বাবা কোথায়, জানে না দুই শিশু: রাজুর অপেক্ষায় অশ্রুসিক্ত পরিবার

সালথা-নগরকান্দা (ফরিদপুর) প্রতিনিধি, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৬ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:২৩
অ- অ+

সংসারে সচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাজু মাতুব্বর (২৮)। স্বপ্ন ছিল, রাশিয়ায় মেকানিক্যাল শ্রমিকের কাজ করে পরিবারের অভাব ঘোচাবেন। ছোট্ট দুই সন্তানকে নিয়ে স্ত্রী শারমিন আক্তার কাটাবেন একটু স্বস্তির দিন। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নের পথে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তার অন্ধকার। রাশিয়ায় চাকরি করতে গিয়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানো হয়েছে তাঁকে- এমন অভিযোগ পরিবারের। এরই মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর মৃত্যুর খবর। অথচ ছেলের মৃত্যুর কোনো আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ না পেয়ে বুকভরা শঙ্কা আর চোখভরা জল নিয়ে অপেক্ষা করছেন স্বজনেরা।

রাজু বেঁচে আছেন, নাকি আর কখনো ফিরবেন না- এই একটি প্রশ্নই এখন তাড়া করে ফিরছে ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার মাঝিকান্দা গ্রামের পরিবারটিকে। আড়াই বছরের ছেলে ও এক বছরের মেয়েকে নিয়ে দিশাহারা স্ত্রী শারমিন আক্তার।

অন্যদিকে, ছেলের ছবি হাতে কখনো কান্নায় ভেঙে পড়ছেন বাবা নান্নু মাতুব্বর ও মা রাজিয়া বেগম। তাঁদের অপেক্ষা শুধু ছেলের ফিরে আসার নয়, অন্তত তাঁর প্রকৃত অবস্থাটা জানার।

গত ৮ মে রাশিয়ায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়েন রাজু। পরিবারের অভিযোগ, প্রতিবেশী কফাইবালিয়া গ্রামের প্রিন্স মাতুব্বর ও তাঁর ছোট ভাই রানা মাতুব্বরের মাধ্যমে সাড়ে ১৪ লাখ টাকায় তাঁকে বিদেশে পাঠানোর চুক্তি হয়। এর মধ্যে সাড়ে চার লাখ টাকা নগদ দেওয়া হয়। বাকি ১০ লাখ টাকা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর পরিশোধ করার কথা ছিল।

কিন্তু বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী চাকরি পাননি রাজু- এমনটাই দাবি পরিবারের। তাঁদের অভিযোগ, কাজের আশ্বাস দিয়ে তাঁকে রাশিয়ায় নেওয়ার পর ৩০ লাখ টাকার বিনিময়ে ইউক্রেনের যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনার জন্য প্রিন্স ও তাঁর ভাই রানাকে দায়ী করছেন রাজুর স্বজনেরা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

রাজুর বাবা নান্নু মাতুব্বর বলেন, ভালো চাকরি করে সংসারের অভাব ঘোচাবে- এই আশায় ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম। কখনো ভাবিনি, কাজ করতে গিয়ে তাকে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে হবে। এখন শুনছি, ছেলে আর বেঁচে নেই। কিন্তু কেউ নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারছে না। আমার ছেলে কোথায়, কী অবস্থায় আছে- আমি শুধু সেটা জানতে চাই। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।

গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে রাতুল নামের এক যুবকের প্রকাশ করা একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে রাজু মারা গেছেন বলে দাবি করেন রাতুল। ভিডিওটি বেশি বেশি শেয়ার করার আহ্বানও জানান তিনি। এরপর থেকেই রাজুর পরিবারে উদ্বেগ আরও বেড়ে যায়।

রাজুর ছোট ভাই রাজন মাতুব্বর জানান, ভিডিওটি দেখার পর তাঁরা রাতুলের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তখন রাতুলও রাজুর মৃত্যুর কথা জানান। তবে কখন, কোথায় বা কীভাবে রাজুর মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি তাঁরা।

মৃত্যুর খবর শুনেও তাই শোকের সঙ্গে মিশে আছে একরাশ অনিশ্চয়তা। ছেলের মৃত্যুসংবাদ বিশ্বাস করবেন, নাকি ফিরে আসার আশায় বুক বাঁধবেন- কিছুই বুঝে উঠতে পারছেন না নান্নু মাতুব্বর ও রাজিয়া বেগম। তাঁদের চোখেমুখে এখন শুধু একটাই অপেক্ষা- ছেলের কোনো নির্ভরযোগ্য খবরের।

অন্যদিকে দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে স্বামীর ফেরার অপেক্ষায় দিন কাটছে শারমিন আক্তারের। আড়াই বছরের ছেলে আর এক বছরের মেয়েটি এখনো বোঝে না, তাদের বাবাকে ঘিরে কী ভয়াবহ অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তারা জানে না, বাবার সঙ্গে কবে দেখা হবে। আর মা শারমিনের বুকজুড়ে একটাই আকুতি- স্বামীর প্রকৃত অবস্থা জানতে চান তিনি। স্বামীকে ফিরে পাওয়ার আশার পাশাপাশি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছেন তিনি।

রাজুর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর মাঝিকান্দা গ্রামের বাড়িতে ভিড় করছেন স্বজন ও প্রতিবেশীরা। স্থানীয় বাসিন্দারাও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন। রাজুর মৃত্যুর খবর সত্য হলে তাঁর মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন তাঁরা।

তবে রাজুর পরিবারকে বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন প্রিন্স মাতুব্বরের ছোট ভাই রানা মাতুব্বর। তাঁর দাবি, রাশিয়ায় যাওয়ার ঝুঁকি সম্পর্কে রাজুকে আগেই সতর্ক করা হয়েছিল। রাজু নিজেই রাশিয়ায় অবস্থানরত প্রিন্সের সঙ্গে যোগাযোগ করে সেখানে যান। তাঁকে প্রতারণা করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠানোর অভিযোগ সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রিন্স মাতুব্বরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ফরিদপুরের সহকারী পুলিশ সুপার (নগরকান্দা সার্কেল) মোহাম্মদ আল ফাহাদ বলেন, বিদেশে চাকরির নামে প্রতারণার বিষয়ে সাধারণ মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে। রাজুর ঘটনায় পরিবারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রাজুর মৃত্যুর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি বা আনুষ্ঠানিক নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি। ফলে তাঁর পরিবার এখনো জানে না, প্রিয় মানুষটি কোথায় আছেন, কেমন আছেন। যে ছেলে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে বিদেশে গিয়েছিলেন, তাঁর খবরের অপেক্ষায় আজ প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে কান্না, উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তায়। দুই শিশুর ভবিষ্যৎ আর মা-বাবার শেষ ভরসা যেন আটকে আছে একটি নিশ্চিত খবরের অপেক্ষায়। পরিবারের একটাই আকুতি-রাজু বেঁচে থাকলে তাঁকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনা হোক, আর মৃত্যুর খবর সত্য হলে তাঁর প্রকৃত অবস্থা নিশ্চিত করে মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হোক।

(ঢাকা টাইমস/২৬অক্টোবর/এসএ)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
সাবেক এসবি প্রধান মনিরুলের শ্যালকের ব্যাংক হিসাবে হাজার কোটি টাকার লেনদেন, দুদকের মামলা
ভূমিমন্ত্রীর রোগমুক্তি কামনায় জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের দোয়া মাহফিল
শ্রীপুরে ইয়াবাসহ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাসহ গ্রেপ্তার ২
উত্তরা পূর্ব থানা ছাত্রদল সভাপতি গ্রেপ্তার