মানুষকে ভাত খাওয়ানো ছিল নানুর সবচেয়ে ভালোবাসার কাজ

মাজেদুল নয়ন
  প্রকাশিত : ১৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:১০| আপডেট : ১৭ এপ্রিল ২০২১, ১২:৩৪
অ- অ+

আমার নানু খুব রসিক মানুষ ছিলেন। আমি যেমন নানুর সঙ্গে মজা করতে পারতাম, তেমনি নানুও পাল্টা জবাব দিতে পারতেন। আশির দশকের শেষার্ধে আমার জন্ম হয় নানুর বাড়িতে। সেসময় গ্রামের রীতি অনুযায়ী, দুই মুখো মাটির চুলার এক মুখ দিয়ে প্রসবিত আমাকে ঢুকিয়ে আরেক মুখ দিয়ে বের করার কাজটা করেছিলেন নানু। বড় হওয়ার পর আমাকে বেশ কয়েকবার ঘটনাটা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন তিনি।

নানুর রসবোধ ছিল খুব। যেমন প্রথম যেবার তিনি টিভি দেখতে বসেন, বিরাট ঘোমটা টেনে বসেন। তার ধারণা ছিল, পুরুষ মানুষের সামনে রয়েছেন তিনি। বিটিভি'র খবরের শুরুতেই তিনিও উপস্থাপকের সালামের প্রতি উত্তর জানাতেন।

একবার ঢাকা আসলেন নানু, তখন আমরা ৪ তলায় থাকি। বারান্দার সঙ্গেই নারিকেল গাছের মাথা। তিনি খুব সরলভাবে বললেন, ‘ওমা! তোরা দেই নারিকেল গাছের মাথায় থাচ!’

আরেকটা ঘটনা, ২০০৭ সালে যখন সরকার জাতীয় পরিচয়পত্র ইস্যু শুরু করলো, নানু সেটা করলেন না। কারণ, উনার মতে ছবি তোলা গুনাহর কাজ ছিল। পরে যখন দুষ্টামি করে নাতিরা বলল, সরকার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে কবর দেয়া হবে না! এটা শুনে তাড়াহুড়ো করে জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি তুলে আসলেন।

গত শতাব্দীর গোড়ার দিকে বিয়ের পর নানু যখন নানার বাড়িতে আসলেন, তখন উনার বয়স ছিল আড়াই বা তিন। নানুর বোনেরও এই বাড়িতেই বিয়ে হয়েছিল। দুই বোনকে শ্বশুর কোলে করে নিয়ে এসেছিলেন। বয়স্কদের কাছে শোনা, শ্বশুরবাড়িতে হাফপ্যান্ট পরে খেলা করে বেড়াতো বৌ, শাশুড়ি গোসল করিয়ে দিতো, খাইয়ে দিতো, আবার খেলতে যেতেন। এরপর ফতেহপুরের মেহের আলী মিঁজি বাড়িতেই শৈশব, কৈশোর, যৌবন, পৌরত্ব আর বার্ধক্য। ৭ জন মেয়ে আর ২ জন ছেলে জন্ম দিয়েছেন নানু, যার মধ্যে একজন মারা গিয়েছিলেন। তখনকার সময় নাকি সন্তান প্রসব করাটা ছিল দৈনন্দিন কাজের মতোই। সন্তান হওয়ার আগেও চুলায় রান্না করতো নানুরা, প্রসব করেই আবার রান্না ঘরে চলে যেতেন। নিজের বাবার বাড়িতে এরপর হাতে গোনা ২/৩ বারই গিয়েছেন৷ সবশেষ ২০০৩-০৪ সালের দিকে আমরা সবাই মিলে নানুকে নিয়ে বেড়াতে যাই। সেটা ছিল উনার প্রায় ২০/৩০ বছর পর যাওয়া। আর এরপরও আর যাননি।

নানুকে প্রায় দেড় যুগ আগে শেষবার ঢাকা আনা হয়েছিল, চিকিৎসার জন্য। কিন্তু একেবারে মাটির মানুষ ঢাকায় একেবারেই টিকতে পারতেন না। আরো অসুস্থ হয়ে যেতেন। সেবার আমি উনাকে বাসে করে গ্রামে নিয়ে গিয়েছিলাম। কিন্তু বাস, সিএনজি, রিকশা বা যে কোনো পরিবহনেই নানুকে নিয়ে উঠলে বেশ বেগ পেতে হতো। খালি বলতে থাকতো, ‘আঁরে নামাই দে, আঁরে নামাই দে, আঁই হড়ি যাই।" উনার কেন যানি যে কোনো যানবাহনে উঠলেই মনে হতো, উনি পড়ে যাচ্ছেন!

শৈশবে যে শানশওকত, প্রাচুর্যে ভরপুর আর মানুষের কোলাহলে মুখরিত নানুর বাড়ি দেখেছিলাম আমরা, নগরায়ন আর একান্নবর্তী পরিবারের ভাঙনে সেটি বিলীন হতে থাকে। শেষ বয়সে প্রায় গত দেড় যুগ ধরেই পুরো একা হয়ে পড়েন নানু।

নানু কোথাও যেতে চাইতেন না, থাকতেও চাইতেন না ছেলের বৌ বা মেয়েদের বাড়িতে। নানা আর নিজের ভিটা ছেড়ে এক মুহুর্তও কোথাও থাকতে চাইতেন না। গত তিন দশক ধরেই দেখছিলাম, ধীরে ধীরে মৃত্যুর প্রহর গুনছিলেন তিনি। নিজের ঘর ছাড়া অন্য কোথাও যদি মৃত্যু হয়, সেই ভয় উনাকে তাড়া করতো।

গত কয়েক বছর ধরেই নানুর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। গেলো বছর করোনার প্রথম দিকে মা কিছুটা জোর করে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসেন। কারণ উনার রান্না বান্না বা নিজের প্রতি যত্ন নেয়ার শক্তিও হ্রাস পেতে থাকে। কিন্তু একদিন আমার মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে চলে যান নিজের বাড়িতে। অন্য খালাদের বাড়িতে থাকা অবস্থাতেও সবাইকে অস্থির করে রাখতো, ‘তাকে নিজের বাড়িতে কেন রেখে আসছে না!' সবাই কেন তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে, ঘরের বাইরে মৃত্যু চেয়ে!

গত অক্টোবর থেকে নানু একেবারে বিছানায় পড়ে যান। উনার মেয়েরা পালা করে মাকে আগলে রাখছিলেন। অবশেষে গত বৃহস্পতিবার দুপুরে মৃত্যুবরণ করেন আমার শতবর্ষী নানু, আনোয়ারা বেগম। (ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)। নানুর শেষকৃত্যে অংশ নিতে যখন ভাইয়ার গাড়িতে চেপে বাড়ি যাচ্ছিলাম, তখন একবার খুব চোখ ভেসে আসছিলো কান্নায়। তবে পানি ঝড়েনি, পরেও আর কান্না আসেনি। বুকের ভিতরটায় হু হু করে উঠছিল।

পৃথিবী ছাড়া মানুষদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় মানুষ এখনো আমার দাদী। দাদীর কোনো ছবি নাই, তবে দাদীর স্পর্শ, চেহারা, কথা, সকালে উঠে কোরআন পড়া সবকিছুই যেন আমার চোখে এখনো ভাসে। দাদী মারা যাওয়ার পর ১৫ বছরের আমি মাটিতে আঁছড়ে পড়ে কান্না করেছিলাম। তবে আমার নানুর মতো সহজ সরল মানুষ আমার জীবনে চোখে পড়েনি। যার সবচেয়ে বড় চাহিদা ছিল, নিজের ঘরে থাকা, এমনি সেটি কালের বিবর্তনে জীর্ন হয়ে গেলেও। এরপরের চাহিদা ছিল, মানুষকে ভাত খাওয়ানো। নানুর সঙ্গে দেখা হলে বা পরবর্তীতে দেখতে গেলে উনার সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত কথা ছিল, 'ভাত দি দু'গা'। মানুষকে ভাত খাওয়ানো ছিল উনার সবচেয়ে ভালোবাসার কাজ। এতো কম চাহিদার মানুষ আমার সামনে পড়েনি।

নানুর জীবনটা এতোটাই সহজ সরল ছিল যে, সেটিকে আমার অসাধারণ আর ঈর্ষণীয়ই মনে হয় সবসময়!

*ছবিটি নানু অসুস্থ হওয়ার পর একদিন বাবার সঙ্গে ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে কথা বলায় সময় স্ক্রিনশট রাখা থেকে নেয়া।

লেখক: সাংবাদিক

ঢাকাটাইমস/১৭এপ্রিল/এসকেএস

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজার: প্রত্যাশা বনাম প্রাপ্তি
কসবা-আখাউড়াকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা কবীর আহমেদ ভূইয়ার
জিয়াউর রহমানকে স্মরণের সর্বোত্তম উপায় তাঁর আদর্শ অনুসরণ : ড. মঈন খান
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে ফাইনাল দেখতে চান বাংলাদেশের ক্রীড়ামন্ত্রী
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা