সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোয় হুথিদের হামলা

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:২৫
অ- অ+

সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকোর একটি প্রশাসনিক ভবনে হামলা চালিয়েছে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। মঙ্গলবার দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় শহর দহরানে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় একটি তেল স্থাপনায় বিমান হামলা চালায় সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট।

সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএকে দেওয়া এক বিবৃতিতে দেশটির জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, হামলায় সৃষ্ট আগুন দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।

মঙ্গলবার দিনের শুরুতে হুথিদের মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি সৌদি আরবের তেল স্থাপনাগুলোকে ‘বৈধ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে উল্লেখ করেন। এসব স্থাপনার আশপাশে থাকা কর্মচারী ও বেসামরিক নাগরিকদের সরে যাওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এর পরপরই দহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবনে হামলার ঘটনা ঘটে।

ইয়েমেনের রাজধানী সানার আল-সাবাহ এলাকায় অবস্থিত ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানির কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনা খালি করার নির্দেশ দিয়েছিল সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট। এর জবাবে হুথিরা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানায়, সানায় যেকোনো ধরনের বিমান হামলা চালানো হলে সৌদি রাজধানী রিয়াদে ‘কঠোর ও বেদনাদায়ক’ জবাব দেওয়া হবে।

এদিকে সৌদি সরকারি বার্তা সংস্থা এসপিএ জানিয়েছে, রিয়াদ অভিমুখে হুথিদের ছোড়া বেশ কয়েকটি ক্ষেপণাস্ত্র মাঝআকাশে প্রতিহত করেছে সৌদি বাহিনী। সৌদি সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্রের বরাত দিয়ে সংস্থাটি জানায়, প্রতিহত করা দুটি ক্ষেপণাস্ত্রের ধ্বংসাবশেষ পড়ে চারজন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৫টি ঘরবাড়ি।

সানার তেল স্থাপনায় সৌদি জোটের হামলা

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের পক্ষ থেকে তেল স্থাপনা খালি করার নির্দেশ দেওয়ার পর সানায় বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায় বলে জানিয়েছেন আল জাজিরার প্রতিনিধিরা। হুথি-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর বিমান হামলায় রাজধানীর আল-সাবাহ এলাকার একটি তেল স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

হুথি কর্মকর্তারা আগেই এ হামলার আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। ইয়েমেনি অয়েল কোম্পানি জানিয়েছে, তাদের মজুতাগারগুলো আগেই খালি করা হয়েছিল। ফলে হামলার কারণে সাধারণ মানুষের জ্বালানি সরবরাহ ও মজুতে কোনো প্রভাব পড়বে না বলে দাবি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

তবে জ্বালানির ঘাটতির আশঙ্কায় সানার পেট্রল পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ সারি দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা।

আল জাজিরার প্রতিনিধি ইউসেফ মাওরি জানান, সানার কেন্দ্রীয় তেল স্থাপনায় বিমান হামলার পরপরই বিকট বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। তিনি আরও জানান, সৌদি আরব লোহিত সাগরের রাস ঈসা বন্দরে বিমান হামলা চালিয়ে জ্বালানি তেলের ট্যাংক ধ্বংস করেছে। পাশাপাশি হুথি নিয়ন্ত্রিত হোদাইদাহ প্রদেশের একটি তেল স্থাপনাতেও হামলা চালানো হয়েছে।

সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি অভিযোগ করেন, হুথিরা এসব স্থাপনা ও ভূগর্ভস্থ জ্বালানি ডিপো ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন সংরক্ষণের কাজে ব্যবহার করছিল।

হামলার পর হুথি মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, সানায় সৌদি জোটের সমর্থিত বাহিনীর সঙ্গে তাদের যোদ্ধাদের তীব্র সংঘর্ষ চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি হুঁশিয়ারি দেন, সানায় হামলা অব্যাহত থাকলে আগে থেকে খালি করার নির্দেশ দেওয়া অঞ্চলগুলোতে পাল্টা হামলা চালানো হবে।

মঙ্গলবার দহরানে আরামকোর প্রশাসনিক ভবন, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং রাজধানীতে অবস্থিত আরামকোর একটি তেল শোধনাগার এলাকা থেকে সাধারণ মানুষকে অবিলম্বে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

বিমানবন্দরে হামলা, বিপর্যস্ত উড়োজাহাজ চলাচল

গত শনিবার রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর পরদিন রোববার একই বিমানবন্দরে আরেকটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানলে আরও একজন নিহত এবং ১১ জন আহত হন।

এসব হামলার পর এয়ার ফ্রান্স-কেএলএম, এয়ার ইন্ডিয়া, ইতিহাদ, লুফথানসা, ডেল্টা, গালফ এয়ার ও কাতার এয়ারওয়েজসহ বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থা সৌদি আরব ও প্রতিবেশী দেশগুলোতে ফ্লাইট পরিচালনা স্থগিত করেছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারকে সমর্থন দেওয়া সৌদি আরব মঙ্গলবারও হুথিদের হামলার মুখে পড়ে। রিয়াদের উত্তরাঞ্চলে আরও তিনটি ড্রোন প্রতিহত করার কথা জানিয়েছে জোট বাহিনী।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে গত সপ্তাহ থেকে সৌদি আরবের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরবের অন্যান্য বিমানবন্দর সম্পর্কেও সতর্কবার্তা দিয়েছেন হুথি মুখপাত্র।

এসপিএ জানিয়েছে, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে হুথিদের ধারাবাহিক হামলার জন্য তাদের ‘চড়া মাশুল’ দিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

হুথিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ইঙ্গিত ট্রাম্পের

মঙ্গলবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুথিরা ‘খুবই বাজে আচরণ’ করছে। সৌদি আরবের স্বার্থ রক্ষায় ইয়েমেন পরিস্থিতিতে হস্তক্ষেপ করার জন্য তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কাছে অনুরোধ জানাতে পারেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

ট্রাম্প বলেন, ‘আমার বিশ্বাস, আমি বললে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এটি করবেন।’

‘ডন অব ইয়েমেন’ অভিযান, বাড়ছে সংঘাত

গত মাসে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকা দখল করার পর হুথিদের বিরুদ্ধে নতুন করে হামলা শুরু করে সৌদি আরব। এর অংশ হিসেবে ইয়েমেন সরকারের পাল্টা অভিযান ‘ডন অব ইয়েমেন’-এ বিমান সহায়তা দিচ্ছে রিয়াদ।

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনী জানিয়েছে, মঙ্গলবার দেশটির দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হুথিদের বিভিন্ন ঘাঁটি ও সামরিক সরঞ্জাম লক্ষ্য করে একযোগে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।

সরকারের দাবি, তায়েজ গভর্নরেটে মোট নয়টি বিমান হামলা চালানো হয়। এর মধ্যে ডুবাব জেলায় পাঁচটি এবং আল-মাসরাখ জেলায় চারটি হামলা অন্তর্ভুক্ত। ইয়েমেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের গণমাধ্যম কেন্দ্র জানিয়েছে, তায়েজের দক্ষিণে আল-শাগাব এলাকায় সরকারি বাহিনী ও হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে তীব্র লড়াই চলছে।

মানবাধিকার সংস্থা ‘ইয়েমেনি নেটওয়ার্ক ফর রাইটস অ্যান্ড ফ্রিডম’ মঙ্গলবার জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় তায়েজে হুথিদের গোলাবর্ষণে পাঁচ বছরের এক শিশুসহ অন্তত পাঁচজন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৭ জন আহত হয়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অন্তত সাতটি ঘরবাড়ি। সংস্থাটির অভিযোগ, গত এক দিনে তায়েজজুড়ে ১৮০টির বেশি গোলা নিক্ষেপ করেছে হুথিরা।

কৌশলগত এলাকায় হুথিদের অগ্রযাত্রা

গত সেপ্টেম্বরে মোখা অভিমুখে আকস্মিক স্থল অভিযান চালিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরীটি থেকে সরকারি বাহিনীকে সরিয়ে দেয় হুথিরা। একই মাসে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল ও বাব আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করে গোষ্ঠীটি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ মায়্যুন দ্বীপও তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ইয়েমেনে সংঘাতের তীব্রতা বাড়তে থাকায় আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটির (আইসিআরসি) সভাপতি মিরজানা স্পোলজারিক গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছেন।

এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ইয়েমেনের এডেন ও সানাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মৃত্যু, বাস্তুচ্যুতি ও ঘরবাড়ির ক্ষয়ক্ষতি দ্রুত বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস হচ্ছে এবং প্রাণহানি ঘটছে।

জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, গত আগস্ট থেকে ইয়েমেনে অন্তত ৪৬ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং ১৩০ জনের বেশি আহত হয়েছেন। হতাহতদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু রয়েছে। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বর থেকে দেশটিতে দুই লাখের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।

(ঢাকাটাইমস/১৪ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
বিশ্ববাজারে আবার বাড়লো জ্বালানি তেলের দাম
স্কুলে সন্তান পাঠিয়ে লাশ নিয়ে ফিরলেন বাবা, শায়নের মৃত্যু ঘিরে প্রশ্ন
দেশের পাঁচ অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কসংকেত
ঢাকায় ৬,৯০০ ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার ৫, কক্সবাজার-টেকনাফ থেকে আনতেন মাদক