ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আসলে কী, না মানলে যে শাস্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
| আপডেট : ০২ মার্চ ২০২৪, ০৯:৩৫ | প্রকাশিত : ০২ মার্চ ২০২৪, ০৮:৫৮

নগরীতে একের পর এক ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছেই। থামানো যাচ্ছে না কিছুতেই। শুধু রাজধানীতেই অগ্নিদুর্যোগের এক ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই নতুন করে ঘটছে অগ্নিকাণ্ড। দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্টরা কিছুটা সক্রিয় হলেও তার মেয়াদ স্বল্প সময় বা লোক দেখানো হওয়ার কারণেই এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরী এবং অগ্নিদুর্ঘটনায় সব সময়ের জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুতি না থাকায় দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি বেশি হচ্ছে বলে দাবি করছেন অনেকেই। এদিকে নগরীতে বেশিরভাগ ভবন নির্মাণ করা হয়েছে ইমারত বিধিমালা না মেনেই। প্রকাশ্যে বিধি লঙ্ঘন করা বেশিরভাগ ভবনের বিরুদ্ধেই নেওয়া হয় না প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা।

দেশে ১৯৯৬ সালে সর্বপ্রথম ইমারত নির্মাণ বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। এরপর ২০০৮ সালে হালনাগাদ করে সংস্কার করা হয় এবং ঢাকা মহানগর ইমারত (নির্মাণ, উন্নয়ন, সংরক্ষণ ও অপসারণ) বিধিমালা প্রণয়ন করে প্রজ্ঞাপন জারি করে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।

মাঝেমধ্যেই যেসব অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটছে তার প্রায় সব ভবনই ইমারত বিধিমালার কোনো বাস্তবায়ন নেই। ঘটনার পরই সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে বলা হয় অগ্নিকান্ডের ভবনগুলো নিয়মবহির্ভূতভাবে বানানো হয়েছে। এমনকি ভবন নির্মাণের পর অগ্নিঝুঁকি নিয়েই চলে ভবনের কার্যক্রম। তাতে এটা বোঝা যায় যে, বিধিমালা উপেক্ষা করা হচ্ছে ব্যাপকভাবে। ভবনের পরিকল্পনা পাস করা থেকে শুরু করে নির্মাণের সময় এবং নির্মাণের পরও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বরত কর্মকর্তারা বিধিমালা যাচাই করার কথা থাকলেও তাদের দায়িত্ব অবহেলার প্রমাণ হয় অগ্নিদুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে। তবে এসব বিষয়ে নানামুখী তদন্ত কমিটি হলেও তা আর আলোর মুখ দেখে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীতে ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া এবং পরবর্তীকালে এর ওপর নজর রাখার জন্য সরকারের অনেকগুলো বিভাগ রয়েছে। সেগুলোর কার্যক্রম জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।

ভবন মালিকরা ইমারত বিধিমালা মানছেন কি না, সেটি খতিয়ে দেখা হয় না। কিংবা এ ব্যাপারে সঠিক তথ্যও থাকে না কর্তৃপক্ষের কাছে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিধিমালা না মানলেও নির্মাণের অনুমতি মিলছে সহজেই।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ (অ.দা.) মো. সিরাজুল ইসলাম ঢাকা টাইমসকে বলেন, ‘রাজধানীতে ভবনে অগ্নিকাণ্ড রোধে ভবনের বসবাসযোগ্য সার্টিফিকেট নেওয়া বাধ্যতামূলক করতে হবে। মেয়াদ শেষ হলেই তা নবায়ন করতে হবে। অন্যথায় এই সার্টিফিকেট যারা না নিয়ে ভবন তৈরি করবেন এবং ভবন নির্মাণের পর যারা নবায়ন করবেন না তাদের শাস্তির আওতায় আনলে ভবনে অগ্নিদুর্ঘটনা কমে আসবে।’

সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘রাজউক থেকে বসবাসযোগ্য সার্টিফিকেট নিতে হলে ইমারত বিধিমালার সব নিয়ম মেনেই নিতে হয়। তাই এই সার্টিফিকেটের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। এবং সংশ্লিষ্টদের মাঠ পর্যায়ে পরিদর্শন ও তদারকি করতে হবে। দেশে বিধিমালা ঠিকই আছে, তবে মানার বালাই নেই। অনেকেই ইমারত নির্মাণ বিধিমালা না মেনেই ভবন নির্মাণ করেন।’

সংশ্লিষ্ট তথ্য বলছে, ভবন নির্মাণের অনুমোদন গ্রহণ না করা মূলত ইমারত নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ৩ (১) ধারা ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা, ১৯৯৬ এর ৩ উপবিধির লঙ্ঘন। অনুমোদনের বাইরে ভবন করলে নির্মাণ আইন, ১৯৫২ এর ১২ ধারা অনুযায়ী অভিযুক্ত ব্যক্তির সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও অন্যূন ৫০ হাজার টাকা জরিমানা হতে পারে। এই আইনটি মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ এর তফসিলভুক্ত হওয়ায় মোবাইল কোর্টেও এই আইনের অধীনে অপরাধ বিচার্য হবে।

তিন পর্যায়ে হবে ভবন নির্মাণের অনুমোদন:

ভবন নির্মাণ বিধিমালার অধীনে ভবনের নকশা ও বসবাস উপযোগিতার অনুমোদন তিনটি পর্যায়ে সম্পন্ন হবে। ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র, নির্মাণ অনুমোদনপত্র ও বসবাস বা ব্যবহার সনদপত্র।

ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র:

১) ভবন নির্মাণ অনুমোদনের আবেদনপত্র দাখিলের পূর্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র গ্রহণ করতে হবে।

২) জমির মালিকানা সংক্রান্ত কাগজপত্রসহ প্রস্তাবিত জমি ব্যবহার ছাড়পত্রের জন্য নির্ধারিত ফি সহ নির্ধারিত ছকের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে।

৩) আবেদনকারীর স্বাক্ষরিত তিন কপি আবেদনপত্র এবং এর সঙ্গে তিন কপি ১:৫,০০০ অথবা ১:১০,০০০ স্কেলে প্রণীত সাইটের জরিপ নকশা সংযোজন করতে হবে, যাতে জমি চিহ্নিত করার মতো আর.এস/সি.এস ম্যাপসহ একটি খসড়া স্থানিক নকশা থাকবে।

ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের মেয়াদ হবে অনুমোদনের তারিখ হতে ২৪ (চব্বিশ) মাস, মেয়াদ উত্তীর্ণ হলে নতুন করে ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে।

নির্মাণ অনুমোদনপত্র:

১) ভবন নির্মাণ করতে বা বিদ্যমান অবকাঠামো পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংযোজন করতে ইচ্ছুক হলে আইন অনুযায়ী নির্মাণ অনুমোদনপত্র গ্রহণ করতে হবে।

২) যথাযথ যোগ্যতাসম্পন্ন কারিগরি ব্যক্তিবর্গ নকশায় অমুদ্রিত স্বাক্ষর প্রদান করবেন এবং কারিগরি ব্যক্তিবর্গকে তাদের পেশাজীবী সংগঠনের সদস্য নম্বর ও রেজিষ্ট্রেশন নম্বর নকশা ও দলিলাদির নির্ধারিত স্থানে উল্লেখ করতে হবে।

৩) নির্মাণ অনুমোদনপত্রের জন্য আবেদনপত্রের সঙ্গে নিম্মলিখিত দলিলাদি (অ৩ বা অ৪ সাইজের কাগজে) নকশাসহ সংযুক্ত করে উপস্থাপন করতে হবে। যেমন-ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রের অনুলিপি, ফি প্রদানের রশিদ, আবেদনকারীর বৈধ মালিকানার প্রমাণস্বরূপ দলিলাদির সত্যায়িত অনুলিপি, যোগ্যতাসম্পন্ন কারিগরি ব্যক্তি কর্তৃক প্রদত্ত মৃত্তিকা পরীক্ষা প্রতিবেদন, অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ক্ষেত্রে তলাওয়ারী আবাস-ইউনিটের সর্বমোট সংখ্যা, প্লটের ক্ষেত্রফল, ভূমি আচ্ছাদন, সেট ব্যাক স্থানের পরিমাপ এবং মোট তলার সংখ্যা, প্রকল্পে নিয়োজিত স্থপতির অভিজ্ঞতার প্রমাণস্বরূপ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানে কারিগরি ব্যক্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত সার্টিফিকেটের অনুলিপি।

৪) অ সিরিজের (অ০ হইতে অ৪ সাইজ) কাগজে মেট্রিক মাপে সব নকশা প্রণয়ন করতে হবে।

৫) সাইট প্ল্যান বা এলাকা নকশা নূন্যতম ১:৪০০০ স্কেলে অঙ্কিত হবে এবং এতে নিম্নলিখিত তথ্য থাকতে হবে। যেমন- সাইট যে মৌজায় অবস্থিত, সাইটের অবস্থানসহ এর সি.এস. ম্যাপ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে আর.এস. বা এস.এ. ম্যাপের অংশবিশেষ অথবা সরকার বা অনুমোদিত বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকৃত প্রকল্পের ক্ষেত্রে সাইটের অবস্থানসহ প্রকল্প এলাকা নকশার অংশবিশেষ এবং সাইটের দাগ বা প্লট এবং পার্শ্ববর্তী দাগ বা প্লটসমূহের অবস্থান নির্দেশক।

৮) লে-আউট নকশা ১:২০০ স্কেলে অঙ্কিত হতে হবে ।

বসবাস বা ব্যবহার সনদপত্র:

১) ইমারত আংশিক বা সম্পূর্ণ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর এর ব্যবহার বা বসবাসের জন্য বসবাস বা ব্যবহার সনদপত্র গ্রহণ করতে হবে।

২) বসবাস বা ব্যবহার সনদপত্র গ্রহণের জন্য আবেদনপত্রের সঙ্গে নিম্নলিখিত দলিল ও নকশাদি কর্তৃপক্ষের সংরক্ষণের জন্য দাখিল করতে হবে-

সমাপ্তি প্রতিবেদন, রাজউকের অনুমোদিত স্থাপত্য নকশার ভিত্তিতে নির্মিত ইমারতের নির্মাণ নকশা, ইমারতের কাঠামো নকশা এবং ইমরাত সেবা সংক্রান্ত সব নকশা।

ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিসের বিধিমালায় যা আছে:

ভবন নির্মাণ ও নির্মাণের পরবর্তী সময়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের বেশকিছু বিধিমালা রয়েছে। এর মধ্যে অতিগুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে-

১. ভবনে প্রবেশের জন্য প্রবেশ পথ থাকতে হবে এবং আবাসিক বহুতল ভবনের সামনের প্রধান সড়ক কমপক্ষে নয় মিটার প্রশস্ত হতে হবে। একই প্লটে একাধিক ভবন থাকলে দমকল বাহিনীর গাড়ি প্রবেশের সুবিধার জন্য মূল প্রবেশ পথে গেটের উচ্চতা কমপক্ষে পাঁচ মিটার হতে হবে।

২. ভবনে ওয়েট রাইজার থাকতে হবে। প্রতি তলার ৬০০ বর্গমিটার ফ্লোর এরিয়ার জন্য একটি ও অতিরিক্ত ফ্লোর এরিয়ার জন্য আরও একটি রাইজার পয়েন্ট থাকতে হবে।

৩. স্বয়ংক্রিয় স্প্রিংকলার স্থাপন

৪. বহুতল ভবনে স্থায়ী অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থার জন্য ন্যূনতম ৫০ হাজার গ্যালন ধারণক্ষমতা সম্পন্ন আন্ডারগ্রাউন্ড রিজার্ভার থাকতে হবে। রিজার্ভার থেকে পানি যাতে নেওয়া যায় সেজন্য ড্রাইভওয়ে থাকতে হবে।

৫. ফায়ার ফাইটিং পাম্প হাউজ এবং এটি অগ্নি নিরোধক সামগ্রী দিয়ে নির্মাণ করতে হবে।

৬. সব স্মোক ও হিট ডিটেক্টর ও এয়ার ডাম্পার এর অবস্থান নকশায় চিহ্নিত করতে হবে।

৭. ভবন থেকে জরুরি নির্গমনের জন্য জরুরি নির্গমন সিঁড়ি ও ইমারজেন্সী লাইট ফ্লোর প্ল্যানে থাকতে হবে। এ পথ যাতে সহজে দেখা যায়। ভবনে ৫০০ জনের জন্য দুটি, এক হাজার জন পর্যন্ত তিনটি এবং এর বেশি লোক থাকলে চারটি সিঁড়ি রাখতে হবে। এটা শুধু আপৎকালীন সময়ে ব্যবহৃত হবে।

৮. বিকল্প সিঁড়ি থাকতে হবে এবং তা বেজমেন্ট পর্যন্ত সম্প্রসারিত হবে না।

৯. একাধিক লিফটের একটি বা চারটির বেশি লিফটের দুটি ফায়ার লিফট হিসেবে নির্মাণ ও নকশায় থাকতে হবে।

১০. রিফিউজ এরিয়া অর্থাৎ আগুন, তাপ ও ধোঁয়ামুক্ত নিরাপদ এলাকা। এটিও নকশায় থাকতে হবে।

১১. রান্নাঘরের চুলার আগুন নির্বাপণের জন্য ওয়েট কেমিক্যাল সিস্টেম থাকতে হবে।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের মিডিয়া সেলের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শাহজাহান শিকদার ঢাকা টাইমসকে বলেন, আমরা চাই যে সুস্থতা নিয়ে ভবন তৈরি হোক। সেজন্য ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে যে শর্তগুলো বলা আছে সেগুলো মেনে ভবন নির্মাণ করতে হবে। এর পাশাপাশি রাজউক এবং ফায়ার সার্ভিস থেকে 'ফায়ার সেফটি' নামে একটি প্ল্যান অনুমোদন করতে হবে, যেখানে বলা থাকবে অগ্নি নিরাপত্তার দিক থেকে ভবনটিকে নিরাপদ করতে হলে কী ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে।

তিনি বলেন, এই শর্তগুলো প্রতিপালন করলে ভবনটি নিরাপদ হয়। পরবর্তী ধাপ হলো প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করতে হবে যারা ফায়ার সেফটি ইক্যুইপমেন্ট সঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে। নিয়মিত মহরাও করতে হবে যাতে প্রশিক্ষণে যা শিখেছে তা যাতে ভুলে না যায়। এছাড়াও ভবন নির্মাণে যত বিনিয়োগ হয় এর মাত্র ২ শতাংশ যদি ফায়ার সেফটির জন্য বিনিয়োগ করা হয় তবুও পুরো ভবনটি নিরাপদ হয়।

(ঢাকাটাইমস/০২মার্চ/এইচএম/আরআর/কেএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

জাতীয় বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :