গুজব হয়ে উঠেছে প্রাণঘাতী

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ১৩ জুলাই ২০১৯, ০৮:৪০
গুজব ছড়ানোর অভিযোগে আটক পাঁচজন

পদ্মা সেতুর জন্য ‘মাথা সংগ্রহে আসার’ গুজব ছড়ানোর পর যার-তার ওপর চড়াও হচ্ছে মানুষ। একাধিক জেলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছে বহু মানুষ।

খোদ রাজধানীর মোহাম্মদপুরে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে একজনকে। আরও একাধিক মানুষ গুরুতর আহত অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি। তাদের একটাই অপরাধ, এলাকাবাসী চিনতে পারেনি, ফলে শিকার হতে হয়েছে পিটুনির।

নারায়ণগঞ্জে সন্তানকে নিতে এসে পিটুনির শিকার হয়েছেন এক বাবা। খুলনায় অচেনা নারীকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে বেদম পেটানো হয়েছে। যশোরে মারধর করা হয়েছে এক প্রতিবন্ধীকে। আরও নানা এলাকায় ঘটেছে নানা ঘটনা।

গত কয়েক দিন ধরে ফেসবুক, ইউটিউবের মতো সামাজিক মাধ্যমগুলো পদ্মা সেতু নিয়ে গুজবে সয়লাব। একের পর এক ভুয়া ও কারসাজি করা ছবি ও কথিত প্রমাণ দিয়ে ভিডিও ছড়ানো হচ্ছে। বলা হচ্ছে, পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য এক লাখ মানুষের মাথা প্রয়োজন। এজন্য ৪২টি দল দেশের বিভিন্ন এলাকায় নেমে পড়েছে। তারা বিশেষত শিশুদের হত্যা করে মাথা নিয়ে আসছে।

পরিস্থিতি এতটাই উদ্বেগজনক অবস্থায় পৌঁছেছে যে, সরকারকে বিবৃতি দিয়ে বলতে হয়েছে এই ধরনের প্রচারে কোনো ভিত্তি নেই। যে মাধ্যমে গুজব ছড়ানো হয়েছে সেই ফেসবুকসহ মূলধারার গণমাধ্যমেও প্রচার করা হচ্ছে এসব প্রচার বিশ্বাস না করতে। গুজব ছড়াচ্ছে যারা, তাদের বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে সাঁড়াশি অভিযান। কিন্তু দেশবাসীর মধ্যে গুজবের প্রচার কতটা প্রভাব ফেলেছে, সেটা বোঝা যাচ্ছে নানা ঘটনায়।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের চান মিয়া হাউজিং এলাকায় রাস্তা দিয়ে দৌড়ে যাচ্ছিলেন এক ব্যক্তি। হঠাৎ পেছন থেকে একজন চিৎকার করলেন ‘কল্লা কাটা’। আগপাছ না ভেবে আশপাশে থাকা লোকজন ওই ব্যক্তিকে ধরে গণপিটুনি শুরু করে। মারাত্মক আহত হন ওই ব্যক্তি। পরে জানা গেল, তিনি তার গন্তব্যে দ্রুত পৌঁছাতে দৌড়ে যাচ্ছিলেন।

ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা গেছে, যারা ওই ব্যক্তিকে পিটিয়েছেন, তারা কেউই জানেন না মূল ঘটনা। চড়াও হওয়া একজনের কাছে ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সবাই মারতেছিল, তাই আমিও মারছি।’

একই এলাকায় গণপিটুনির শিকার হয়ে নিহত হয়েছেন একজন আর মারাত্মক আহত অবস্থায় আরও দুজনকে উদ্ধার করেছে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ।

৮ জুলাই রাত ৮টা নাগাদ মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এক নারীকে গণপিটুনি দেয় স্থানীয়রা। স্থানীয়দের অনেকেই বলেছেন, ওই নারীর গায়ে ‘পদ্মা সেতুর চিত্র’ অঙ্কিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে এমন কিছু পাওয়া যায়নি।

পুলিশ জানান, গণপিটুনির শিকার হওয়া ওই নারী গাজীপুরের বাসিন্দা। তিনি ঢাকায় এসে একটি বাড়িতে টয়লেট ব্যবহারের জন্য ঢোকেন। স্থানীয়রা এ সময় ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি দেয়। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেয়।

পরদিন রাতেই বেড়িবাঁধ তিন রাস্তার মোড় চাঁদ উদ্যান এলাকায় গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হয় এক ব্যক্তিকে। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, নিহত ওই ব্যক্তি সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন একটি শিশু সাইকেলের সামনে চলে আসলে ব্যথা পায়। সাইকেল থেকে নেমে তিনি শিশুটির কান্না থামানোর চেষ্টা করছিলেন। ওই মুহূর্তে স্থানীয়রা ‘কল্লা কাটা’ বলে লোকটাকে মারতে শুরু করে। ঘটনাস্থলেই নিহত হন ওই ব্যক্তি। এমনকি তার চোখ দুটিও তুলে ফেলা হয়।

ঘটনার সময় অনেকেই নিহত ব্যক্তিকে ‘রোহিঙ্গা’, ‘ছেলেধরা’ নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করেছেন। তবে পুলিশ এখনো নিহত ওই ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হতে পারেনি।

মোহাম্মদপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আবুল কালাম আজাদ ঢাকা টাইমসকে জানান, নিহত ব্যক্তির পরিচয় নিশ্চিত হতে পুলিশ কাজ করছে। ওই ব্যক্তির আঙ্গুলের ছাপ দিয়ে নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকা থেকে তার পরিচয় জানার চেষ্টা করা হচ্ছে।

একই পুলিশ কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার এলাকায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। ছেলেধরা সন্দেহে আরও এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেওয়া হয়েছে। তবে খবর পেয়ে পাঁচ মিনিটেরও কম সময়ের মধ্যে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ওই ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধার করে।

‘আমাদের এসআই (উপপরিদর্শক) নয়ন অনেক সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে ওই ব্যক্তিকে উদ্ধার করেছে। পাবলিক তো ওই ব্যক্তিকে মেরেই ফেলবে। তারা বলে, ব্যাগের মধ্যে মানুষের মাথা পাওয়া গেছে। পুলিশ অনেক ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে।’

আবুল কালাম আজাদ জানান, যেসব এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে, তার কোথাও ছেলেধরার কোনো কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আর সেসব এলাকায় ঘটনাগুলো ঘটছে, সেখানে অধিকাংশ মানুষ অশিক্ষিত। কেবল সচেতনতার অভাবে গুজবে কান দিয়ে তারা এ ধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে।

‘তারা খবর পড়ে না। সচেতনতা নেই। তাই তারা গুজবে কান দিয়ে এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে।’

সারা দেশে উদ্বেগজনক পরিস্থিতি

ঢাকার মোহাম্মদপুরের মতো একই ধরনের ঘটনা ঘটে চলেছে ঢাকার আদাবর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায়। আর এ ধরনের সমস্যা বড় আকার ধারণ করেছে ঢাকার বাইরে।

বৃহস্পতিবার রাত ৯টার মতলব উত্তর আনারপুর সিএনজি স্ট্যান্ডে এক অটোরিকশা চালককে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে গণপিটুনি দেয়ার উপক্রম হয়েছিল। ঘটনার বিস্তারিত না জেনেই ৭০ থেকে ৮০ জন লোক লাঠি নিয়ে মারতে আসে ওই অটোচালককে। পরে স্থানীয় এক ব্যক্তি বিষয়টি দক্ষতার সঙ্গে মোকাবেলা করলে বেঁচে যান ওই অটোচালক।

একই দিন চাঁদপুর সদরের ইসলামপুর গাছতলা এলাকায় মনু মিয়া নামের এক ব্যক্তিকে গণপিটুনি দেয়া হয়। মারধরের শিকার মিনু মিয়া লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার বাসাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, মনু মিয়া মানসিক ভারসাম্যহীন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, চাঁদপুর সদর উপজেলার বালিয়া ইউনিয়নের ইচলী কলোনি এলাকায় এক ব্যক্তি ভিক্ষা করতে আসেন। পরে স্থানীয় কয়েকজন তাকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে মারধর করতে করতে চাঁদপুর-রায়পুর সড়ক সংলগ্ন কাদির গাজী মার্কেটের কাছে নিয়ে যায়। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার আহত অবস্থায় উদ্ধার করে।

নারায়ণঞ্জের ঘটনাটি আরও বিস্ময়জাগানিয়া। নিজের শিশু সন্তানকে বাইরে থেকে ঘরে নিয়ে আসতে পিটুনি খেয়েছেন এক বাবা।

বুধবার নারায়ণগঞ্জে নগরীর ২নং রেলগেট এলাকায় সন্তানকে বকুনি দিয়ে রিকশায় তুলছিলেন ওই বাবা। আশপাশের লোকজন ভেবে বসেন, ওই বাবা ‘ছেলেধরা’। মুহূর্তেই জড়ো হয় কিছু মানুষ, শুরু করে পিটুনি।

দুই নং রেলগেটের ফজর আলী ট্রেড সেন্টারের সামনে ওই ব্যক্তি এবং তার সঙ্গে থাকা ছয় থেকে ১০ বছর বয়সী তিনটি শিশুকে আটক করা হয়। পরে স্থানীয় পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।

পুলিশ জানায়, ওই ব্যক্তি নগরীর নাগবাড়ীর বাসিন্দা। ওই তিন শিশুর মধ্যে একজন তার সন্তান। অন্য দুজনের বাবার নাম আনোয়ার হোসেন ও জেসী। সেদিন বেলা ১১টার দিকে সেই তিন শিশু বন্দর ঘাটে ঘুরতে আসে। কিন্তু তারা কেউ পরিবারকে বলে আসেনি।

এর মধ্যে তাদের খোঁজ শুরু হয়ে যায়। বিকাল ৩টার দিকে বন্দর ঘাটে সন্তানের সন্ধান পান পিটুনির শিকার ওই বাবা। তিনি তার নিজের সন্তান ও অন্য দুই শিশুকে নিয়ে আসে।

যশোরে ঝিকরগাছা ও শার্শায় মানসিক প্রতিবন্ধী কিংবা অপরিচিত লোকজনের এলোমেলো চলাফেরা দেখলেই ছেলেধরা সন্দেহে গণধোলাই দিচ্ছে এলাকাবাসী।

যশোর পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) আনছার উদ্দিন বলেন, ‘কিছু মানুষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে গুজব ছড়াচ্ছে। এলাকার লোকজন অপরিচিত ও মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তিদের দেখলেই ছেলেধরা গুজবে গণধোলাই দিচ্ছে। এখনো পর্যন্ত কোনো সত্যতা মেলেনি। এ বিষয়ে সচেতনতার জন্য ঝিকরগাছার ওসিকে মাইকিং করতে বলেছি।’

গতকাল সকালে বেনাপোল মাছবাজার এলাকায় ছেলেধরা সন্দেহে এক নারীকে মারপিট করে এলাকাবাসী। পরে তাকে পুলিশে দেওয়া হয়। একই দিন ঝিকরগাছার জননী সুপার মার্কেট এলাকায় এক যুবককে গণধোলাই দেয় স্থানীয়রা।

আগের দিন দুপুরে পারবাজার এলাকায় অপর এক যুবককে ছেলেধরা সন্দেহে মারপিট করা হয়। বুধবার রাতে শ্রীরামপুর গ্রামে ও নওয়াপাড়া গ্রামে দুই মহিলাকে গণপিটুনি দেওয়া হয়।

মঙ্গলবার বিকালে বেজিয়াতলা গ্রামে এক ব্যক্তিকে গণধোলাই দেয় স্থানীয়রা। ছেলেধরা ও রোহিঙ্গা অপহরণকারী গুজবে এলাকায় এইসব অপরিচিত লোকদের এলোমেলো চলাফেরা করতে দেখে গণধোলাই দিয়েছে।

সাতক্ষীরায় বোরকা পরে পুরুষেরা বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট শিশুদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে বলে প্রচার ছড়িয়েছে। ছেলেধরা মনে করে এক মোটরসাইকেলচালককে পিটিয়ে জখম করেছে স্থানীয় এলাকাবাসী। আহত রিয়াজ উদ্দীন মোড়ল দেবহাটা উপজেলার গোবরাখালী গ্রামের বাসিন্দা।

পুলিশের পক্ষ থেকে শহরজুড়ে মাইকিংয়ে প্রচার করা হচ্ছে ‘গুজবে কান না দেয়ার জন্য’। আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার জন্য পুলিশের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

দেবহাটা থেকে বোরকাপরা এক রোগীকে সাতক্ষীরা হাসপাতালে আনার সময় তার মোটরসাইকেল আটকে তাকেও পেটানো হয়েছে। সাতক্ষীরা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, জনগণকে সতর্ক থাকার জন্য মাইকিং করা হয়েছে।

ঢাকাটাইমস/১৩জুলাই/কারই/এমআর

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :