প্রবাসী কর্মীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব: রাষ্ট্রপতি

বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে অভিবাসন ব্যয় কমানো, নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং প্রতারণা ও দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা প্রবাসী কর্মীদের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা কোনোভাবেই অনিশ্চিত থাকতে পারে না। নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করতে কর্মীদের স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাইকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা গ্র্যান্ড বলরুমে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (আরএমএমআরইউ) ৩০ বছর পূর্তি উদযাপন এবং ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’-এর পুরস্কার প্রদান ও সমাপনী অনুষ্ঠানে দেয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বিদেশে কর্মসংস্থানের আশায় অনেক কর্মী নিজেদের জমিজমা বিক্রি করেন, ঋণ নেন এবং পরিবারের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করেন। কিন্তু এত ত্যাগের পরও তাদের অনেকে প্রতারণার শিকার হন। কেউ অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়ের বোঝা বহন করেন, কেউ বিদেশে গিয়ে অনিশ্চিত চাকরিতে পড়েন, আবার কেউ চুক্তি অনুযায়ী বেতন পান না। অভিবাসনপ্রত্যাশী কর্মীদের এমন সমস্যার সমাধানে নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা প্রতিষ্ঠা, প্রতারণা প্রতিরোধ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশিদের অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে শ্রমিকবান্ধব হতে হবে, যাতে বিপদে পড়া কর্মীরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পান এবং তাদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখা যায়। বিদেশে যাওয়ার আগেই প্রত্যেক কর্মীকে তার চাকরির চুক্তি, বেতন, কর্মপরিবেশ এবং আইনি অধিকার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিতে হবে। এতে কর্মীরা বিদেশে গিয়ে প্রতারণা ও অনিশ্চয়তার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকতে পারবেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির দুটি প্রধান চালিকাশক্তি হলো প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স এবং তৈরি পোশাকশিল্প। প্রবাসী কর্মীদের পাঠানো অর্থ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার জোগান বাড়ানো, আমদানি ব্যয় পরিশোধ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
তিনি জানান, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসীরা দেশে ৩৫ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই অর্থ দেশের লাখ লাখ পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের পাশাপাশি সামগ্রিক অর্থনীতিকে শক্তিশালী করছে। প্রবাসীদের উপার্জিত অর্থ দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে এবং পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, দেশের অর্থনীতিতে প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী কর্মীর শ্রম, ঘাম, ত্যাগ ও অবদান রয়েছে। তাদের যথাযথ মর্যাদা দেয়া রাষ্ট্রের দায়িত্ব। প্রবাসীরা শুধু দেশে অর্থ পাঠানোর মধ্যেই তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ রাখেন না, বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বও করেন। বিভিন্ন দেশে কাজ করতে গিয়ে তারা যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা অর্জন করেন, তা দেশের জন্য মূল্যবান জাতীয় সম্পদ।
প্রবাসীদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়নের পাশাপাশি তাদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন রাষ্ট্রপতি। তিনি বলেন, প্রবাসী কর্মীদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি দেয়া এবং তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতাকে দেশের উন্নয়নে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের পরিবর্তিত পরিস্থিতি তুলে ধরে রাষ্ট্রপতি বলেন, বিদেশে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে শুধু কর্মীর সংখ্যা বাড়ানোর দিকে নজর দিলে চলবে না। দক্ষতা, উপযুক্ত কর্মসংস্থান এবং নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে এখন কারিগরি জ্ঞান, ভাষাদক্ষতা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং পেশাগত প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই বাড়ছে।
তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), তথ্যপ্রযুক্তি, স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা, নার্সিং, স্বাস্থ্যসেবা, বয়স্কদের পরিচর্যা, বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিকস প্রযুক্তি এবং আধুনিক নির্মাণশিল্পে দক্ষ কর্মীর চাহিদা রয়েছে। এসব খাতে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে সরকারি ও বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোকে দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে হবে।
রাষ্ট্রপতি আরও বলেন, কোন দেশে কোন পেশায় কতজন কর্মীর প্রয়োজন এবং তাদের কী ধরনের যোগ্যতা ও দক্ষতা থাকতে হবে, সেই তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ ও নিয়োগের পরিকল্পনা করা উচিত। শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদা সম্পর্কে সঠিক তথ্য নিয়ে কর্মীদের প্রশিক্ষিত করা গেলে তাদের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। এ জন্য বিদেশি নিয়োগকর্তা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব জোরদার করারও আহ্বান জানান তিনি।
নারী অভিবাসীদের নিরাপত্তা, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়েও গুরুত্ব দেন রাষ্ট্রপতি। পাশাপাশি প্রবাসীদের সঞ্চয় উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগে উৎসাহিত করা, দেশে ফিরে আসা কর্মীদের পুনর্বাসন, তাদের অর্জিত দক্ষতার স্বীকৃতি, ঋণসুবিধা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ তৈরি করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













