ঘুষ না পেয়ে সরকারি কাজে বাধার অভিযোগ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে

দেশের উন্নয়ন অগ্রগতির প্রতি সরকারের কড়া নজর থাকলেও ঘুষের টাকা না পেয়ে নানা অজুহাতে সরকারি কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। তবে অভিযুক্ত প্রকৌশলীর ভাষ্য, কাজের জন্য উপযুক্ত মালামাল ঠিকাদার না আনায় কাজে অগ্রগতি নেই।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশলী অধিদপ্তরের (এলজিইডি) অধীন দুইটি আরসিসি গ্রিডের ব্রিজের কাজ পায় মোহাম্মাদ ইউনুছ অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লি. নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু কাজ পাওয়ার আগেই কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী মো. বিল্লাল হোসেন সরকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী পরিচালক শহিদুল ইসলামকে ফোন করে কাজ নিতে নিষেধ করেন। এছাড়া গাজীপুরে বাইরের কোনো ঠিকাদার এই কাজ করতে পারবে না বলেও তিনি এই ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে জানান।
এ বিষয়ে মোহাম্মাদ ইউনুছ অ্যান্ড ব্রাদার্স (প্রা.) লি. ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গাজীপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবার একটি অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। অভিযোগে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি ইজিপির নিয়ম অনুযায়ী দরপত্রে অংশগ্রহণ করে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি নোহা পাওয়ার পর থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তি (বিল্লাল হোসেন) ফোনের মাধ্যমে কাজটি ছেড়ে দেওয়ার হুমকি দেন। এমনকি সাইডে মালামাল চুরির সর্তকর্তা বা কাজটি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না বলেও ভয় দেখান।
অভিযোগকারী শহিদুল ইসলাম বলেন, আমি প্রকৌশলীর কোনো কথা তোয়াক্কা না করে নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গত ১ মার্চ কার্যাদেশ গ্রহন করি। কার্যাদেশ পাওয়ার পরপরই উপজেলা প্রকৌশলী কাজ শুরু করার জোর তাগিদ দেন। আমি স্বল্প সময়ের মধ্যে সাইডের প্রাথমিক সব কাজ সম্পন্ন করে ৭০ লাখ টাকার মালামাল ও দুটি পাইলিং মেশিনসহ ৫০ জন শ্রমিক নিয়ে লে-আউট দেওয়ার জন্য তাগিদ দেই। এরপর ১৫ বার উপ-সহকারীসহ ও চার-পাঁচজন সহকারী পাঠিয়ে মেজারমেন্টের নামে কালক্ষেপন করতে থাকেন প্রকৌশলী।
অভিযোগে ঠিকাদার শহিদুল আরও বলেন, ‘আমি সমস্যাটি বুঝতে পেরে উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে আলোচনায় বসলে তিনি জানান কাজটি করতে হলে ২০ লাখ টাকা দিতে হবে। না দিলে কাজটি বাস্তবায়ন হবে না। এই কাজটি অন্য ঠিকাদারকে পাইয়ে দিলে আমাকে (প্রকৌশলী) ২০ লাখ টাকা দিতেন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে নির্ধারিত দরের চেয়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম দরে কাজটি নিয়েছি। বিষয়টি জানিয়ে প্রকৌশলীকে অনুরোধ জানাই সহযোগিতার জন্য। এতে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে কাজটি কিভাবে বাস্তাবায়ন করি তার হুমকি দেন। একপর্যায়ে ৩৯ মিটার সেতুর পরির্বতে ৩৬ মিটার সেতু সংশোধনের কথা বলে কালক্ষেপন করেন।’
ধারাবাহিকভাবে হয়রানির অভিযোগ তুলে শহিদুল বলেন, ‘গত ২৮ অক্টোবর পাইলিং শেষ হলেও ঢালাই না দিয়ে সাইট থেকে চলে যান প্রকৌশলী বিল্লাল। প্রতিনিয়ত খুঁটিনাটি সমস্যা নিয়ে কাজ বন্ধ করে রাখেন এবং কাজটি যাতে বাস্তবায়ন না হয় সেজন্য নানা ধরনের হয়ারানি চালাচ্ছেন তিনি। আমি বর্তমানে কাজটি বাস্তবায়নসহ ক্ষতিপূরণ ও অনৈতিক কার্যকলাপে বিভাগীয় আইনি সহযোহিতা প্রার্থনা করছি।’
এ বিষয়ে অভিযোগকারী মো. শহিদুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘২০ লাখ টাকা ঘুষ না পেয়ে এই প্রকৌশলী ইচ্ছে করে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে হয়রানি করে কাজ বন্ধ রেখেছেন। আমি চিফ ইঞ্জিনিয়ার, জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ারের কাছে অভিযোগ করবো জানালে উত্তরে বিল্লাল বলেন বড় বড় এমপি-মন্ত্রীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক আমার। পারলে অভিযোগ দিয়ে কিছু করেন।’
অভিযুক্ত কালীগঞ্জ উপজেলার প্রকৌশলী বিল্লাল হোসেন সরকার ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘আমি তো ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে কাজ করার জন্য সহযোগিতা করছি। কিন্তু তারা বিভিন্নভাবে চুরি করতে চায়। প্রায় পাঁচ মাস ধরে মালামাল নিয়ে কাজ শুরু করা হয়েছে। কাজের অগ্রগতি কতটুকু জানতে চাইলে তিনি বলেন, কিছুটা হয়েছে। আর হবেই কীভাবে, কাজ করার জন্য যেসব মাল দরকার সেই মাল না এনে অন্য মাল নিয়ে আসে, এজন্য কাজের তেমন অগ্রগতি নেই।’
২০ লাখ টাকা ঘুষের অভিযোগের বিষয়ে এই প্রকৌশলী বলেন, ‘সরকারি কাজে আমি কেন ঘুষ চাইবো। আপনি সাইডে এসে দেখে যান। আপনি কালীগঞ্জ আসেন, চা খেয়ে যান, তাহলে বুঝতে পারবেন। আমার সঙ্গে স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক, কুমিল্লায় আমি পাঁচ বছর ছিলাম, তিনি আমাকে চেনেন। আমি সরকারি কাজে সবসময় সহযোগিতা করি।’
অভিযোগ রয়েছে, ২০২০ সালের মার্চে বিল্লাল হোসেন সরকার কালীগঞ্জ পোস্টিং হওয়ার পরেই স্থানীয় ঠিকাদারদের সঙ্গে ৮ শতাংশ কমিশন বাণিজ্যের একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। তার সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য কোনো ঠিকাদার কাজ পেলে বিল্লালকে দিতে হয় মোটা অংকের ঘুষ।
সিন্ডিকেটের বাইরে অন্য কোনো ঠিকাদার কাজ পেলে বিল্লালের কমিশন বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যায়। এ কারণে এ প্রকৌশলী সিন্ডিকেটের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠান কাজ করলে তা বাস্তবায়ন করতে গড়িমসি ও নানা হয়রানির মাধ্যমে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেন।
স্থানীয় ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উপজেলা প্রকৌশলী বিল্লাল হোসেন তার পছন্দের ঠিকাদারদের দিয়ে সব কাজ করিয়ে থাকেন। তার এই অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তিনি এমপি-মন্ত্রীর অত্যন্ত কাছের লোক বলে পরিচয় দেন। এসব মিথ্যা সম্পর্কের পরিচয় দিয়ে ঠিকাদারকে ভয় দেখিয়ে তিনি দীর্ঘ আড়াই বছর যাবৎ এই উপজেলায় নিজের রাজত্ব কায়েম করে চলছেন।
তারা অভিযোগ করে বলেন, স্থানীয় কিছু ঠিকাদারের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। চলতি বছরে জুন মাসে ঈদুল আজহার আগে উপজেলা ইউনিয়ন ও গ্রাম সড়ক উন্নয়নে অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় একটি ৪৫ মিটার গার্ডার ব্রিজের নির্মাণ কাজ চলছিল। গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বক্তারপুর ইউনিয়নের মোহনা নামক স্থানে। সেই ব্রিজের কাজ দেখভাল করতেন ইঞ্জিনিয়ার বিল্লাল হোসেন। বৃষ্টির সময় এবং জলাশয় পানি থাকা অবস্থায় ঢালাই দিতে বাধ্য করেন ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে। ফলে এই বৃষ্টির মধ্যে কাজ করতে গিয়ে মারা যান শ্রমিক লিয়াকত হোসেন। নিহত ওই শ্রমিকের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায়। লিয়াকতের পরিবারের সদস্যরা ইঞ্জিনিয়ার বিল্লালের সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি খারাপ আচারণ করেন।
লিয়াকত নামের শ্রমিক মারা যাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী বিল্লাল বলেন, সেটা তো অনেক আগে। আমি তো ঢালাই করার সময় সাইডে ছিলাম না। সাইড ইঞ্জিনিয়ার ছিল। আর এ ঘটনার তদন্ত হয়েছে, আপনি এসে সেই রিপোর্ট দেখে যান।
জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক মো. সেলিম ঢাকা টাইমসকে বলেন, এই বিষয়ে আমি তো জানি না। আমার কাছে কোনো অভিযোগ আসেনি। এটা নির্বাহী প্রকৌশলী বলতে পারবেন।
গাজীপুর জেলা নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুল বারেক ঢাকা টাইমসকে বলেন, কাজ নিয়ে ঝামেলা হচ্ছে, সেই বিষয় জানতে পারছি। ঠিকাদার কাজ করতে যেসব মালামাল ও মেশিন আনছে তা ত্রুটিপূর্ণ। তাই কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে।
আব্দুল বারেক বলেন, ‘আমার কাছে কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী বিল্লালের বিরুদ্ধে এখনও কোনো অভিযোগ আসেনি। তার বিরুদ্ধে যে ঘুষ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে তার প্রমাণ পেলে অব্যশই ব্যবস্থা নেব।’
এ বিষয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রধান প্রকৌশলী সেখ মোহাম্মদ মহসিন ঢাকা টাইমসের এ প্রতিবেদকে বলেন, ‘কালীগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা চিঠি পাইনি। আপনার কাছ থেকে আমি প্রথম শুনলাম। অভিযোগ আসলে যাচাই-বাছাই করবো।’
(ঢাকাটাইমস/৩১অক্টোবর/জেএ/কেএম)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































