প্রসঙ্গ: গভীর নলকূপ

এস এম শাহজাদা
  প্রকাশিত : ২৪ জুন ২০২০, ১৩:৪৮
অ- অ+

পানির অপর নাম জীবন। কিন্তু পানিটা হতে হবে বিশুব্ধ। আমাদের গলাচিপা দশমিনাতে এই বিশুদ্ধ পানির উৎস গভীর নলকূপ। এক সময় নলকূপের পাইপের গভীরতা ছিল ৭০০ ফুটের মত এখন স্থান ভেদে তা প্রায় ১০০০ ফুট গভীরতায় যেতে হয়। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ার কারণে এখন অধিক গভীরতার প্রয়োজন হয়। এ কারণে পরিবেশ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ যতকম ভূগভীরস্থ পানি ব্যবহার করা যায়। আমরা সচেনতার অভাবে এর ব্যবহার কমানো তো দূরে থাক, পাল্লা দিয়ে পানি অপচয় করি। মনে হয় পানি অধিক খরচের ভেতর কোনো পুরস্কার লুকায়িত আছে। কিন্তু পরকালে এই পানির প্রত্যেকটা ফোঁটারও হিসাব দিতে হবে।

যাই হোক, এই গভীর নলকূপের চাহিদা দিনকে দিন বেড়েই চলছে। সরকারও পানি ব্যবহারে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষে বিভিন্ন প্রকার কাজ করছে এবং বিশুদ্ধ সুপেয় পানির সংস্থান কল্পে গভীর নলকূপের বরাদ্দ করে যাচ্ছে। এই মূহুর্তে সারাদেশে সরকারি গভীর নলকূপ বরাদ্দ চলমান রয়েছে। এই নলকূপ সমাহারে সকল ইউনিয়নে ওয়াটস্যান কমিটি ও সংসদ সদস্য সমান সংখ্যক নলকূপ বরাদ্দ দিচ্ছেন। এই নলকূপের জন্য সরকারি অফিসে ভ্যাটসহ ৭,১০০/- (সাত হাজার একশত) টাক জমা দিতে হয়। বেসরকারিভাবেও এই নলকূপ কিনে বসানো যায়। যার জন্য খরচ হয় মাত্র ৪৫-৫০ হাজার টাকা, যা এখন আমাদের দেশের প্রায় মানুষেরই সাধ্যের মধ্যে।

এক সময় নলকূপ ছিল ভীষণ অপ্রতুল। কয়েক মাইল পরপর এর দেখা মিলতো। আমার স্পষ্ট মনে আছে নলকূপের পানির জন্য ছোট ডিঙ্গি নৌকা করে দাদার সঙ্গে যেতাম অনেক দুরে। ওই নৌকায় আমাদের বাড়ির সকল ঘরের একাধিক কলস থাকতো, কি মিল ছিল! যেই যেত, সেই সকলকে জানাতো পানি আনতে যাবো, কার কার পানি লাগবে, ঘরে ঘরে গিয়ে জিজ্ঞাসা করতো। একজনই সবার জন্য পানি নিয়ে আসতো। আমি নৌকার চূড়ায় দুই পাশে পা ফেলে গভীর মনোযোগে পানির দিকে তাকিয়ে থাকতাম।

কি অপরূপ ছিল! টাইটানিক সিনেমা দেখার সময় এটা বারবার মনে পড়েছিল। তবে এই অনুভূতির কাছে টাইটানিক কিছুইনা।চারদিকে শাপলা ফুল, ফড়িং জলজ ঘাসের এইচূড়া থেকে ওই চূড়ায় উড়ে বসছে। স্ফটিকের মত স্বচ্ছ পানির ভেতর মাছেরা খেলা করছে। অগভীর পানির নিচের মাটি দেখতে পাওয়া যেত। পানির নিচের জীবনও গভীর মমতায় পর্যবেক্ষণ করতাম। শোল, টাকি, কৈ, ফলি, মলা ও আরও কত মাছের খেলা দেখতাম। দাদা নৌকার অপর প্রান্তে বাঁশের লগি দিয়ে ডিঙ্গি চালাতো আর আমাকে আনন্দ দেয়ার জন্য প্রায়ই দোল দিত। পানিতে কল, কল শব্দ হতো। মৃদু বাতাস, দাদার গলায় গান, পানির শব্দ, বকেরা উড়ে যাওয়া, সাদা সাদা শাপলা ফুল, মাছেদের খেলা আমার কাছে আজও স্মৃতিতে অমলিন। এভাবেই কয়েক মাইল দূর থেকে কলসের পর কলস ভরতাম এবং নিজের জন্য পেটভরে পানি খেয়ে নিতাম। পেটও যেন ছিল একটা পাত্র।

এরপর যখন একটু বড় হলাম তখন বাড়ির দরজায় নলকূপ আসলো। নলকূপ বসানোর জন্য যখন লোকজন এলো দাদা শহর থেকে আমাকে নিয়ে আসলো বিশাল এই আনন্দের সারথি হবার জন্য। তখন দেখলাম বিশাল লম্বা পাইপ বসিয়ে বেশ কয়েকজন শক্তিশালী মানুষ সার্বক্ষণিক কসরত করে যাচ্ছেন। তখন যে আনন্দ পেয়েছিলাম তার স্মরণ হয়েছিল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের সময়। যারা নলকূপের কাজ করতো তারা আমাকে দেখলেই বলতো ডালিম ও জিলাপি খাওয়াও, তা হলে পানি মিষ্টি লাগবে, না হলে এই যে গোবর ব্যবহার করছি দেখছো, এই গোবরের গন্ধ আসবে। তখন ডালিম ওই রকম পাওয়া যেত না, তাই পেয়ারা ও জিলাপি খাইয়েছিলাম। পানি অনেক মিষ্টি হয়েছিল। ওই নলকূপটি এখন আর নেই। কিছু বছর আগে ব্যবহার অযোগ্য হয়ে গিয়েছে। কেউ আর ঠিক করানোর চেষ্টা করেনি। কারণ অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতার কারণে বাড়ির প্রায় ঘরই নিজেরা নলকূপ বসিয়ে নিয়েছে। বিদ্যুৎ সংযোগের পর আবার সবাই মর্টার বসিয়েছে।

এখন কেউ আর কোন কিছু শেয়ার করতে চায় না। সবাই কেমন যেন আত্মকেন্দ্রিক হয়ে গেছে। সবাই চায় তার নিজের ঘরে নলকূপ। এই বিশাল চাহিদার কারণে নলকূপের জন্যও বিশাল প্রতিযোগিতা। বিশাল প্রতিযোগিতার কারণে প্রায়শই অনেকে বিশাল গুনাহ’র কাজ করে থাকে। আমি শুনেছি এক একটা নলকূপের জন্য ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা উৎকোচ দিয়ে পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। যিনি ২০-২৫ হাজার টাকা দিতে পারেন তিনি আর একটু কষ্ট করলে ৪৫-৫০ হাজার টাকায় কারোও ধার না ধরে, নিজে হারাম থেকে দূরে থাকতে পারেন এবং অন্যকেও হারামের প্রলোভনের মধ্যে ব্যর্থ করতে পারেন। আমাদের কাছে আপনাদের মাঝে বিতরণের জন্য সরকার যা কিছু বরাদ্দ করেন তার সম্পূর্ণ হক আপনাদের। চাহিদার তুলনায় কম হলে ও সামান্য দামের একটা জিনিসের জন্য এতবড় নৈতিক স্খলন একেবারেই কম নয়। আবার ধৈর্যধারণ করলে, সামনে পাওয়াও যেতে পারে। উৎকোচ দেওয়া কিংবা গ্রহণ করাটা যে কতবড় লজ্জার তা আমরা অনুধারণ করছিই না বরং এটা বলাটাই যেন কেমন হাস্যকর মনে হয়। ভাই ও বোনেরা সবার কাছে অনুরোধ আপনি নলকূপের জন্য ৭১০০/- টাকা এর বাড়তি কোন টাকা দিলে যেনে রাখুন, আপনি প্রতারিত হচ্ছেন। আর যদি জেনে বুঝে এটা করেন তাহলে পরকালে ওই নলকূপের প্রতিটা পানির ফোঁটা এক একটা গুনাহ বলে গণ্য হবে। নলকূপ যা এসেছে তাতো না বসিয়ে উপায় নাই। কাজেই আপনারা উৎকোচ না দিলেও ওই নলকূপগুলো বসানো হবে। আর যারা উৎকোচ চায় তারা আপনার, তার পরিবারের, সমাজের ও দেশের দুশমন। আপনাদের উচিত তার মুখে, ছবিতে, নামের উপর থুথু নিক্ষেপ করা। আর সে যদি কোন জনপ্রতিনিধি হয় তাহলে জুতা পেটা করা। অথবা আপনারা যারা উৎকোচ দিয়ে নলকূপ নিচ্ছেন তাদের প্রতিও সমান ঘৃণা।

আপনি বলতে পারেন ২০ হাজার টাকা না দিলে নলকূপ পাবেন না। তর্কের খাতিরে মানছি। কিন্তু এর সাথে আর ২০-২৫ হাজার টাকা যোগ করলে তো আপনি নিজেই বীরের মত নিজে বসিয়ে নিতে পারেন। আর কেউ যদি টাকা না দেন তাহলে এই বরাদ্দকৃত নলকূপগুলো তো বসাতেই হবে। বরং সে ক্ষেত্রে আরও যথোপযোক্ত জায়গায় বসানো যেত।

আমি জানি, অনেক সময়ই শত চেষ্টার পরও সঠিক কাজটি আমরা করতে ব্যর্থ হই। এ প্রসঙ্গে একটি সত্যি ঘটনা বলছি। গেলবার নলকূপ বরাদ্দের সময় পরিচিত এক নেতা কোন একজনের জন্য একটা আবেদন নিয়ে আসলে তাকে একটা নলকূপ দেই। কিছুদিন পর সে এসে বললো ওই নলকূপের সাইটটি একটু পরিবর্তন করে দিতে হবে। কারণ হিসেবে বললো যার জন্য নিয়েছিলেন তার বাড়িতে আগেই একটা নলকূপ ছিল আর প্রয়োজন নাই। আর পরবর্তীত জায়গায় আরও জরুরিভাবে দরকার এবং এই বাড়িতে উপকারভোগীর সংখ্যাও অনেক বেশি। এজন্য উনি সাক্ষী হিসেবে আমার পরিচিত আরও একজনকে সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিল। অনেক অনুরোধের পর চিঠি দিয়ে সাইট পরিবর্তন করে দিলাম। ওই নেতা খুশি, তার সাথে যে এসেছিল সেও খুশি। সবাই খুশি।

অনেকদিন পর যে সত্যটা শুনলাম তা ছিল অত্যন্ত ভয়ংকর ও লজ্জার। ওই নেতা প্রথমে যার কথা বলে বরাদ্দ নিয়েছিল তার কাছে চূড়ান্তভাবে ২০ হাজার টাকা দাবি করেছিল। বলেছিল এমপি সাহেবের খরচ লাগবে। ওইব্যক্তি তখন বলেছিল, এমপি টাকা নেয় না। বিশ্বাস করিনা। এমপি আমাকে নলকূপ বরাদ্দ দিয়েছে, আমি এর জন্য কোন টাকা পয়সা দেব না। আর ওই নেতা পরিবর্তন করে যার জন্য পরে নিয়েছেন তার কাছ থেকে উনি নিয়েছেন ২৫ হাজার টাকা। একবার একটু ভাবুন কি অর্জন হলো আমার!!! এবার আমি বিশ্বাসী ওই লোকটার নাম সবার আগে লিখে রেখেছি।

এবারে আমি যে নলকূপগুলো বরাদ্দ দিয়েছি, চেষ্টা করেছি জেনে শুনে, উপযোগিতা যাচাই করে দেওয়ার। যদি কোন উপযোগিতার কমবেশি হয় আমাকে মার্জনা করবেন। যারা তথ্য উপাত্ত দিয়েছেন তাদের ইচ্ছা বা অনিচ্ছাকৃত ভুল হতে পারে। যাই হোক সবাই ভাল থাকুন, সুস্থ থাকুন। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ তৈরিতে সহায়তা করুন। মনে রাখবেন, এটা একজনের কাজ না, সকলের।

ধন্যবাদ জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

লেখক:সংসদ সদস্য পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
পল্লবীতে প্রাইভেটকার থেকে গুলি, বিএনপি নেতা আহত
প্রযুক্তিগত ত্রুটিতে রোমে আটকা ঢাকাগামী বিমান, দুর্ভোগে ২৬০ যাত্রী
‘কীসের হাসিনা, কোথায় বক্তব্য দিয়েছে, তার চেহারা কি দেখা গেছে?’
মুক্তিযুদ্ধ ছিলো জনতার, কোনো রাজনৈতিক দলের নয়: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা