টঙ্গীর সংঘর্ষে নিহতদের বিচারসহ পাঁচ দফা দাবি ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশের

টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে দুই পক্ষের সংঘর্ষে নিহতদের ঘটনায় দ্রুত বিচার, সংশ্লিষ্টদের আইনের আওতায় এনে শাস্তি এবং ময়দানে সাদপন্থীদের কার্যক্রম ও প্রবেশ নিষিদ্ধ রাখাসহ পাঁচ দফা দাবি জানিয়েছে ওলামা-মাশায়েখ বাংলাদেশ।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার ইন্সটিটিউটে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির সম্মেলন থেকে এসব দাবি জানানো হয়। সম্মেলনে দেশের ৬৪ জেলা থেকে আসা আলেম-ওলামা, মাশায়েখ, কওমি মাদ্রাসার শীর্ষস্থানীয় আলেম, হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের নেতৃবৃন্দ, তাবলিগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। এতে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানের ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ঘটনা এবং তাবলিগের চলমান বিরোধ নিয়ে বিভিন্ন বক্তা নিজেদের বক্তব্য তুলে ধরেন।
সম্মেলনে ঘোষণাপত্রে পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবিগুলো হলো—
এক. টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংঘর্ষে নিহতদের ঘটনার দ্রুত বিচার করতে হবে। একই সঙ্গে এ-সংক্রান্ত জিআর মামলাগুলোর অভিযোগপত্র দ্রুত দাখিল, সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু দুই পক্ষের সংঘর্ষ হিসেবে বিষয়টি বিবেচনা না করে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করতে হবে। এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সরাসরি তত্ত্বাবধানে একটি মনিটরিং সেল গঠনের দাবি জানানো হয়। দুই. ২০২৫ সালের বিশ্ব ইজতেমার আগে তৎকালীন সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা বহাল রাখতে হবে। সম্মেলনে বলা হয়, ২০২৫ সালের সাদপন্থীদের ইজতেমাই টঙ্গী ময়দানে তাদের শেষ ইজতেমা হিসেবে নির্ধারিত হয়েছিল। এরপর টঙ্গী ময়দানে সাদপন্থীদের বিশ্ব ইজতেমা বা তাবলিগের কার্যক্রম না রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। বর্তমান সরকারের কাছে নতুন কোনো সিদ্ধান্ত দাবি করা হচ্ছে না, বরং আগের সিদ্ধান্ত বহাল রাখার দাবি জানানো হয়েছে বলে সম্মেলনে উল্লেখ করা হয়।
তিন. ২০১৮ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতে টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে সাদপন্থীদের প্রবেশ স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ রাখার দাবি জানানো হয়। বক্তারা অভিযোগ করেন, ২০১৮ সালের ঘটনায় বহু আলেম, মাদ্রাসাশিক্ষার্থী ও তাবলিগের সঙ্গী আহত হন এবং একজন নিহত হন। তাদের দাবি, ওই ঘটনার বিচার না হওয়ায় ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বরের ঘটনা ঘটেছে।
সম্মেলনে বক্তারা আরও অভিযোগ করেন, ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাত সাড়ে ৩টার দিকে বিপুলসংখ্যক সাদপন্থী ইজতেমা ময়দানে প্রবেশ করে ঘুমন্ত ও নামাজরত তাবলিগের সঙ্গীদের ওপর হামলা চালান। সরকারি নির্দেশনা অমান্য করে কেউ ময়দানে প্রবেশ করলে কিংবা প্রবেশে উসকানি বা নির্দেশনা দিলে তার বিরুদ্ধেও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
চার. সংঘর্ষে নিহত এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের পক্ষ বিবেচনা না করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের সংঘাত ও সহিংসতা এড়াতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
পাঁচ. শীর্ষস্থানীয় আলেম-মাশায়েখ ও মুফতিদের পরামর্শ নিয়ে দাওয়াত ও তাবলিগের চলমান সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানানো হয়। বিশ্ব ইজতেমা শূরা নিজাম ও আলেমদের তত্ত্বাবধানে এবং কাকরাইল মারকাজ আলেমদের তত্ত্বাবধানে পরিচালনার কথাও বলা হয়।
সম্মেলনে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মাওলানা আজিজুল হক ইসলামাবাদী। এসময় মাওলানা সাদ কান্ধলভীর বিভিন্ন বক্তব্য ও ধর্মীয় অবস্থান নিয়ে আলেমদের আপত্তির বিষয়টি তুলে ধরা হয়। তাকে সংশোধনের জন্য দারুল উলুম দেওবন্দের প্রবীণ আলেমসহ বিভিন্ন আলেমের পক্ষ থেকে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও বক্তব্যে উল্লেখ করা হয়। তিনি তওবা করে দেওবন্দের প্রবীণ আলেমদের কাছে ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত তাকে বাংলাদেশে আসার সুযোগ না দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
সম্মেলনে বক্তারা বলেন, দাওয়াত ও তাবলিগ একটি ধর্মীয় কার্যক্রম। এ কার্যক্রমকে ঘিরে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলো শীর্ষস্থানীয় আলেম-মাশায়েখদের সঙ্গে পরামর্শের মাধ্যমে সমাধান করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে সরকারের উচিত আলেমদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া।
তারা বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক আলেম-মাশায়েখ, শিক্ষার্থী, সাধারণ মানুষ ও তাবলিগের সঙ্গীদের মতামতকে বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আগের সরকারি সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হলে বৃহত্তর আলেমসমাজ ও তাবলিগের সঙ্গীদের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
বক্তারা আরও বলেন, আমাদের তথা দেশের বৃহত্তর তাওহিদী জনগোষ্ঠীর যৌক্তিক দাবি মেনে না নিলে আজকের সম্মেলনে উপস্থিত সারা দেশের তথা ৬৪ জেলার দ্বীন সচেতন মুসল্লি ও ওলামায়ে কেরাম দ্বীন রক্ষার স্বার্থে এবং দেশে স্থিতিশীলতা রক্ষার স্বার্থে পরবর্তী বৃহত্তর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হবে।
হেফাজত আমির আল্লামা শাহ মুহিবুল্লাহ বাবুনগরীর সভাপতিত্বে সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন আল্লামা আব্দুল হামিদ পীর সাহেব মধুপুর, আল্লামা ওবায়দুল্লাহ ফারুক, মাওলানা শায়খ সাজিদুর রহমান, মাওলানা সালাহউদ্দিন নানুপুরী, মুফতি জসিম উদ্দিন হাটহাজারী, মাওলানা আব্দুল কুদ্দুছ ফরিদাবাদ, মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী, মাওলানা আব্দুল আউয়াল নারায়ণগঞ্জ, মাওলানা মাহফুজুল হক, মাওলানা বাহাউদ্দীন জাকারিয়া, মাওলানা মহিউদ্দিন রাব্বানী, মাওলানা ইকরাম হুসাইন ওয়াদুদী পটিয়া, মাওলানা শাব্বির আহমদ রশীদ কিশোরগঞ্জ, মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ সাদী ময়মনসিংহ, মাওলানা জুনায়েদ আল হাবিব, মাওলানা খুবাইব বিন তৈয়ব জিরি, মাওলানা ফয়জুল্লাহ মাদানী নগর, মাওলানা আনোয়ারুল করীম যশোর, মাওলানা আবদুল হক হক্কানি বগুড়া, মাওলানা মুশতাক আহমদ খুলনা, মাওলানা আবদুল হালিম বরিশাল, মুফতি মুহাম্মদ আলী আফতাবনগর, মাওলানা আব্দুল বাসেত খান, মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজি লালবাগ, মাওলানা নিজামুদ্দিন নোয়াখালী, মাওলানা লেহাজ উদ্দিন গাজীপুর, মাওলানা নিয়ামাতুল্লাহ আল ফরিদী, মাওলানা কামরুজ্জামান ফরিদপুর, মুফতি বশিরুল্লাহ মাদানীনগর, মুফতি জাবের কাসেমী, মাওলানা নজরুল ইসলাম সিরাজগঞ্জ, মুফতি নুরুল্লাহ বরিশাল, মাওলানা আব্দুল হামিদ কুষ্টিয়া, মাওলানা সাঈদ নূর মানিকগঞ্জ, মাওলানা আবু বকর শরীয়তপুরসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার আলেম ও মাশায়েখ।
ঘোষণাপত্র পাঠ করেন মাওলানা নাজমুল হোসাইন কাসেমি। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মুফতি কেফায়েত উল্লাহ আজহারী ও মাওলানা লোকমান মাজহারী।
সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং দাওয়াত ও তাবলিগের কার্যক্রমে সঠিক পদ্ধতি অনুসরণের জন্য দোয়া করা হয়। একই সঙ্গে কোনো পক্ষের আবেগের পরিবর্তে বৃহত্তর আলেমসমাজের মতামত বিবেচনায় নিয়ে সরকারকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
(ঢাকা টাইমস/১২সেপ্টেম্বর/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













