আইএফআইসি ব্যাংকে ঋণদায়ের প্রায় পুরোটাই খেলাপি

অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকার ৭২৭ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ

ক্রিসেন্ট লিমিটেডকে ৪২৭ কোটি টাকা দেওয়ার তথ্য নিরীক্ষিত প্রতিবেদনে

অনলাইন ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৪৭
অ- অ+

দেশের অভিজাত ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকা লিমিটেডের ৭২৭ কোটি টাকা ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে আইএফআইসি ব্যাংকে প্রতিষ্ঠানটির মোট ঋণদায় ছিল ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৯৯ দশমিক ৬ শতাংশ।

অন্যদিকে, ব্যাংকঋণের বিপুল দায় থাকা অবস্থায় স্কলাস্টিকা ক্রিসেন্ট লিমিটেড নামের আরেকটি কোম্পানিকে ৪২৭ কোটি টাকা দিয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে তথ্য পাওয়া গেছে। ক্রিসেন্টের পরিচালকদের সঙ্গে বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র রয়েছে। বেক্সিমকো গ্রুপের অন্যতম কর্ণধার সালমান এফ রহমান দীর্ঘদিন আইএফআইসি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন।

২৫ অক্টোবর বেসরকারি একটি টেলিভিশন চ্যানেল এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে আনে।

পাঁচ দশকের বেশি সময় ধরে দেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান স্কলাস্টিকা। মানসম্মত ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা, কঠোর শৃঙ্খলা ও উচ্চ শিক্ষাব্যয়ের কারণে প্রতিষ্ঠানটি অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। রাজধানীর বিভিন্ন শাখায় প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এখানে পড়াশোনা করে।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও অন্যান্য অর্থ আদায় করা হলেও প্রতিষ্ঠানটির বিপুল ব্যাংকঋণ এবং অন্য কোম্পানিকে শত শত কোটি টাকা দেওয়ার তথ্য এর আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

আইএফআইসি ব্যাংকের ঋণসংক্রান্ত নথি বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর শেষে স্কলাস্টিকা লিমিটেডের মোট ঋণদায় ছিল ৭৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৭২৭ কোটি টাকা খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্কলাস্টিকার একজন কর্মকর্তা দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির ব্যাংকঋণ পুনঃতফসিল করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঋণ পরিশোধের সময়সূচিতে পরিবর্তন আনা হয়েছে। যদিও ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের ব্যাংক নথিতে বিপুল অঙ্কের ঋণ খেলাপি হিসেবে দেখানো হয়েছে।

স্কলাস্টিকার নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনেও বড় অঙ্কের ঋণ ও অন্যান্য আর্থিক দায়ের তথ্য রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও ব্যাংক ওভারড্রাফটের হিসাব বিশ্লেষণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আর্থিক লেনদেনের চিত্র উঠে এসেছে।

স্কলাস্টিকার আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে আলোচিত তথ্য হলো, প্রতিষ্ঠানটি ক্রিসেন্ট লিমিটেডকে ৪২৭ কোটি টাকা দিয়েছে। এ তথ্য পাওয়া গেছে স্কলাস্টিকার নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনে।

ক্রিসেন্ট লিমিটেডের নিবন্ধনসংক্রান্ত নথি থাকলেও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে কোম্পানিটির পরিচালকদের দেওয়া কয়েকটি ঠিকানার সঙ্গে বাস্তব অবস্থানের অসংগতি পাওয়া গেছে।

রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজ অ্যান্ড ফার্মসের (আরজেএসসি) নথি অনুযায়ী, ক্রিসেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফ। অন্য দুই পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিস ও গাজী মনিরুল ইসলাম। কোম্পানির পরিচালকদের তথ্যসংবলিত ফরম-১২-তে তাদের নাম, ঠিকানা ও দায়িত্বের বিবরণ রয়েছে। ২০২৩ সালের ৩১ মে তাদের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকার তথ্যও নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

ক্রিসেন্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফ ও পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিসের সঙ্গে নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজের সম্পর্ক রয়েছে। তারা প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বেও ছিলেন। নিউ ঢাকা ইন্ডাস্ট্রিজ বেক্সিমকো গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক হিসেবে আব্দুর রউফ ও সালাউদ্দিন খান মজলিসের পাশাপাশি সালমান এফ রহমান ও তার ভাই এ এস এফ রহমানের নামও রয়েছে।

এভাবে স্কলাস্টিকার কাছ থেকে বিপুল অর্থ পাওয়া ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালকদের সঙ্গে বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। অন্যদিকে, ক্রিসেন্টকে অর্থ দেওয়া স্কলাস্টিকার ঋণদাতা ব্যাংক আইএফআইসি। ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান ছিলেন সালমান এফ রহমান।

স্কলাস্টিকা ও এর মূল ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এসেন্ট গ্রুপের সঙ্গে সালমান এফ রহমান ও বেক্সিমকোর দীর্ঘদিনের যোগাযোগের তথ্যও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। সালমান এফ রহমান ও বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্কলাস্টিকার সেবাগ্রহীতা ও শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। অন্যদিকে বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারাই ছিলেন স্কলাস্টিকার কাছ থেকে বিপুল অর্থ পাওয়া ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালনায়।

ক্রিসেন্ট লিমিটেডের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণীতে বড় অঙ্কের ব্যাংকঋণের তথ্য রয়েছে। প্রতিবেদনের সংশ্লিষ্ট অংশে প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি ঋণের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩১৮ কোটি ৭১ লাখ ২৭ হাজার ২৮৫ টাকা। এর বিপরীতে আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখার তিনটি ঋণ হিসাবের উল্লেখ রয়েছে।

একই আর্থিক বিবরণীতে ব্যাংক ওভারড্রাফটের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ৩৭৬ কোটি ৩৯ লাখ ৫৮ হাজার ৯০৭ টাকা। এর মধ্যে ঢাকা ব্যাংকের বনানী শাখা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের গুলশান শাখার ঋণ হিসাব রয়েছে। দীর্ঘমেয়াদি ঋণ ও ব্যাংক ওভারড্রাফট মিলিয়ে এ দুই খাতে ক্রিসেন্টের দায় প্রায় ৬৯৫ কোটি ১১ লাখ টাকা।

এ ছাড়া নিরীক্ষিত হিসাবের সংশ্লিষ্ট অংশে বিভিন্ন অগ্রিম, পাওনা, আয়কর সমন্বয় ও অন্যান্য দায়ের তথ্য রয়েছে। এসব হিসাব প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক অবস্থার পাশাপাশি ব্যাংকঋণ ও পারস্পরিক লেনদেনের ব্যাপকতা তুলে ধরে।

ক্রিসেন্ট লিমিটেডের পরিচালকদের ঠিকানা অনুসন্ধানেও বিভিন্ন অসংগতি পাওয়া গেছে। মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধান অনুযায়ী, কোম্পানিটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুর রউফের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর ধানমন্ডি আবাসিক এলাকার ১ নম্বর সড়কের ৪৮ নম্বর বাড়ি। তবে ওই ঠিকানায় তার অবস্থান নিশ্চিত করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট এলাকায় বাড়ির নম্বরের ধারাবাহিকতার সঙ্গেও নথিতে দেওয়া ঠিকানার অসংগতি পাওয়া যায়।

অন্য পরিচালক গাজী মনিরুল ইসলামের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে মিরপুর-১ এলাকায় বেক্সিমকো রিয়েল এস্টেটের নিয়ন্ত্রণাধীন মানসী লেক ভিউ অ্যাপার্টমেন্টের একটি ভবনে। অনুসন্ধানে নথিতে উল্লিখিত ভবনটি পাওয়া যায়নি।

কোম্পানিটির আরেক পরিচালক সালাউদ্দিন খান মজলিসের ঠিকানা দেওয়া হয়েছে রাজধানীর ইস্কাটন প্লাজায়। সেখানে গিয়ে নিরাপত্তাকর্মীর কাছ থেকে তার মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়। তবে অনুসন্ধানের সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

ক্রিসেন্টের নিবন্ধন নথিতে পরিচালকদের নাম ও ঠিকানা থাকলেও মাঠপর্যায়ে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করতে না পারার বিষয়টি কোম্পানিটির বাস্তব কার্যক্রম ও আর্থিক লেনদেনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে স্কলাস্টিকার কাছ থেকে ৪২৭ কোটি টাকা পাওয়ার তথ্যের কারণে কোম্পানিটির ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও অর্থ ব্যবহারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

স্কলাস্টিকার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, কূটনীতিক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ইয়াসমিন মুর্শেদ। ২০২৩ সালে তার মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনায় রয়েছেন সৈয়দা মাদিহা মুর্শেদ।

দীর্ঘদিনের সুনাম ও শিক্ষার মানের কারণে দেশের উচ্চবিত্ত পরিবারের মধ্যে স্কলাস্টিকার বিশেষ গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। সাধারণত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আয়ের প্রধান উৎস শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি, ভর্তি ফি ও অন্যান্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সেবা। স্কলাস্টিকার ক্ষেত্রেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে তুলনামূলক উচ্চহারে ফি নেওয়া হয়।

এর মধ্যেই শত শত কোটি টাকার ব্যাংকঋণ এবং অন্য কোম্পানিকে বিপুল অর্থ দেওয়ার তথ্য প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপকতা প্রকাশ করেছে।

স্কলাস্টিকার ঋণদাতা আইএফআইসি ব্যাংক নিজেও বিপুল খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৮ হাজার ২৫০ কোটি টাকা, যা ব্যাংকটির বিতরণ করা মোট ঋণের ৬৩ শতাংশ।

ব্যাংকটির সাবেক চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমানের সঙ্গে বেক্সিমকো গ্রুপের সংশ্লিষ্টতা এবং ক্রিসেন্টের পরিচালকদের বেক্সিমকো-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালনের তথ্য এ আর্থিক লেনদেনকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করেছে।

ব্যাংকঋণের অর্থের ব্যবহার, ঋণগ্রহীতা প্রতিষ্ঠানের আর্থিক সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলোর মধ্যে অর্থের প্রবাহ তদারকি করা ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব। স্কলাস্টিকার বিপুল খেলাপি ঋণ এবং ক্রিসেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য ঋণ তদারকির কার্যকারিতার বিষয়টিও সামনে এনেছে।

দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির পেছনে দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, ঋণের অর্থের অপব্যবহার এবং প্রভাবশালী ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যাংকের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে। স্কলাস্টিকার ঘটনা সেই সংকটের মধ্যে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কারণ, এখানে ঋণগ্রহীতা কোনো প্রচলিত শিল্পকারখানা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; বরং দেশের অন্যতম পরিচিত একটি অভিজাত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
আইজিপির বক্তব্যে এইচআরএসএসের নিন্দা
বাবা কোথায়, জানে না দুই শিশু: রাজুর অপেক্ষায় অশ্রুসিক্ত পরিবার
আনসার-ভিডিপির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে সন্তোষ প্রকাশ চার দেশের কূটনীতিকদের, বৈশ্বিক কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা
পুলিশে ‘নতুন বেনজীর’ এসেছেন: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী