অভিনেত্রী বাঁধনের উপর হামলা এবং...

জুলকারনাইন সায়ের খান সামি
  প্রকাশিত : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:০২
অ- অ+

অভিনেত্রী বাঁধনের উপর হামলার পর কতিপয় ব্যক্তি মিনমিন করে বেশ সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করল, স্বৈরাচার গোষ্ঠীর সেসকল চিহ্নিত ল্যাপডগদের উদ্দেশ্যে —

একটা মহল্লার কথা ধরেন, তুমি বাপের দাপট দেখিয়ে ওই এলাকার মানুষরে বছরের পর বছর মাইরের উপর রাখলে, গুম-খুন করলে, ব্যাংক লুট করলে, আর বললে আমার পিছে আমার পাশের মহল্লার ওস্তাদ আছে। তোমার নির্যাতন আর অত্যাচারে অতিষ্ঠ মহল্লার মানুষজন হঠাৎ একদিন ফুঁসে উঠলো, আর তুমি আর তোমার সাগরেদরা আরও কিছু খুন করে পালিয়ে গেলে। গিয়ে পাশের মহল্লায় তোমার ওস্তাদের সেফ হাউসে উঠলে।

এদিকে যে মহল্লা ছেড়ে পালালে, সেই মহল্লার পাবলিক শোকে ফুঁসছে, যাদের হত্যা করেছ, তাঁদের পরিবারে মাতম চলছে। আর তুমি সেই মাতমে আরও আগুন ঢাললে। মাতম করা মাকে, বাবাকে, বোন/ভাইকে বললে—‘তোমার ছেলে জঙ্গি। তাকে মারা তো ঠিকই হয়েছে। দরকার ছিল আরও কয়েক হাজার মারা। আমার বিশ্বস্ত বাহিনী বেইমানি করাতে আরও মারা গেল না। এবার এসে নিই। সবগুলোকে শেষ করব। লিস্ট করে রাখছি।’

এই অবস্থায় তোমার বাপের বাড়ির সামনে তোমার অবশিষ্ট চেলা-চামুণ্ডারা গেল সংহতি জানাতে, যার স্বপ্নপূরণের দোহাই দিয়ে তুমি বছরের পর বছর খুন-গুম করেছ — তো সেটা কি শোকাহত-বিক্ষুব্ধ মানুষের প্রতি উস্কানি না? নাকি তোমার কাছে মানুষের মর্সিয়া আর ক্ষোভের কোনো মূল্য নেই? আরে কোন মহল্লায় একটা মার্ডার করলেই তো ওই গ্যাংয়ের ছেলেরা ভয়েই আর ওই মহল্লায় যায় না!

আর তুমি কে হে, খুনি? তুমি অনুতাপ এবং বিচারের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে গেছ? শোক আর ক্ষোভ প্রশমনের রাস্তা ধরছ? অবশ্যই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া সমর্থনযোগ্য নয়, কিন্তু তুমি আগে-পরের সব বাস্তবতা ভুলে খালি এই গীত গাইবে তা তো হবে না। তুমি অত্যাচারিত আর গণহত্যার শিকার মানুষের ক্ষোভ আর অবৈধ ক্ষমতা হারানো খুনীদের ক্ষোভকে এক পাল্লায় এনে মানুষকে বোকা বানাতে পারবে?

এবার তোমাদের বোঝার জন্য আরও সহজ উদাহরণ দিই। ভাবো, একাত্তরের রাজাকার যদি বাহাত্তর/তিয়াত্তরে বসে বলত—লিস্ট করছি, সব মুক্তিযোদ্ধাকে উচিত শিক্ষা দেব, সবগুলোকে দেখে নেব — তাহলে কি মুক্তিযোদ্ধারা ওরে আস্ত রাখত? সুতরাং কথা বলার আগে ভেবে বলবে।

আর তোমরা যারা সারিন্দা বাজাচ্ছ রিকনসিলিয়েশনের, হে মানবতার কাণ্ডারী — তোমাদের আম্মা কি রিমোর্স জানিয়েছে? বিচারে হাজির হয়েছে? সে তো রিকনসিলিয়েশন চায় না বরং মারতে চায়, আর তুমি বাবা আমাদের কাদের ভয় দেখাও। আমাদের ভয় দেখাও রিকনসিলিয়েশন না হলে আরও আক্রমণ হবে? তোমরা যে আওয়ামী প্রোপাগান্ডা মেশিনে ভর করে, জুলাই মাস জুড়ে বিএনপি-জামায়াতের জঙ্গিদের দমন করার আহ্বান জানিয়ে এখনো দেশে বসে স্বৈরাচারের পক্ষে বয়ান উৎপাদন করতে পারছ, বরং তার জন্য শোকর করো।

তোমাদের আম্মার সাগরেদরা পাশের মহল্লায় বসেও খুন করিয়েছে ওসমান হাদীকে।

তোমরা সুর ছাড়া গান বাজাচ্ছ — মুক্তিযোদ্ধার গলায় জুতার মালা পরিয়েছে। হ্যালো বেশি বুদ্ধির বুদ্ধিজীবীর দল আপনি এবং আপনারা একটু লুঙ্গির গিঁটটা ঠিকমতো বেঁধে নেন, যাদের উদ্দেশ্যে এসব বলছেন তারা কিন্তু ফিডার খাওয়া প্রজন্ম না যে দুধভাত-মার্কা একটা কিছু বসে বুঝিয়ে দেবেন।

যে ঘটনাগুলো ঘটেছে, সব নিন্দনীয়। কিন্তু তারা কি তাদের মুক্তিযোদ্ধা পরিচয়ের জন্য আক্রান্ত হয়েছেন, নাকি আওয়ামী লীগ পরিচয়ের জন্য? তাহলে কসাই আসাদুজ্জামান কামালের কথা ভাবেন। তাকে যদি কাল রাস্তায় পায় ক্ষুব্ধ জনতা—যেহেতু ক্ষোভ প্রশমনের রাস্তায় আওয়ামী লীগ তো যায়ইনি, বরং ক্ষোভ বাড়ানোর রাস্তায় গেছে—তখন তার কী অবস্থা হবে? তো সেই সময় কি তার পরিচয় মুক্তিযোদ্ধা হবে? তাকে যখন গণহত্যার দায়ে ফাঁসি দেওয়া হবে, তখন কি লেখা হবে ‘খুনি কামালের ফাঁসি’? নাকি ‘বীর মুক্তিযোদ্ধার ফাঁসি’? তাই বলি, এইসব খুনিদের সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধা নামটা জড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধকেই কলঙ্কিত করবেন না।

মুক্তিযোদ্ধাদের অপমানের ইতিহাস কাদের হাতে শুরু? আজ যারা বিপদে পড়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কাঁদছে, আনফরচুনেটলি তাদের হাতেই আসলে মুক্তিযোদ্ধাদের অপমান শুরু।

একাত্তরের ষোলই ডিসেম্বরের পর থেকেই শুরু। অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। তবে বড় কয়েকটা দিই। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার এম এ জলিল বিজয়ের পরে ভারতীয় বাহিনীর লুটপাটের প্রতিবাদ করায় ৩১ ডিসেম্বর রাতে তাকে ভারতীয় এবং আজ্ঞাবহ একটা বাংলাদেশি বাহিনীর হাতে আটক হতে হয়। রাস্তা থেকে অ্যামবুশ করে নিয়ে গিয়ে তাকে একটা নোংরা পরিত্যক্ত ঘরে আটকে রাখা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার যে দলের হাতে এ রকম অপমানের শিকার হয়, সেই দল যখন মুক্তিযুদ্ধের জন্য মায়াকান্না কাঁদে, তখন কোনো সন্দেহই থাকে না মুক্তিযুদ্ধ মোটেই তাদের ইস্যু না। তাদের ইস্যু নিষিদ্ধ একটা দলকে রক্ষা।

আরেক সেক্টর কমান্ডার এ কে খন্দকারের ‘গালে জুতা মারো তালে তালে’ স্লোগান দিয়েছিল কারা? তাঁকে ধরতে না পেরে তার কুশপুত্তলিকা দাহ করেছিল আপনাদের আম্মার লোকেরাই।

১৫ আগস্টের নৃশংস ঘটনায় জড়িতরা কি খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না? সেই পরিচয়ের জন্য কি তাঁদের ফাঁসির দড়ি থেকে মুক্তি মিলেছে? শাস্তি তো পেতেই হয়েছে।

ছাত্রলীগের হাতে বীর মুক্তিযোদ্ধা কবে লাঞ্ছিত হয়েছেন, কোন এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাকে পিটিয়ে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে, সেসব একটু গুগলকে জিজ্ঞাসা করে দেখবেন।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা শহিদুল ইসলামকে কিল-ঘুষি ও চেয়ার দিয়ে পেটায় যুবলীগ নেতা। খুলনার কয়রায় বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তারকে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পিটিয়ে অজ্ঞান করে। পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জে ৭৫ বছরের বীর মুক্তিযোদ্ধা ছাদেম আলী হাওলাদারকে জুতা দিয়ে পেটায় ছাত্রলীগ কর্মী, ঝালকাঠির রাজাপুরে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস ছালাম খানকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে যুবলীগ নেতাসহ আটজনের বিরুদ্ধে হত্যার মামলাও হয়েছে। এসব ঘটনার কথা কি বিলকুল ভুলে গেলেন?

এবার একটু বিএনপি সরকারের উপদেষ্টা-মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বলি, কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রধান অস্ত্র তাদের ঘরানার কালচারাল এলিট এবং কিছু চিহ্নিত গণমাধ্যম। পতিত শাসকগোষ্ঠী তাদের ষোলো বছরে সকল অপকর্ম করতে পেরেছে এই কালচারাল এলিট এবং পোষা গণমাধ্যমের সহায়তায়। আর সেই কালচারাল এলিট এবং সহযোগী গণমাধ্যমের একপ্রকার পুনর্বাসন করে আপনারা যেন বেশ তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছেন?

ছোট্ট তিনটা উদাহরণ দিই। বেশি খুলে বলছি না, আশা করি সরকার প্রধান এ বিষয়ে নজর দেবেন।

গত বছর সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে লালনের তিরোধান দিবসকে জাতীয়ভাবে উদযাপন করা হয়। বিশাল আয়োজন হয়। সারা দেশ জুড়ে আয়োজন করা হয়। ঢাকায় বিশাল কনসার্ট হয়। আর কুষ্টিয়ায় আয়োজনে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল।

তো এবার লালনের তিরোধান দিবস আগামী মাসে। সেই তিরোধান দিবসের আগে ভারতীয় হাইকমিশন একটা প্রজেক্ট নিয়ে এসে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে পার্টনার বানিয়ে ফেলল। সেটা কী? ‘লালন-কবীর উৎসব’। ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ অক্টোবর। মাঝখানে কিন্তু লালনের তিরোধান দিবসটা পড়ে, আপনি খেয়াল করবেন। এই ১১ সেপ্টেম্বর থেকে ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত আট বিভাগে লালন-কবীর উৎসব হবে। মন্ত্রণালয় ব্যস্ত এটা নিয়ে।

অবশ্যই লালন-কবীর উৎসব হতে পারে। কিন্তু যখন লালনের তিরোধান দিবস আমাদের 'ক' শ্রেণিভুক্ত জাতীয় দিবস, সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় তো এটাকে প্রায়োরিটি দেবে, ফোকাস করবে।

আর লালনকে দিয়ে কবীরদাসকে কেন বাংলাদেশে চেনাতে হবে?

লালন-কবীর যদি প্রচার করতে চায় ভারতীয় দূতাবাস এবং সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, তাহলে তারা এ রকম একটা প্রোগ্রাম করতে পারে যে লালন-কবীর বাংলাদেশে হবে, লালন-কবীর ভারতেও হবে এবং দুই দেশেই সমান অর্থ দেবে। এবং সেই আয়োজন হতে হবে লালন দিবসকে ওভারশ্যাডো না করে।

আরেকটা কথা বলি। বিএনপি সরকারের কি ধারণা আছে, কালচারাল অঙ্গনে যারা জুলাইয়ে অংশ নিয়েছিল, তাদেরকে কীভাবে ক্যারট অ্যান্ড স্টিক পলিসির মাধ্যমে কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন ঘনিষ্ঠ লোকজন জুলাইয়ের পক্ষ থেকে সরানোর জন্য কাজ করছে? যেন জুলাই নিয়ে কথা না বলে, যেন আওয়ামী লীগ এবং ভারতীয় হেজেমনি নিয়ে কথা না বলে। বিনিময়ে তোমরা কাজ পাবে। আর কথা বললে তোমরা কাজ পাবে না।

আমার কাছে সুস্পষ্ট তথ্য আছে চারজনের সম্পর্কে। এর মধ্যে তিনজন অভিনেত্রী/শিল্পী, একজন পরিচালক। এদের সঙ্গে কার, কোথায়, কবে, কী আলোচনা হয়েছে—আমি সবই জানি। আপাতত আমি এটুকু ইঙ্গিত দিয়ে রাখি।

বিএনপি সরকারের সময় এসেছে সতর্ক হওয়ার। বিএনপি সরকারের সময় এসেছে এটা ভাবার যে জুলাই-পরবর্তী সময়ে যারা জুলাইয়ের পক্ষে ছিল, তাদেরকে অসহায় কেন হতে হচ্ছে? কেন আমরা সেই পরিবেশ তৈরি করলাম না, যার মাধ্যমে এ রকম বিব্রতকর অবস্থায় জুলাইয়ের পক্ষের সংস্কৃতি কর্মীদের পড়তে না হয়?

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে কি কারও সাহস ছিল মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শিল্পীদেরকে এভাবে ক্যারট অ্যান্ড স্টিক দিয়ে মানসিক চাপ তৈরি করার?

এর পরে আসেন, আরেকটা কথা বলি। বিএনপি সরকারের কালচার-ক্রিয়েটিভ ইকোনমি দেখার জন্য কমিটি করা হয়েছে। সেখানে আওয়ামী থিংক ট্যাঙ্ক এবং ঘনিষ্ঠ ভারতীয় সংযোগ রয়েছে এমন লোকজন আছে। তাদেরকে দিয়ে আপনি আপনার কালচারাল ভিশন বাস্তবায়িত করবেন?

এবার আসেন নিউ মিডিয়াগুলোর কথায়। সাম্প্রতিক সময়ে বেশকিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্ম হয়েছে—এই মিডিয়াগুলোর কোনটার মালিকানায় কে আছে, কোনটার পরিচালনায় কে আছে, এ বিষয়ে কি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের কাছে কোনো তথ্য আছে? আপনারা ঠিক কোন পদ্ধতি অনুসরণ করে অনুমোদন দিয়েছেন?

আপনারা কি ভেবেছেন এ রকম কোনো একটা ফেভারেবল ইকোসিস্টেম তৈরি করার কথা, যেখানে বাংলাদেশপন্থী প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে আরও বেশি? নাকি ভারতপন্থী প্ল্যাটফর্ম দিয়েই চলবে।

সরকার প্রধান — অনুগ্রহ করে এই দিকে নজর দিন। আপনার কালচারাল, মিডিয়া এবং ইনফরমেশন উইংয়ের কাছে জানতে চান তাদের পরিকল্পনা ও লক্ষ্য কী?

লেখক: অনুসন্ধানী সাংবাদিক

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে কাভার্ড ভ্যান-মাইক্রোবাস সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ১১
ঢাকাসহ দেশের ৪ অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কসংকেত
সৌদি আরবের সামরিক ঘাঁটিতে হুথিদের ড্রোন-ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
মোহাম্মদপুরে ৬ কেজি গাঁজাসহ কিশোর আটক