হুথিদের হামলার চাপে সৌদি আরব, মার্কিন অস্ত্রেও মিলছে না পূর্ণ নিরাপত্তা

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৭| আপডেট : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৮:৪৯
অ- অ+

প্রতিরক্ষা খাতে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে সৌদি আরব। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কাছ থেকে অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা ও নানা ধরনের সামরিক সরঞ্জামও কিনেছে দেশটি। তবু ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছে রিয়াদ। দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও অবকাঠামোতে হামলার ঝুঁকি বাড়তে থাকায় প্রশ্ন উঠেছে সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।

স্টকহোম আন্তর্জাতিক শান্তি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (সিপ্রি) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রতিরক্ষা খাতে সৌদি আরবের ব্যয় ছিল ৮ হাজার ৩০০ কোটি ডলার। সামরিক ব্যয়ের দিক থেকে বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব। দেশটির অস্ত্রভান্ডারে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তৈরি যুদ্ধবিমান, প্যাট্রিয়ট ও থাড ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের অত্যাধুনিক অস্ত্র।

এত শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দেশটির গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো পুরোপুরি সুরক্ষিত রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এর অন্যতম কারণ, সৌদি আরবের বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডে ছড়িয়ে থাকা তেল স্থাপনা, বিমানবন্দর ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে একসঙ্গে সুরক্ষা দিতে হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন দিক থেকে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ঝুঁকিও মোকাবিলা করতে হচ্ছে দেশটিকে।

তিন দিক থেকে হামলার ঝুঁকি

সৌদি আরবের পূর্ব দিকে ইরান, দক্ষিণে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহী এবং উত্তরে ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে হামলার আশঙ্কা রয়েছে। চলতি বছরের সংঘাতের সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে ইরান সৌদি আরবের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে প্রায় এক হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করেছিল। অন্যদিকে, ইরান-সমর্থিত ইরাকি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো দেশটির গুরুত্বপূর্ণ পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা করেছে।

দক্ষিণে ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় অবস্থান নিয়ে কিংবা ভ্রাম্যমাণ উৎক্ষেপণব্যবস্থা ব্যবহার করে সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ছে হুথিরা।

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে শুধু রাজধানী রিয়াদ কিংবা একটি তেল শোধনাগার রক্ষা করলেই চলে না। বিমানবন্দর, তেল স্থাপনা, পাইপলাইনসহ বিস্তীর্ণ এলাকার অসংখ্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু সুরক্ষিত রাখতে হয়। আকাশপথে আসা হামলা শনাক্ত করা, কোন ক্ষেপণাস্ত্র বা ড্রোন প্রতিহত করা হবে তা নির্ধারণ এবং সাধারণ মানুষকে সতর্ক করার জন্যও সময় পাওয়া যায় খুব কম।

সৌদি আরবের একটি সূত্রের ভাষ্য, দেশটির প্রতিরক্ষা বাহিনী হুথিদের ছোড়া অনেক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করতে পারছে। তবে কিছু হামলা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে লক্ষ্যবস্তুতে পৌঁছে যাচ্ছে। বিপুলসংখ্যক স্থাপনা ঝুঁকিতে থাকায় কোথায় কী ধরনের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা মোতায়েন করা হবে, তা নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।

কৌশল বদলেছে হুথিরা

সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে চাপে ফেলতে হুথিরা এখন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও দূরপাল্লার ড্রোন একসঙ্গে ব্যবহার করছে। একই সময়ে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র দিয়ে হামলার এই কৌশল ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার ব্যবহৃত হামলাপদ্ধতির সঙ্গে অনেকটা সাদৃশ্যপূর্ণ।

ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তুলনামূলক নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়ায় রাডারে সেগুলো শনাক্ত করা এবং গতিপথ অনুসরণ করা কঠিন হতে পারে। এ ছাড়া নতুন প্রজন্মের কিছু ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের দাবি করেছে হুথিরা। এসব ক্ষেপণাস্ত্র উড্ডয়নের সময় গতিপথ পরিবর্তন করতে পারে বলে দাবি করা হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হুথিদের হাটেম-২ ও প্যালেস্টাইন-২ ক্ষেপণাস্ত্রের নকশার সঙ্গে ইরানের তৈরি অস্ত্রের বেশ মিল রয়েছে। এগুলো দ্রুতগতিসম্পন্ন এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়।

গত বছর ইসরায়েলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ভেদ করে একটি হুথি ক্ষেপণাস্ত্র বেন গুরিয়ন বিমানবন্দরের কাছে আঘাত হেনেছিল। সে সময় বিশ্লেষক আমির বার শালোম বলেছিলেন, প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার দূর থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্রের এমন নির্ভুলতা উল্লেখযোগ্য।

ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাজেদ আল-নাজিলির দাবি, হুথিরা ইরানের তৈরি আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার কিছু অস্ত্র পরিবর্তন করেও ব্যবহার করছে। এসব ক্ষেপণাস্ত্র যুদ্ধবিমান ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে বলে তিনি জানিয়েছেন।

তেহরানের নির্দেশেই চলে হুথিরা?

দীর্ঘদিন ধরে ইরানের নেতৃত্বাধীন কথিত ‘প্রতিরোধ অক্ষের’ অংশ হিসেবে পরিচিত হুথিরা। তবে হিজবুল্লাহ, হামাস ও ইরাকের কয়েকটি ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী সাম্প্রতিক সংঘাতে দুর্বল হয়ে পড়লেও হুথিরা নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। তেহরানের সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষকৃত্যেও হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল পাঠানো হয়েছিল।

তবে ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা থাকলেও হুথিদের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক লক্ষ্য রয়েছে। ফলে তাদের সব সিদ্ধান্ত তেহরানের নির্দেশে পরিচালিত হয় কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

২০১৫ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যে দীর্ঘ সংঘাতের সময় ইয়েমেনের হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে ব্যাপক দুর্ভোগ তৈরি হয়। অর্থনৈতিক ও পরিবহন অবরোধের প্রভাবও অব্যাহত রয়েছে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজে হামলার হুমকি দেয় হুথিরা। এর কিছুদিন পরই ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে লোহিত সাগরের উপকূলে সৌদি আরামকোর একটি তেল শোধনাগার ও কয়েকটি বিমানঘাঁটি লক্ষ্যবস্তু করা হয়।

হুথিদের দাবি, ইয়েমেনের সরকারি বাহিনীকে সমর্থন দিয়ে সৌদি আরব যে বিমান হামলা চালাচ্ছে, তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সৌদি আরবের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে কয়েক শ কোটি ডলারও দাবি করছে গোষ্ঠীটি।

যুদ্ধ নাকি সমঝোতা, কঠিন সিদ্ধান্তে রিয়াদ

হুথিদের সঙ্গে সংঘাত বাড়লেও সৌদি আরব স্বাভাবিক পরিস্থিতির ভাবমূর্তি ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। গত সপ্তাহে দেশটির নাগরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার বিষয়ে মোবাইল ফোনে স্বয়ংক্রিয় সতর্কবার্তা পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল। এর পরই রিয়াদের বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার ঘটনা ঘটে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

রিয়াদের কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন, পরে আবার সতর্কবার্তা পাঠানো শুরু হয়। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, সোমবার মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে পাওয়া যাচ্ছিল। একই দিন সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, তিনটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।

ক্রমাগত হামলার মুখে সৌদি আরবকে এখন একদিকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার নিরাপত্তা জোরদার করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়া ঠেকানোর বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।

সৌদি আরব আন্তর্জাতিক সহায়তা চাইছ

হুথিদের মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক জোট গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সৌদি আরব। আঞ্চলিক মিত্ররা প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছে। পাকিস্তান সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় কয়েক হাজার সেনা পাঠিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মিসরও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তার আশ্বাস দিয়েছে।

ইরানের সঙ্গে সংঘাতের শুরুতে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার মজুত কমে যাওয়ায় সৌদি আরবকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ থেকে নতুন সামরিক সরঞ্জাম সংগ্রহের চেষ্টা করতে হতে পারে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব অস্ত্রভান্ডারেও ঘাটতি রয়েছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের মহাপরিদর্শকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্রের মজুত কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে নতুন অস্ত্র উৎপাদন ও সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতিরক্ষা শিল্পের সীমাবদ্ধতাও সামনে এসেছে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মধ্যপ্রাচ্যে আরেকটি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন হামলার বিষয়ে তিনি স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি দেননি, যদিও সেই সম্ভাবনা নাকচও করেননি।

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের মাইকেল কাটনির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই অনীহা থেকে এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে, সবচেয়ে কঠিন সময়ে দেশটি তার মিত্রকে পরিত্যাগ করেছে।

সব মিলিয়ে, বিপুল সামরিক ব্যয় ও অত্যাধুনিক মার্কিন অস্ত্রের মজুত থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবের জন্য হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বড় নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা, প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা কাটানো এবং সংঘাতের রাজনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা—এই তিন ক্ষেত্রেই এখন কঠিন পরীক্ষার মুখে রিয়াদ।

(ঢাকাটাইমস/১৫ অক্টোবর/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
খাদ্যমন্ত্রীকে না জানিয়ে সরকারি সফর, এপিএসকে অব্যাহতি
সাবেক ডিএমপি কমিশনার ফারুক ও স্ত্রীর সম্পত্তি ক্রোক, ব্যাংক হিসাব অবরুদ্ধের নির্দেশ
সৌদিতে আরামকোর প্রধান কার্যালয়ে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র-ড্রোন হামলা
দেশের তিন বিভাগে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস