র জানায়, এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দার্ন রুট এবং প্রস্তাবিত সাউদার্ন রুটের নির্মাণকাজের কারণে গাবতলী বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের লক্ষ্যে আজ ডিটিসিএ কার্যালয়ে বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সভায় সভাপতিত্ব করবেন ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান।

সভায় রাজউক, বিআরটিসি, ডিএমপি, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি), ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল), ডেসকো, তিতাস গ্যাস এবং ঢাকা জেলা প্রশাসক কার্যালয়সহ প্রায় ৩৫টি সরকারি ও সেবা সংস্থার প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নেবেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাভারের দীপবরনপুরে টার্মিনালের জন্য প্রস্তাবিত জায়গার অংশবিশেষ গণপূর্ত অধিদপ্তর, ঢাকা জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন। জমিগুলো ডিএনসিসির কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শেষ হলে সিটি করপোরেশন জায়গাটি ভরাট ও উঁচু করে টার্মিনাল ব্যবহারের উপযোগী করবে। এরপর গাবতলীর আন্তঃজেলা বাসগুলো পর্যায়ক্রমে নতুন জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হবে।

ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-৫-এর ডিপো এবং প্রয়োজনীয় মালামাল রাখার জায়গা হিসেবে গাবতলী বাস টার্মিনাল এলাকা ব্যবহারের প্রয়োজন হবে। এ কারণে টার্মিনালটি সাময়িকভাবে সাভারের দীপবরনপুরে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, প্রস্তাবিত জায়গাটি গণপূর্ত অধিদপ্তর, জেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের মালিকানাধীন। আজকের সমন্বয় সভায় জমিগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হবে। জায়গা প্রস্তুত হওয়ার পর সেখানে বাস চলাচল শুরু হবে। ডিসেম্বরের মধ্যেই স্থানান্তর প্রক্রিয়া শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে।

এর আগে গত ৬ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় গাবতলী বাস টার্মিনাল স্থানান্তরের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত হয়। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতেই আজকের সভার আয়োজন করেছে ডিটিসিএ।

পরিবহন নেতাদের অসহযোগিতার বিষয়ে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মদ মসিউর রহমান বলেন, মালিক সমিতি সরাসরি স্থানান্তরের বিরোধিতা না করলেও তাদের কার্যক্রমে ধীরগতি রয়েছে। তবে মহাখালী কিংবা গাবতলী—যেখানেই অভ্যন্তরীণ প্রতিবন্ধকতা থাকুক, জনস্বার্থে সরকার নির্ধারিত মেগা প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়নে টার্মিনাল স্থানান্তরের প্রক্রিয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই শেষ করা হবে।

উল্লেখ্য, রাজধানীর গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ মেট্রোরেল নির্মাণে ব্যয় হবে ৪৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। ‘ঢাকা ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট (লাইন-৫): সাউদার্ন রুট’ নামের এ প্রকল্পে অর্থায়ন করবে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ উন্নয়ন সহযোগীরা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ১৭ দশমিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ এ রুটের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি হবে ভূগর্ভস্থ। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যেতে সময় লাগবে মাত্র ২৮ মিনিট।

এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় এ রুটে শুরুতে ছয় কোচবিশিষ্ট ১৯ সেট মেট্রোরেল চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। ২০৩০-৩১ অর্থবছরে এ রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু হতে পারে।

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, গাবতলী থেকে টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল, তেজগাঁও ও আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত যাবে রুটটি। এতে মোট ১৫টি স্টেশন থাকবে। এর মধ্যে ১১টি ভূগর্ভস্থ এবং চারটি উড়াল স্টেশন।

গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশটি ভূগর্ভস্থ এবং আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত অংশ উড়ালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

শুরুতে প্রতিটি ট্রেনে থাকবে ছয়টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কোচ। একটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৯০৮ জন যাত্রী পরিবহন করা যাবে। এর মধ্যে মাঝের চারটি কোচে সর্বোচ্চ ৩২৩ জন করে এবং দুই প্রান্তের ট্রেলার কোচে ৩০৮ জন করে যাত্রী থাকতে পারবেন।

ট্রেন চলাচলের ব্যবধান হবে ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৪০ সাল থেকে ছয় কোচের পরিবর্তে আট কোচের ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তখন প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে।

শুরুতে একমুখী পথে ঘণ্টায় প্রায় ২০ হাজার ১০৭ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। ২০৬০ সালে এ সক্ষমতা বেড়ে ঘণ্টায় ৩৮ হাজার ২৫৫ জনে উন্নীত হতে পারে।

ডিপিপি অনুযায়ী, প্রকল্পের সবচেয়ে বড় ব্যয় হবে মেইন লাইনের সিভিল ও স্টেশন ওয়ার্ক এবং ডিপোর সিভিল ও বিল্ডিং ওয়ার্কে। এ খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৭৩৭ কোটি টাকা, যা মোট ব্যয়ের ৩৮ দশমিক ৯৮ শতাংশ।

ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড মেকানিক্যাল (ই অ্যান্ড এম) ও রেলওয়ে সিস্টেম খাতে ১৩ হাজার ২৫৮ কোটি টাকা, ট্রেন কোচ ও ডিপোর যন্ত্রপাতিতে ৪ হাজার ৮২১ কোটি টাকা এবং ভূমি অধিগ্রহণ ও পুনর্বাসনে ৪ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

পরামর্শক সেবায় ১ হাজার ৬২৬ কোটি ৩১ লাখ ৪২ হাজার টাকা, বিভিন্ন সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তরে ৯৩০ কোটি টাকা এবং পরিবহন ভাড়া বাবদ ৩০ কোটি ৭৭ লাখ ৮১ হাজার টাকা ব্যয় হবে।

এ ছাড়া অনাকাঙ্ক্ষিত ভৌত ব্যয় বা ফিজিক্যাল কনটিনজেন্সি হিসেবে ৩৫৮ কোটি টাকা এবং মূল্যস্ফীতিজনিত ব্যয় বা প্রাইস কনটিনজেন্সি হিসেবে ১ হাজার ৫২৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।

সাশ্রয় হবে কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি

ডিএমটিসিএলের হিসাবে, প্রকল্পটি চালু হলে রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ ও দ্রুত হবে। একই সঙ্গে যানজট কমার পাশাপাশি জ্বালানি ব্যবহার ও কার্বন নিঃসরণও কমবে।

প্রকল্পের হিসাবে, মেট্রোরেল চালু হলে বছরে প্রায় ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হতে পারে। পাশাপাশি বছরে প্রায় ৪১ হাজার ২২০ টন জ্বালানি সাশ্রয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। যানবাহনের চলাচলের দূরত্ব কমতে পারে প্রায় ৬ লাখ ৪২ হাজার কিলোমিটার।

এর ফলে বছরে প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমতে পারে বলে প্রকল্পের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিকল্পনা কমিশনের মতে, এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় রুট নির্মিত হলে রাজধানীর উত্তর-দক্ষিণ ও পূর্ব-পশ্চিম করিডোরের মধ্যে যোগাযোগ আরও সহজ হবে। পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি ঢাকার যানজট অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

এ ছাড়া এ রুটের সঙ্গে এমআরটি লাইন-৫-এর নর্দান রুট এবং এমআরটি লাইন-১-এর আন্তঃসংযোগ থাকায় যাত্রীরা অন্যান্য মেট্রোরেল রুটেও সহজে ও কম সময়ে যাতায়াত করতে পারবেন। ফলে রাজধানীর সমন্বিত গণপরিবহন ব্যবস্থায় এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণাঞ্চলীয় রুটটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।

(ঢাকাটাইমস/১৪ সেপ্টেম্বর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
ডিএমপিতে সাত এসির পদায়ন, একজনের বদলির আদেশ বাতিল
বিশ্ববাজারে আবারও বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম, এক লাফে ১০৭ ডলার ছাড়ালো
ফজরের নামাজ পড়তে এসে মুসল্লিরা দেখেন মসজিদ উধাও, তীব্র স্রোতে পদ্মায় বিলীন
ঢাকাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস