মনছুরের ‘নীল নিয়তি’ এবং নব্বইয়ের সাড়া জাগানো ব্যান্ড ‘ব্লু হর্নেট’

আরিফ হাসান, ঢাকাটাইমস
 | প্রকাশিত : ২১ মে ২০২২, ১৬:৫৯

‘বাটালি হিলের সেই বিকেলগুলো’ একদা ফিরত মুখে মুখে। নব্বই দশকের আলোচিত ব্যান্ড ‘ব্লু হর্নেট’। সেই ব্যান্ডের এই গানটিসহ আরও কিছু গান সেসময় শ্রোতানন্দিত হয়েছিল। এই ব্যান্ড দলেরই মেইন ভোকাল ছিলেন মনছুর। ব্লু হর্নেটের মতো মনছুরও চলে যান অনেকটা অন্তরালে।

তবে সম্প্রতি তার সন্ধান মিলেছে যেন ‘না-লেখা’ গল্পের মতো। আর যদি সেই গল্প লেখা হয়, তবে নাম হতে পারে ‘নীল নিয়তি’। কেননা নিয়তি যেন এই শিল্পীকে দেখিয়ে ছেড়েছে জীবনের কঠিন এক রূপ।

‘বাটালি হিলের সেই বিকেলগুলো’ ছাড়াও মনছুরের গাওয়া ‘ছোট্ট একটি মেয়ে তার ছোট্ট সুন্দর নাম’ গানটিও ছিল আলোচিত। এই গায়কের থাকার কথা ছিল রাজকীয় হালে। তবে এখন তার জীবিকার চাকা ঘোরে মাত্র নয় হাজার টাকা বেতনে। একদা নন্দিত ব্যান্ডশিল্পী এখন গণশৌচাগারের তত্বাবধায়ক!

মনছুরের সন্ধান দেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ২১ নং ওয়ার্ড জামালখানের কাউন্সিলর শৈবাল দাস সুমন। ফেসবুকে একটি ভিডিও পোস্ট করে তিনি মনছুরের জীবনের এই করুণ অবস্থার কথা প্রকাশ করেন।

সেই ভিডিও থেকে জানা যায়, পাঁচ বছর ধরে জামালখান এলাকায় দুটি পাবলিক টয়লেটের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ব্লু হর্নেট ব্যান্ডের একসময়কার ভোকাল মনছুর। কেন কীভাবে তার এই করুণ পরিণতি, তাও উঠে এসেছে ওই ভিডিওতে।

মনছুর জানান, ১৯৮৯ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ছিলেন তিনি। ওইসময় তিনি রাজনীতি করতেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আ জ ম নাসিরের সঙ্গে। মনছুর তখন পড়তেন চট্টগ্রামের হাজী মো. মহসিন কলেজে। এরশাদ সরকারের পতন হওয়ার পর তিনি ঢুকে পড়েন গানের জগতে। হয়ে যান ব্ল হর্নেট ব্যান্ডের মেইন ভোকাল।

কিন্তু তার এমন পরিণতি হলো কী করে? মনছুরের দাবি, ওইসময় কোনো এক কারণে ক্ষমতাশালীদের রোষানলে পড়ে তার গান গাওয়া বন্ধ করতে হয়। তাকে মাদকাসক্ত হিসেবে সন্দেহের পাশাপাশি নারীদের দিয়ে দেহব্যবসার অভিযোগ আনা হয়।

কিন্তু সত্যি কি মাদকাসক্ত বা অনৈতিক কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলেন মনছুর? মনছুরের দাবি, তিনি ষড়যন্ত্রের শিকার। বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি ফুটবলার ডিয়েগো ম্যারাডোনার উদাহরণ টেনে মনছুর বলেন, ‘ম্যারাডোনার নামডাক ছড়িয়ে পড়ার পর তাকে যেভাবে ড্রাগ দিয়ে শেষ করে দেওয়া হয়েছিল, আমার অবস্থাও তাই হয়েছিল। আমার আশপাশের মানুষরাই আমাকে গানের জগৎ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল।’

এই পরিণতি থেকে কি মনছুরকে বের করা সম্ভব? তাকে যদি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া হয়, তিনি কি পারবেন আরও একবার গান দিয়ে শ্রোতাদের মুগ্ধ করতে? তিনি কি প্রস্তুত নতুন প্ল্যাটফর্মে আবারও গান করার জন্য? কাউন্সিলর শৈবাল দাস সুমন এমন প্রশ্নই করেছিলেন মনছুরকে। জবাবে তিনি বলেন, ‘এখন আর আগের মতো হবে না। গলার স্বর, সুর দুটোই গেছে।’

বর্তমানে মনছুরের বয়স ৫৪ বছর। তবে তিনি এখনো বিয়ে করেননি, সংসার সাজাননি। কেন করেননি, তার স্পষ্ট কোনো জবাব মনছুর দিতে পারেননি। এসময় জামালখানের কাউন্সিলর শৈবাল দাস সুমন আশ্বাস দেন, মনছুর এখন যে কাজটা করছেন, সেটি চলমান থাকবে। পাশাপাশি আরও কিছু করে কীভাবে মনছুর তার জীবনকে আরও সুন্দর করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা তিনি করবেন।

এরপর কাউন্সিলর মনছুরকে তার সাড়া জাগানো বাটালি হিলের সেই বিকেলগুলো গানটা গেয়ে শোনানোর জন্য অনুরোধ করেন। প্রথমে আপত্তি করলেও পরে গানটির কয়েকটি লাইন গেয়ে শোনান মনছুর। এছাড়া নিজের পছন্দের ‘পাহাড় নদী সবুজ ঘেরা, স্বদেশ আমার বাংলাদেশ’ শিরোনামের একটি দেশত্ববোধক গানের কয়েকটি লাইনও গেয়ে শোনান একসময়ের এই গায়ক।

এসময় সেখানে ‘খুঁটি’ নামের একটি ব্যান্ডদলের ভোকালিস্ট সাইফ এবং ‘সাসটেইন’ নামের আরেকটি ব্যান্ডের ভোকাল রাইসুল উপস্থিত ছিলেন। তারা মনছুরের গান শুনে মুগ্ধ হন।

সাইফ ও রাইসুল নব্বইয়ের দশকের সেই মনছুরকে ভালোভাবেই চিনতেন। তবে বর্তমান মনছুরের চেহারার জীর্ণশীর্ণ অবস্থা এবং নোংরা পোশাক পরিচ্ছদের কারণে মাঝেমধ্যে দেখা হওয়া সত্ত্বেও চিনতে পারেননি। যখন পরিচয় পান, তখন তারা হতবাক হয়ে যান।

ভিডিওর শেষ দিকে কাউন্সিলর শৈবাল দাস সুমন বলেন, ‘এভাবে শত শত মনছুর, গায়ক মনছুর, ভোকালিস্ট মরছুর, ব্যান্ডের অনেক তারকা বিভিন্ন কারণে, হয়তো নেশাগ্রস্ত হয়ে বা রাজনৈতিক কারণে কিংবা নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। মনছুরদের যেন এই অবস্থা না হয়, তারা সুন্দর জীবনযাপন করুক, ভালো একটি পরিবেশ পাক, এটিই কামনা করি।’

শৈবাল আরও বলেন, ‘যেই মেসেজটা দেওয়ার জন্য আজকের ভিডিও সেটি হলো, ড্রাগকে না বলুন, সুস্থ জীবনকে ধারণ করুন। আমি জানি না, এই গায়ক মনছুর মাদকাসক্ত ছিলেন কি না, বা রাজনৈতিক কোনো কারণে আজকে উনার এই অবস্থা কি না। তবে আশা করছি, এই ধরনের মনছুর যেন তৈরি না হয়। মনছুর ভাইয়ের জন্য শুভকামনা।’

(ঢাকাটাইমস/২১মে/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বিশেষ প্রতিবেদন বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :