প্রভাবশালীরা বিচারের আওতায় আসছে কি না?

আশিক আহমেদ,ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২০ মে ২০১৭, ১৪:৪৩ | প্রকাশিত : ২০ মে ২০১৭, ০৮:৪৬

সমাজে প্রচালিত ধারণা হচ্ছে, আছে প্রভাবশালীদের বিচার হয় না। একটি প্রভাবশালী পরিবারের সদস্যের বনানী ধর্ষণের অভিযোগ উঠার পরও একই সংশয়ের কথা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলাবলি হচ্ছিল। কিন্তু এই ধর্ষণে নাম আসা সবাই এরই মধ্যে গ্রেপ্তার হয়েছেন। রিমান্ডে নেয়া হয়েছে পাঁচ জনকেই।

এর আগেও নানা সময় দেখা গেছে, কোনো ঘটনায় প্রভাবশালীর নাম আসলেই ঢালাও বক্তব্য আসে যে, কারও কিছু হবে না। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরেই দেখা গেছে, কোনো ঘটনায় নাম আসা প্রভাবশালী বা তার পরিবারের সদস্যরা রেহাই পাননি বললেই চলে। 

সংসদ সদস্য, বড় ব্যবসায়ী, আমলা বা তাদের সন্তান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও গ্রেপ্তার হয়েছেন, হয়েছেন বিচারের মুখোমুখি। তবে দীর্ঘসূত্রতায় বিচারপ্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না দ্রুত। তবে সেটি কেবল প্রভাবশালীদের মামলা নয়, সব মামলার ক্ষেত্রেই একই কথা প্রযোজ্য।

মামলার পর পরই ভূমিমন্ত্রীর ছেলে গ্রেপ্তার

বৃহস্পতিবার পাবনার ঈশ্বরদীতে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও মুক্তিযোদ্ধার বাড়িতে হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনায় মামলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই গ্রেপ্তার হয়েছেন মামলায় ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান ডিলুর ছেলে শিরহান শরীফ ও আরও ১০ সহযোগী।

আপন জুয়েলার্সের মালিকের ছেলের রিমান্ড

বনানী ধর্ষণের মামলার আসামি আপন জুয়েলার্সের মালিক দিলদার আহমেদ সেলিমের ছেলে সাফাত আহমেদ, রেগনার গ্রুপের মালিক মোহাম্মদ জনির ছেলে সাদমান সাকিফ, সাফাতের বন্ধু নাঈম আশরাফ, গাড়িচালক বিল্লাল ও দেহরক্ষী রহতম আলী গ্রেপ্তার হয়েছেন মামলার দুই সপ্তাহের মধ্যেই।

গ্রেপ্তারের পর পর পাঁচ জনকেই রিমান্ডে নেয়া হয় এবং এদের মধ্যে সাফাত ও সাদমান এরই মধ্যে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিচার

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জে সাত জনকে তুলে নিয়ে হত্যার পর পর ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে র‌্যাবের স্থানীয় কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে। আর এই অভিযোগ উঠার সঙ্গে সঙ্গে এমন প্রচারও হয়েছে যে, আসলে এই ঘটনায় কারও বিচার হবে না।

যেসব কারণে বিচার হবে না বলা হয়েছে সেগুলো হল, প্রথমত. আসামিরা সবাই র‌্যাবের সদস্য, তিনজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। এদের মধ্যে একজন আবার মন্ত্রীর জামাতা। দ্বিতীয়. প্রধান আসামি নুর হোসেন আওয়ামী লীগের নেতা।

কিন্তু ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি চাঞ্চল্যকর এই মামলায় নূর হোসেন ও সাবেক তিন র‌্যাব কর্মকর্তাসহ ২৬ আসামির ফাঁসির রায় হয়েছে। উচ্চ আদালতেও মামলাটির দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

হত্যা মামলায় কারাগারে সংসদ সদস্য রানা

মুক্তিযোদ্ধা ও আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক আহমেদ হত্যা মামলায় দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী রয়েছেন টাঙ্গাইল ৩ আসনের সংসদ সদস্য আমিনুর রহমান খান রানা।

২০১৩ সালের ১৮ জানুয়ারি রাতে ফারুক আহমদের গুলিবিদ্ধ লাশ টাঙ্গাইলে তাঁর কলেজপাড়ার বাসার সামনে থেকে উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার তিন দিন পর তাঁর স্ত্রী নাহার আহমেদ টাঙ্গাইল মডেল থানায় মামলা করেন। ২০১৪ সালের আগস্টে এ মামলায় আনিছুল ইসলাম ওরফে রাজা ও মোহাম্মদ আলী নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেন, সাংসদ আমানুর রহমান খান ও তাঁর তিন ভাই ফারুক হত্যায় জড়িত। আর ২০১৬ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ডিবি পুলিশ সাংসদ রাতা, তাঁর তিন ভাইসহ ১৪ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে। ২২ মাস পলাতক থাকার পর গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর আমানুর আদালতে আত্মসমর্পণ করেন।

কারাগারে গেছেন লতিফ সিদ্দিকীও

ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের মামলায় কারাগারে গেছেন আওয়ামী লীগের সাবেক নেতা লতিফ সিদ্দিকীকেও কারাগারে যেতে হয়েছে। ২০১৪ সালের গত ২৮ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে এক অনুষ্ঠানে হজ বিরূপ মন্তব্য করায় মন্ত্রিসভা ও দল থেকে অপসারিত হন লতিফ সিদ্দিকী। পরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার অভিযোগে লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে ঢাকা ও দেশের ১৮টি জেলায় ২২টি মামলা হয়। ওই বছরের  গত ২ অক্টোবর লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এমপিপুত্র রনি এখনও কারাগারে

রাজধানীর ইস্কাটনের জোড়া খুনের মামলার আসামি সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য পিনু খানের ছেলে বখতিয়ার আলম রনিকে বিচার মুখোমুখি করা হয়েছে। ২০১৫ সালের ১৩ এপ্রিল রাত পৌনে দুইটার দিকে তার গাড়ি থেকে ছোড়া গুলিতে অটোরিকশাচালক ইয়াকুব আলী ও রিকশাচালক আবদুল হাকিম আহত হন বলে অভিযোগ উঠে। পরে তারা হাসাপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তারা মারা যান।

ওই ঘটনায় নিহত হাকিমের মা মনোয়ারা বেগম অজ্ঞাতদের আসামি করে মামলা করেন। ওই বছরের ৩০ মে এলিফ্যান্ট রোডের বাসা থেকে এই ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহে বখতিয়ার আলম রনিকে গ্রেপ্তার করে ডিবি পুলিশ।

মামলাটিতে ২০১৫ সালের ২১ জুলাই ডিবি পুলিশের উপপরিদর্শক দীপক কুমার দাস রণির বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

মামলাটিতে বখতিয়ার আলম রনিকে তিনদফা দশ দিনের রিমান্ড শেষে ২০১৫ সালের ২ জুলাই আদালতে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর থেকে তিনি কারাগারেই রয়েছেন।

বদির কারাভোগের পর মুক্তি

সরকারি দলের এমপি আবদুর রহমান বদিকেও যেতে হয়েছে কারাগারে। চলতি বছরের  ২ নভেম্বর সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে বদিকে তিন বছরের কারাদন্ড ও দশ লাখ টাকা জরিমানার আদেশ দেয় ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩। জরিমানা অনাদায়ে আরো তিন মাস কারাদন্ড দেয়া হয়। বর্তমানে তিনি উচ্চ আদালতের আদেশে জামিনে রয়েছেন।

এমপির ছেলে রাশেদ সারোয়ার গ্রেপ্তার

চলতি বছরের ২৭ জানুয়ারি  সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য রিফাত আমিনের ছেলে রাশেদ সারোয়ার রুমনসহ চারজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগে সাতক্ষীরায় একটি মামলা হয়েছে। এ ঘটনায় তাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায় পুলিশ।  সাতক্ষীরা সদর থানার  ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফিরোজ হোসেন মোল্লা জানান, শুক্রবার সিরাজুল ইসলাম নামে এক ব্যবসায়ী মামলাটি দায়ের করেন।

বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ডে ছাত্রলীগ নেতাদের বিচার

পুরান ঢাকার দর্জি দোকানী বিশ্বজিৎ দাস হত্যা মামলায় আটজনকে মৃত্যুদন্ড এবং ১৩ জনকে যাবজ্জীবন কারাদন্ড দেয় আদালত। এদের অধিকাংশই জগন্নাথ  বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ২০১২ সালের  ৯ বাসা থেকে তাঁতীবাজারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার পথে বিশ্বজিৎ দাসকে জজকোর্ট এলাকায় চাপাতি দিয়ে উপর্যপুরী কোপানো হয়। প্রাণ বাঁচাতে জীবন ভিক্ষা চেয়ে দৌড়ে পাশের একটি ক্লিনিকে গিয়ে আশ্রয় নিয়েও শেষ রক্ষা হয়নি তার।

হল-মার্ক কেলেঙ্কারিতে কোটিপতি তানভীর স্ত্রীসহ গ্রেপ্তার

দেশে বিদেশে আলোড়ন সৃষ্টি করা হল-মার্ক কেলেঙ্কারির মামলায় গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর মাহমুদ ও চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলামকে ঋণ কেলেঙ্কারির দুই মামলায় অভিযুক্ত করে বিচার শুরুর আদেশ দিয়েছে  আদালত।

দুদকের দায়ের করা এসব মামলার একটিতে জেসমিন ও তার স্বামী তানভীরসহ আসামি মোট ১৯ জন; অন্য মামলায় ১৮ জন। আসামিদের সবাই শুনানিতে নিজেদের নির্দোষ দাবি করে ন্যায়বিচার চান।

২০১০ থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত সময়ে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে অনিয়মের মাধ্যমে হল-মার্ক গ্রুপের আড়াই হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার ঘটনা প্রকাশ পেলে ব্যাপক শোরগোল ওঠে।

ওই অভিযোগের ভিত্তিতে ২০১২ সালের অগাস্টে আর্থিক খাতে বড় এই কেলেঙ্কারির ঘটনার অনুসন্ধান ও তদন্ত শুরু করে দুদক। প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে ওইবছর ৪ অক্টোবরে মোট ১১টি মামলা করা হয়, যার মধ্যে এই দুই মামলাও রয়েছে।

বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে বড় কর্মকর্তা অপসারণ, গ্রেপ্তার হননি কেউ

রাষ্ট্র মালিকানাধীন বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারিতে অর্থমন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি প্রতিষ্ঠানটির সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চু অভিযুক্ত বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। গত মার্চে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠান শেষে অর্থমন্ত্রী এ কথা জানান।

ঋণ কেলেঙ্কারি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাচ্চুর বিরুদ্ধে কয়েকবার অনুসন্ধান করলেও তার সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়নি। পরে অর্থ মন্ত্রণালয় তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি তার সম্পৃক্ততা খুঁজে পায়।

বাচ্চুর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হবে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, বাচ্চুর সম্পৃক্ততার একটি রিপোর্ট দুদকের কাছে দেয়া হয়েছে। দেখা যাক কি হয়, পরে কি পদক্ষেপ নেয়া যায়। ইনভেস্টিগেশনে- হি হ্যাজ বিন ব্লেম ইন ঋণ কেলেঙ্কারি। ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট প্রকাশ করা হবে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট আপাতত প্রকাশ করা হবে না। রিপোর্ট সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পাবে। পরবর্তীতে দুদক মেইক এ ডিসিশন। ২০০৯ সাল থেকে ২০১২ সালের মধ্যে বেসিক ব্যাংকের তিনটি শাখা থেকে সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা ঋণ অনিয়মের অভিযোগ উঠে বাচ্চুর বিরুদ্ধে। পরে অনুসন্ধানে নামে দুদক। চার বছর তদন্তের পর দুদক ১৮টি মামলা করলেও বাচ্চুকে আসামি করা হয়নি। যদিও ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অভিযোগের আঙুল ছিল বাচ্চুর বিরুদ্ধে। ঋণ কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠলে ২০১৪ সালে ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করার পর চাপের মুখে থাকা বাচ্চু পদত্যাগ করেন।

অপরাধ করে সমাজের বড় মানুষগুলো পার পেয়ে যায় মর্মে সামাজিক সাধারণ ধারণার বিষয়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক নূর খান ঢাকাটাইমসকে বলেন, সংঘঠিত যে বিষয় গুলো সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা ইলেকট্রনিক্স মিডিয়ায় আসে শুধুমাত্র সেইগুলো ঘটনায় প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। আমরা যদি টাঙ্গাইলের এমপির জেলে যাওয়ার উদাহরণ দেই তাহলে বলতে হবে সেটা ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল। বর্তমান পরিস্থিতিতে এখনও বলার সময় আসেনি যে বিচার ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। তাহলে দেশে গুমের মত ঘটনা ঘটত না।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক আইজিপি একেএম নূরুল হুদা ঢাকাটাইমসকে বলেন, কোন আইনে কী বলা আছে যে প্রভাবশালীদের বিচারের মুখোমুখি করা যাবে না? কেউ অপরাধ করলে বিচারের সম্মুখীন হবে, এটাইতো স্বাভাবিক। আর যদি কেউ অপরাধীদের বিচারের আওতায় না আনেন সেটা তাদের গাফিলতি।

এ ব্যাপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আ ক ম জামাল উদ্দিন ঢাকাটাইমসকে বলেন, প্রভাবশালী ও দরিদ্রের বিবেচনায় বিচার হয় না। তবে দুয়েকটি ঘটনায় পুরো সমাজের মূল্যায়ন করা উচিত হবে না। তুলনামূলক হিসাব করলে প্রভাবশালীদের তেমনভাবে বিচারের আওতায় আনা যায়নি।

ঢাকাটাইমস/১৯মে/এএ/ ডব্লিউবি/এসএএফ

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত