দেশে বাড়ছে মাদকের ব্যবহার, ঝুঁকিতে তরুণ প্রজন্ম

বাংলাদেশে মাদকের ব্যবহার উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। মাদক উৎপাদনকারী দেশ না হয়েও ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালানের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। এশিয়ার মাদক উৎপাদন ও পাচারের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল, গোল্ডেন ক্রিসেন্ট ও গোল্ডেন ওয়েজের কাছাকাছি অবস্থানের কারণে দেশটি আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিদের কাছে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিশেষ করে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের অন্তর্ভুক্ত মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে বিভিন্ন ধরনের মাদক প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে। মিয়ানমারে উৎপাদিত মেথামফেটামিন বা আইসের সম্ভাব্য বাজারগুলোর মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ কোনো না কোনো ধরনের অবৈধ মাদক ব্যবহার করছেন। যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। মাদক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি গাঁজা সেবন করেন। এ সংখ্যা প্রায় ৬১ লাখ।
বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মাদক ব্যবহারকারী ঢাকা বিভাগে। এ বিভাগে প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ মাদক ব্যবহার করেন। এরপর চট্টগ্রাম বিভাগে ১৮ লাখ ৭৯ হাজার এবং রংপুর বিভাগে প্রায় ১০ লাখ ৮০ হাজার মানুষ মাদক ব্যবহার করেন। সব মিলিয়ে দেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৮১ লাখ ৯৫ হাজার।
মাদক ব্যবহারের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গাঁজা বা ক্যানাবিসের পর রয়েছে ইয়াবা বা মেথামফেটামিন। দেশে ইয়াবা ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ। এ ছাড়া অ্যালকোহল ব্যবহার করেন প্রায় ২০ লাখ মানুষ। কোডিনযুক্ত কাশির সিরাপ, ঘুমের ওষুধ ও হেরোইনও ব্যবহৃত হচ্ছে। ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা প্রায় ৩৯ হাজার। তাঁদের মধ্যে এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, একজন মাদক ব্যবহারকারী গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ছয় হাজার টাকা মাদকের পেছনে ব্যয় করেন। অনেকেই একাধিক ধরনের মাদক গ্রহণ করেন।
মাদকের বিস্তার শুধু ব্যক্তির স্বাস্থ্য নয়, পরিবার ও সমাজের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। গত এক দশকে মাদকাসক্ত সন্তানের হাতে বাবা-মাকে হত্যা, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রাণঘাতী সহিংসতা এবং মাদককে কেন্দ্র করে নানা অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। মাদক গ্রহণের সঙ্গে চুরি, ছিনতাই, সহিংসতা ও পারিবারিক অস্থিরতার মতো অপরাধেরও সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের মতে, মাদকাসক্ত অবস্থায় গাড়ি চালানো সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্ত ও আকাশপথে মাদক প্রবেশ ঠেকাতে দুর্বলতা, বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং সামাজিক প্রতিরোধের ঘাটতি মাদকের বিস্তার নিয়ন্ত্রণকে কঠিন করে তুলছে।
চিকিৎসকদের মতে, মাদক শরীর ও মস্তিষ্কের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। স্বল্পমেয়াদে স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ কমে যেতে পারে। দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণের ফলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া, মানসিক সমস্যা, শারীরিক জটিলতা এবং আত্মহত্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে। মাদকের ধরন, মাত্রা ও ব্যবহারের সময়কালের ওপর এসব ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে।
কেন আসক্ত হচ্ছেন তরুণরা
চিকিৎসকদের মতে, জীবনের নানা হতাশা, মানসিক কষ্ট ও প্রতিকূল পরিস্থিতি থেকে সাময়িক মুক্তি পেতে কেউ কেউ মাদকের দিকে ঝুঁকছেন। বন্ধুদের সঙ্গে দূরত্ব, একাকিত্ব, হতাশা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বুলিংয়ের শিকার হওয়া, পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফল না পাওয়া, পারিবারিক সম্পর্কের অবনতি কিংবা নিছক কৌতূহল থেকেও আসক্তির শুরু হতে পারে। প্রযুক্তি ও অনলাইন গেমের অতিরিক্ত ব্যবহারও অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের দৈনন্দিন জীবন ও মানসিক স্বাস্থ্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
আসক্তি থেকে মুক্তির উপায়
বিশেষজ্ঞদের মতে, আসক্তি থেকে মুক্তির জন্য প্রথমেই এর পেছনের কারণ চিহ্নিত করা জরুরি। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা, কাউন্সেলিং ও পারিবারিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। প্রযুক্তি আসক্তি প্রতিরোধে সন্তানদের ডিভাইস ব্যবহারের সময় নির্ধারণ, রাতে পর্যাপ্ত ঘুমের পরিবেশ তৈরি এবং পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর সুযোগ বাড়ানোর পরামর্শ দেন তাঁরা।
মাদকাসক্তি একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা। তাই আসক্ত ব্যক্তিকে শাসন, ঘৃণা বা অবহেলা না করে সহানুভূতির সঙ্গে চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অনুমোদিত নিরাময়কেন্দ্রের সহায়তা নিতে হবে। চিকিৎসা শেষে পরিবার ও সমাজে স্বাভাবিকভাবে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু অভিযান বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা যথেষ্ট নয়। মাদকের সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি, পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সহজলভ্য চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে অপরাধী হিসেবে একঘরে না করে সুস্থ জীবনে ফেরার সুযোগ দিতে হবে।
মাদক মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। দীর্ঘদিন মাদক সেবনের ফলে মস্তিষ্কসহ শরীরের গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে স্মৃতিশক্তি, স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমে যায়। মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব শুধু ব্যক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে পরিবার ও সমাজেও।
শারীরিক স্বাস্থ্যে ক্ষতিকর প্রভাব
মাদক সেবনের অন্যতম বড় ক্ষতি হয় মস্তিষ্কে। বিভিন্ন ধরনের মাদক মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করে। এতে চিন্তাভাবনা, স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাহত হতে পারে।
কিছু মাদক দীর্ঘদিন গ্রহণ করলে লিভার ও কিডনির কার্যক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। বিশেষ করে অ্যালকোহল অতিরিক্ত গ্রহণের ফলে লিভারের সিরোসিসসহ গুরুতর রোগ দেখা দিতে পারে। আবার কিছু মাদক হৃদ্স্পন্দন ও রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি তৈরি করে।
মাদক গ্রহণের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাও দুর্বল হতে পারে। বিশেষ করে একই সুচ বা সিরিঞ্জ একাধিক ব্যক্তি ব্যবহার করলে হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি ও এইচআইভি সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে।
মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব
মাদক সেবনের কারণে বিষণ্নতা, উদ্বেগ, অস্থিরতা ও ঘুমের সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু মাদক গ্রহণের ফলে হ্যালুসিনেশন বা এমন কিছু দেখা ও শোনার অভিজ্ঞতা হতে পারে, যার বাস্তবে অস্তিত্ব নেই। দীর্ঘদিন মাদক গ্রহণে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও বিচার-বিবেচনার ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ ছাড়া মাদকাসক্ত ব্যক্তির আচরণেও পরিবর্তন আসতে পারে। কেউ কেউ খিটখিটে মেজাজ, অস্থিরতা ও আক্রমণাত্মক আচরণ প্রদর্শন করতে পারেন। তবে এসব প্রভাব মাদকের ধরন, গ্রহণের পরিমাণ ও ব্যক্তির শারীরিক-মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতি
মাদকাসক্তির কারণে পরিবারে অশান্তি, অবিশ্বাস ও আর্থিক সংকট তৈরি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দাম্পত্য কলহ, সম্পর্কের অবনতি এবং বিচ্ছেদের ঘটনাও ঘটে। মাদকের খরচ জোগাতে গিয়ে কেউ কেউ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন। এতে ব্যক্তি ও পরিবারের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
মাদককে কেন্দ্র করে চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটতে পারে। তবে মাদক গ্রহণকারী প্রত্যেক ব্যক্তি অপরাধে জড়ান—এমন ধারণা সঠিক নয়। বরং আসক্তিকে একটি চিকিৎসাযোগ্য স্বাস্থ্যসমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি।
প্রয়োজন সচেতনতা ও চিকিৎসা
মাদক একজন মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক জীবনযাপনকে ব্যাহত করতে পারে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পরিবার ও সমাজে। তাই মাদক থেকে দূরে থাকার পাশাপাশি মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার আওতায় আনা প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে ঘৃণা বা অবহেলা না করে সহানুভূতির সঙ্গে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত সচেতনতা এবং যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমেই মাদকের ক্ষতি কমানো সম্ভব।
মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসক, প্রশাসন ও সামাজিক সংগঠনগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আসক্ত ব্যক্তিকে ঘৃণা নয়, প্রয়োজন চিকিৎসা ও সহমর্মিতা—এমন সচেতনতাই পারে তরুণ প্রজন্মকে মাদকের ভয়াবহ পরিণতি থেকে রক্ষা করতে।
(ঢাকাটাইমস/০২ নভেম্বর/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













