অব্যাহত পতনে দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা

ইউনুছ আলী আলাল, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ২৮ মে ২০১৭, ১০:২৭ | প্রকাশিত : ২০ মে ২০১৭, ১৫:১৯

দেশের উভয় পুঁজিবাজারে ধারাবাহিকভাবে সূচক ও লেনদেনে মন্দা। এ পরিস্থিতে কমছে বেশিরভাগ কোম্পানির শেয়ার দর। দরপতনের কবল থেকে কিছুতেই যেন মুক্তি মিলছে না। সূচক একদিন বাড়ে তো কয়েকদিন কমে। যতটুকু সূচক বাড়ছে তার চেয়ে বেশি সূচক কমে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে বাজারে নতুন ইস্যুর দরকার বলে মনে করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা।

বাজেট যত ঘনিয়ে আসছে পুঁজিবাজার তত বেশি মন্দার কবলে পড়েছে। এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত প্রায় প্রতিদিনই সূচক কমছে। সূচকের পতন শেষ পর্যন্ত কোথায় যাবে-এ নিয়ে চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন বিনিয়োগকারীরা। প্রতিদিন কমছে শেয়ারের দর। মন্দা বাজারে শেয়ার বিক্রি করে বের হলেও ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পুঁজি হারাতে হবে। তাই বিনিয়োগকারীরা দিশেহারা অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন। অনেকেই দুশ্চিন্তায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। কেউ কেউ সন্দেহ করছেন, গত আট মাসে বাজারকে কৃত্রিমভাবে বাড়ানো হয়েছিল কি না?

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পুঁজিবাজারের বিভিন্ন নীতি-নির্ধারক ও স্টক হোল্ডারদের সমন্বয়হীনতার কারণে পুঁজিবাজারে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হচ্ছে। বিশেষ করে একই ইস্যুতে নীতি-নির্ধারকদের ভিন্ন মত, আইনের সদ্ব্যবহার না হওয়াসহ নানা ইস্যুতে বাজারের স্বাভাবিক গতি ফিরে আসছে না। এছাড়া কারসাজি চক্রের দৌরাত্ম, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, আইনি জটিলতা ও নীতি-নির্ধারণী মহলের উদাসীনতায় দুর্বল কোম্পানিকে বাজার থেকে অর্থ সংগ্রহের অনুমোদন দেয়ায় বাজারের ওপর সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আস্থার সঙ্কট বাড়ছে। এতে বাজারে সব শ্রেণির বিনিয়োগকারী সমানতালে অংশগ্রহণ না করায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লোকসানের পাল্লা ক্রমেই ভারি হচ্ছে।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের ৪ এপ্রিল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) বাজার মূলধনের পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৮৪ হাজার ৭৪৯ কোটি ২৮ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার মূলধনের পরিমাণ দাঁড়ায় তিন লাখ ৬৭ হাজার ৪৬৫ কোটি ৮৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। অর্থাৎ মাত্র ৩১ কার্যদিবসের ব্যবধানে বাজার মূলধন কমেছে ১৭ হাজার ২৮৩ কোটি ৩৯ লাখ ৭৮ হাজার টাকা।

২০১০ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময় বাজার স্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিলেও বারবার তা পতনের বৃত্তে ঘূর্ণায়মান। মাঝে মধ্যে বাজারে কয়েকবার আশার আলো উঁকি মারলেও তা মিলিয়ে যেতে সময় লাগেনি। এতে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের লোকসান কমার বদলে বাড়ছে। মূলত রাজনৈতিক স্বদিচ্ছার কারণে সরকারি প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত না হওয়া, শাস্তি দিতে ধীরগতি, জরিমানার নামে প্রহসন, কোম্পানিগুলোতে প্রফেশনাল ম্যানেজম্যান্ট ও গুড গভর্ন্যান্স না থাকা, নীতি-নির্ধারণী মহলের সমন্বয়হীনতা, ওটিসি মার্কেটের বেহাল দশা, দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগে অনীহা, আইপিও অনুমোদনে অস্বচ্ছতা এবং আর্থিক প্রতিবেদন তৈরিতে অনিয়মের কারণেই বিনিয়োগকারীরা বাজারে আস্থা রাখতে পারছেন না। এতে বাজার হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক গতি।

সমাপ্ত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সব ধরনের মূল্য সূচকের সঙ্গে কমেছে লেনদেন। আলোচ্য সপ্তাহে লেনদেন কমার পরিমাণ ছিল ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। ঢাকা স্টক একচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, গত সপ্তাহে পাঁচ কার্যদিবসে দুই হাজার ৯৭০ কোটি ৫০ লাখ টাকার শেয়ার লেনদেন হয়েছে। যা এর আগের সপ্তাহে চার কার্যদিবসে ছিল দুই হাজার ৮৩১ কোটি ২৯ লাখ টাকার শেয়ার। চার কার্যদিবস হিসাবে তুলনা করলে দেখা যায়, গত সপ্তাহে লেনদেন কমেছে ৪৫৪ কোটি ৮৮ লাখ ৯৬ হাজার টাকা বা ১৬.০৬ শতাংশ।

সমাপ্ত সপ্তাহে ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৯৩ দশমিক ১৪ শতাংশ। ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানির লেনদেন হয়েছে তিন দশমিক ৬৮ শতাংশ। ‘এন’ ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে এক দশমিক ৯৫ শতাংশ। ‘জেড’ ক্যাটাগরির লেনদেন হয়েছে এক দশমিক ২৩ শতাংশ।

ডিএসই ব্রড ইনডেক্স বা ডিএসইএক্স সূচক কমেছে এক দশমিক ৭৬ শতাংশ বা ৯৬.৫৫ পয়েন্ট। সপ্তাহের ব্যবধানে ডিএসই৩০ সূচক কমেছে এক দশমিক ৫৯ শতাংশ বা ৩২.১৬ পয়েন্ট। অপরদিকে, শরিয়াহ বা ডিএসইএস সূচক কমেছে এক দশমিক ৪৩ শতাংশ বা ১৮.২২ পয়েন্ট।

সপ্তাহজুড়ে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত মোট ৩৩৩টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এরমধ্যে দর বেড়েছে ১০৩টি কোম্পানির। আর দর কমেছে ২০২টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৬টির। আর লেনদেন হয়নি দুটি কোম্পানির শেয়ার।

চট্টগ্রাম স্টক এক্সেচঞ্জে (সিএসই) লেনদেন হয়েছে ১৭৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকার শেয়ার। তবে সার্বিক সূচক কমেছে এক দশমিক ৮৯ শতাংশ। সপ্তাহজুড়ে সিএসইতে তালিকাভুক্ত মোট ২৮১টি কোম্পানি ও মিউচ্যুয়াল ফান্ডের শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এরমধ্যে দর বেড়েছে ৭৭টি কোম্পানির। আর দর কমেছে ১৯০টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ১৪টির।

বিদায়ী সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেনের শীর্ষে রয়েছে ইফাদ অটোস লিমিটেড। আলোচ্য সপ্তাহে কোম্পানিটির শেয়ার দর বেড়েছে ৬.৫১ শতাংশ। ডিএসই সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

আলোচ্য সপ্তাহে কোম্পানিটির এক কোটি ২০ লাখ ২৫ হাজার ৭৭টি শেয়ার লেনদেন হয়েছে। যার বাজার মূল্য ১৬২ কোটি ১৫ লাখ ৭৮ হাজার টাকা। তালিকার দ্বিতীয় স্থানে থাকা ডরিন পাওয়ার জেনারেশনস অ্যান্ড সিস্টেমস লিমিটেডের শেয়ার দর ১.৮২ শতাংশ বেড়েছে। আলোচ্য সপ্তাহে কোম্পানিটির ৮৯ লাখ ৫০ হাজার ৮১২টি শেয়ার লেনদেন হয়েছে। যার বাজার মূল্য ১২০ কোটি ১৪ লাখ ৪৬ হাজার টাকা। তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে প্যারামাউন্ট টেক্সটাইল লিমিটেড। গত সপ্তাহে কোম্পানিটির তিন কোটি চার লাখ ৫৮ হাজার ৮৩৭টি শেয়ার লেনদেন হয়েছে। যার বাজার মূল্য ৯৪ কোটি ৬১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। তালিকায় থাকা অন্য কোম্পানিগুলো হচ্ছে- লংকাবাংলা ফাইন্যান্স, রতনপুর স্টিল রি-রোলিং মিলস, বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন, ইউনাইটেড পাওয়ার, এসিআই লিমিটেড, ন্যাশনাল ফিড এবং শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি।

ডিএসইতে পিই রেশিও কমেছে: সমাপ্ত সপ্তাহে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সার্বিক মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) কমেছে। আগের সপ্তাহের চেয়ে পিই রেশিও কমেছে দশমিক ২৭ পয়েন্ট বা এক দশমিক ৭৩ শতাংশ। ডিএসই সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

ডিএসইর তথ্য অনুযায়ী, আলোচ্য সপ্তাহে ডিএসইতে পিই রেশিও অবস্থান করছে ১৫ দশমিক ৩০ পয়েন্টে। এর আগের সপ্তাহে ডিএসইর পিই রেশিও ছিল ১৫ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট। বিশ্লেষকদের মতে, পিই রেশিও যতদিন ১৫ এর ঘরে থাকে ততদিন বিনিয়োগ নিরাপদ থাকে।

সপ্তাহ শেষে খাতভিত্তিক ট্রেইলিং পিই রেশিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যাংক খাতের পিই রেশিও অবস্থান করছে আট পয়েন্টে, সিমেন্ট খাতের ২৫.৬ পয়েন্টে, সিরামিক খাতের ২৬.১ পয়েন্টে, প্রকৌশল খাতের ২২.২ পয়েন্টে, খাদ্য ও আনুষাঙ্গিক খাতের ২৪.৫ পয়েন্টে, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ১২.৮ পয়েন্টে, সাধারণ বীমা খাতে ১২.৩ পয়েন্টে, তথ্য ও প্রযুক্তি খাতে ২৫.৫ পয়েন্টে, পাট খাতের মাইনাস ২১.৯ পয়েন্টে, বিবিধ খাতের ২৮.১ পয়েন্টে, এনবিএফআই খাতে ২০.৮ পয়েন্ট, কাগজ খাতের মাইনাস ৩৩.২ পয়েন্টে, ওষুধ ও রসায়ন খাতের ১৯.৭ পয়েন্টে, সেবা ও আবাসন খাতের ১৬.৭ পয়েন্টে, চামড়া খাতের ১৭.৬ পয়েন্টে, টেলিযোগাযোগ খাতে ১৯.১ পয়েন্টে, বস্ত্র খাতের ২৫.৯ পয়েন্টে এবং ভ্রমণ ও অবকাশ খাতে ২২.৮ পয়েন্টে অবস্থান করছে।

(ঢাকাটাইমস/২০মে/ইউএ/জেডএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত