‘আন্দোলন’ বিএনপির ভেতরে

বোরহান উদ্দিন, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৯ মে ২০১৭, ১০:৪৮

দলকে সাংগঠনিকভাবে ‘শক্তিশালী’ ও চাঙ্গা করে সরকারবিরোধী আন্দোলনের জন্য প্রস্তুত করতে গিয়ে বিএনপির ভেতরেই শুরু হয়ে গেছে ‘আন্দোলন’।  কেন্দ্রীয় নেতাদের সফরকে কেন্দ্র করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে দলীয় কোন্দল, ঘটছে সংঘর্ষ। নানা চেষ্টা করেও সামাল দিতে পারছে না বিএনপির কেন্দ্র। একদিকে নেতাকর্মীরা হতাহত হচ্ছেন অন্যদিকে ইন্ধনের অভিযোগে দল থেকে অব্যাহতি পাচ্ছেন নেতাদের কেউ কেউ।

দলের নেতাকর্মীরা বলছেন, কেন্দ্রীয় নেতাদের সফরকে কেন্দ্র কোন্দল মাথাচাড়া দেয়ায় ভেস্তে যেতে বসেছে দলকে শক্তিশালী করার প্রয়াস।

তবে কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ কেউ এমন কোন্দলের খবরকে বড় করে দেখতে নারাজ। তারা বলছেন, বিএনপির একটি বড় রাজনৈতিক দল। সেখানে প্রতিযোগিতা থাকা স্বাভাবিক। সে কারণে টুকটাক সংঘর্ষ হতেই পারে। তবে এর পেছনে সরকারের ইন্ধন আছে বলে অভিযোগ বিএনপি নেতাদের।

২০০৬ সাল থেকেই ক্ষমতার বাইরে বিএনপি। কয়েক দফা আন্দোলন, মামলা, হামলা ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দীর্ঘসময় মূল দল ও অঙ্গ সংগঠনের কমিটি না হওয়ায় নাজুক হয়ে পড়েছে দলের সাংগঠনিক অবস্থা। ফলে বেড়েছে দলের ভেতর কোন্দল।

বিএনপি প্রধান এমন পরিস্থিতি পাল্টাতে উদ্যোগী কেন্দ্রীয় নেতাদের নিয়ে দল পুনর্গঠনের লক্ষ্য হিসেবে ৫১টি টিম গঠন করেন। টিমের সদস্যরা সারাদেশের ৭৫ টি সাংগঠনিক জেলায় সফর শুরু করেছেন। কিন্তু নেতাদের এই সফরকে কেন্দ্র করে ঘটছে সংঘর্ষ-মারামারি।

এমনটা চলতে থাকলেও পরিস্থিতি সামলাতে না পারলে ফলাফল কী হবে তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন সংশ্লিষ্ট নেতারা। 

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশররফ হোসেন বিভিন্নস্থানে নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষের কথা স্বীকার করে ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘কিছু অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছে। তবে বড় দলের মধ্যে স্বাভাবিকভাবে একটু ঝামেলা থাকতে পারে। এটাকে খুব বড় করে দেখার কিছু নাই। ’

তবে পিরোজপুর, মাদারীপুরসহ বেশ কিছু জায়গায় পুলিশি বাধার মুখে কর্মীসভা করতে পারেনি বিএনপি। অনেক জায়গায় পুলিশের সঙ্গে বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের খবরও পাওয়া গেছে।

গত ৩ মে চট্টগ্রামের পটিয়া পৌরসভা সদর টুডে কমিউনিটি সেন্টারে এক সমাবেশে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশারফ হোসেনের উপস্থিতিতে দলের দুই পক্ষে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হয় অন্তত ২০ জন। 

চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির সহ-সভপতি এনামুল হক এনামের অনুসারী শতাধিক নেতাকর্মী মিছিল নিয়ে সেখানে পৌঁছায়। সেখানে তাদের প্রতিপক্ষ বিএনপি দলে অপর সমর্থক পটিয়া উপজেলার সাবেক সংসদ সদস্য ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান জুয়েলের সমর্থকরা এনামের সমর্থকদের পিটুনি দেয়। 



এর আগের দিন বিকালে চট্টগ্রামেরই কাজীর দেউড়িতে মহানগর বিএনপির কার্যালয় নাসিমন ভবনে উত্তর জেলা বিএনপির কর্মী সভায় বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান গিয়াসউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরীর সমর্থকদের মধ্যেও সংঘর্ষ হয়। সেখানেও ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশারফ হোসেনসহ নগর বিএনপির নেতারা।  সংঘর্ষ ব্যাপক হলে খন্দকার মোশারফ হোসেন মঞ্চ ছেড়ে চলে যান এবং কর্মী সভা পণ্ড হয়ে যায়। 

৩ মে ঝিনাইদহ শহরের পৌর কমিউনিটি সেন্টারে বিএনপির প্রতিনিধি সভায় দুই পক্ষের মধ্যে তুমুল সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। অনুষ্ঠান শুরু হলে দাওয়াত না পাওয়া জেলা বিএনপির নতুন কমিটির শৈলকূপার ১৭ জন নেতার সমর্থকরা কমিউনিটি সেন্টারের সামনে হট্টগোল শুরু করে। এক পর্যায়ে তারা ভেতরে ঢুকতে গেলে উভয়ের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়। এরপর ঢুকতে না পারা নেতাকর্মীরা কমিউনিটি সেন্টারে হামলা চালান। তাদের ইটপাটকেলে কমিউনিটি সেন্টারের জানালার কাঁচ ভেঙে পড়তে থাকে। এসময় ইট ও কাঁচের আঘাতে ভেতরে থাকা ১৫ জন নেতাকর্মী আহত হয়। 

ঝিনাইদহের দায়িত্ব পাওয়া জয়নুল আবেদিন ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘বড় দলগুলোতে মাঝেমধ্যে এ ধরণের বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটে। আমরা তো এখন বিরোধী দলে আছি। ক্ষমতাসীন দলেও মাঝে মধ্যে এ ধরনের ঘটনা ঘটছে।’ 

বিএনপির এই নেতা আরও বলেন, ‘আমাদের কিন্তু সারাদেশে এ রকম ঘটনা ঘটছে না। যে এলাকায় এই এরকম হয়েছে, আমরা সে সম্পর্কে কেন্দ্রকে জানিয়েছি। তারা বিষয়টি দেখবে।’ 

বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির তৃনমূল কর্মীসভায় দুই পক্ষের মধ্যেও তুমুল হট্টগোল, চেয়ার ছোড়াছুড়ি এবং হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষের সময় প্রধান অতিথি বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস সভাস্থলে এসে পৌঁছাননি। তবে উপস্থিত ছিলেন দলের ভাইস চেয়ারম্যান বেগম সেলিমা রহমান ও জয়নাল আবেদীনসহ অন্যান্য নেতারা।

গত ১৪মে বিকালে ঢাকা জেলা বিএনপির প্রতিনিধি সভায় গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ও আমান উল্লাহ আমানের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এক পর্যায়ে বক্তব্য না দিয়েই মঞ্চ ত্যাগ করেন গয়েশ্বর। আমানও পরে

১৫ মে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে রাজশাহীতে। গণমাধ্যমের কারণে দেশব্যাপী এই সংঘর্ষের ঘটনা তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। মহানগর বিএনপির সভাপতি মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের সভাপতিত্বে এই কর্মী সম্মেলন শুরু হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দেন স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়। সমাবেশে সংঘর্ষ শুরু হওয়ায় তড়িঘড়ি করে সমাবেশ শেষ করা হয়।

তাতেও থামেনি বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীদের ক্ষোভ। সমাবেশ শেষ করে নেতাকর্মীরা বেরিয়ে যাওয়ার সময়ও সংঘর্ষ চলে। গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের উপস্থিতি কর্মী সভায় চেয়ারে বসা নিয়ে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। শুধু তাই নয়, প্রথম দিনের মারামারির রেশ পরের দিন পর‌্যন্ত চলে।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে রাজশাহীর হযরত শাহমখদুম বিমানবন্দরে ফেরত দেয়ার সময় রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল হক মিলনের হাতে জেলার সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টুর শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু ঢাকাটাইমসকে বলেন, ‘সারাদেশে আমাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলছে। সেখানে সরকারের মদদে কোন কোন জায়গায় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। আমরা নেতাকর্মীদের কাছে শুনতে যাচ্ছি কিন্তু সরকার তা শোনার সুযোগ দিচ্ছে না। কর্মসূচিও করতে দিচ্ছে না। আর হামলা, সংর্ঘষের যেসব ঘটনা এর পেছনে সরকারের মদদে আছে বলে আমরা মনে করি।’

তবে বিএনপির এই অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে নয়, ঘুরে দাঁড়িয়েছে নিজেদের বিরুদ্ধেই।’ গত ১৬ মে রাজধানীতে এক আলোচনায় তিনি বলেন, ‘আজকে তারা ভিশনের বিপরীতে ভিশন দিয়ে বলছে তাদের দল নাকি চাঙা হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে দলীয় কোন্দলের কারণে ভালভাবে সভা, সমাবেশ ও করতে পারে না। যার ফলে এখন তারা নিজেরা নিজেদের বিপরীতে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সরকারের বিপক্ষে নয়।’

(ঢাকাটাইমস/১৯মে/বিইউ/ডব্লিউবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

রাজনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত