রাজনীতির ভাষা যখন অশালীন, বিএনপি কেন প্রতিক্রিয়াহীন

মো. আবদুল মান্নান
  প্রকাশিত : ১৭ মার্চ ২০২৬, ১৯:৫৪
অ- অ+

বাংলাদেশের রাজনীতিতে তীব্র মতপার্থক্য, প্রচণ্ড সমালোচনা এবং কঠোর ভাষার ব্যবহার নতুন কিছু নয়। রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইতিহাসে স্লোগান, ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ- সবই ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে একটি গোষ্ঠীর রাজনীতির ভাষা যে পর্যায়ে নেমে গেছে, তা রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সীমা অতিক্রম করে সামাজিক শালীনতারও অবক্ষয়ের ইঙ্গিত করছে।

বিশেষ করে কিছু রাজনৈতিক কর্মসূচি বক্তব্যে যে ধরনের অশ্লীল, অযাচিত ব্যক্তিগত আক্রমণ অসম্মানজনক ভাষা ব্যবহার করা হচ্ছে, তা শুধু ব্যক্তি বা দলের বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়, বরং সমগ্র রাজনৈতিক সংস্কৃতির ওপর একটি প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাছিরউদ্দিন পাটোয়ারীর বক্তব্য স্লোগান ঘিরে বিতর্ক। তার বিভিন্ন বক্তব্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা অন্য নেতাদের উদ্দেশে যে ধরনের ব্যক্তিগত আক্রমণ এবং কুরুচিপূর্ণ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, তা অনেকের কাছেই বিস্ময়কর।

অথচ ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে নতুন রাজনীতি ও তার নতুন ভাষা আশা করেছিলেন সবাই। বিশেষ করে জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে গঠিত দলের কাছে এটি ছিল আরও বেশি প্রত্যাশিত।

বিস্ময়ের বিষয় আরও একটি- ধরনের বক্তব্যের পরও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা কিংবা বড় রাজনৈতিক দলগুলো থেকে দৃশ্যমান জোরালো প্রতিক্রিয়া তেমন দেখা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে তীব্র বিরোধিতা নতুন নয়। অতীতে দলীয় সভা-সমাবেশে কঠোর সমালোচনা হয়েছে, বিরোধীদের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক ভাষণও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রেই একটি অলিখিত সীমারেখা ছিল- ব্যক্তিগত চরিত্রহনন, অশ্লীল গালিগালাজ কিংবা প্রমাণহীন গুরুতর অভিযোগ সাধারণত প্রধান ধারার রাজনৈতিক ভাষণে খুব কমই দেখা যেত।

এ ক্ষেত্রে অবশ্য বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের প্রধান শেখ হাসিনা ব্যতিক্রম ছিলেন, তার অশালীন ভাষার জন্য এখন মানুষের ঘৃণাও পাচ্ছেন তিনি। পাখি চলে গেলে রেখে যায় পালক- এই প্রবাদের পালকটি যেন বহন করছেন একজন সামনের সারির জুলাই যোদ্ধা। এটাই দুঃখজনক।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু নেতার রাজনৈতিক বক্তব্য যুক্তির বদলে ব্যক্তিগত আক্রমণ, গালিগালাজ এবং উত্তেজক স্লোগানে ভর করছে। রাজনীতির ভাষা কখনো কখনো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ট্রোল সংস্কৃতির কাছাকাছি চলে যাচ্ছে। নাছিরউদ্দিন পাটোয়ারীর বক্তব্য নিয়ে যে আলোচনা তৈরি হয়েছে, সেটি এই বৃহত্তর পরিবর্তনেরই একটি প্রতিফলন।

রাজনীতিতে যখন সমালোচনা যুক্তির জায়গা থেকে সরে গিয়ে অশ্লীলতা অপমানের পর্যায়ে পৌঁছে যায়, তখন তা শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করে না; বরং জনসমাজে রাজনৈতিক ভাষার মানও কমিয়ে দেয়। অনেকেই মনে করেন, এমন বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি হলে তা সময়ের সঙ্গেস্বাভাবিক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। তখন অশালীনতা আর ব্যতিক্রম থাকে না; বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।

এই বিতর্কের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলোযাদের বিরুদ্ধে এসব বক্তব্য দেওয়া হয়েছে, তাদের অনেকেই প্রকাশ্যে খুব শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাননি। বিশেষ করে বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের দিক থেকে তেমন কোনো দৃশ্যমান প্রতিবাদ দেখা যায়নি।

একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দল সাধারণত দুভাবে প্রতিক্রিয়া জানায় . রাজনৈতিকভাবে পাল্টা যুক্তি দিয়ে। . প্রয়োজনে আইনি পদক্ষেপ নিয়ে। এই দুইয়ের কোনোটিই স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান নয়।

প্রশ্ন উঠছে- কেন এই নীরবতা? একটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা হতে পারে রাজনৈতিক কৌশল। অনেক সময় রাজনৈতিক দলগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো বিতর্ককে বড় করতে চায় না। তারা মনে করে, প্রতিক্রিয়া দিলে বিতর্ক আরও ছড়িয়ে পড়তে পারে।

সম্প্রতি বিএনপির একজন ক্ষুব্ধ নেতা নাছিরউদ্দিন পাটোয়ারীর বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করেছিলেন- এমন খবর সামনে আসে। দলীয় অনুমতি ছাড়া মামলা করার কারণে ওই নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানা যায়।

অন্যদিকে দলের অভ্যন্তরীণ যুক্তি হতে পারে- দলীয় কৌশল এবং আইনি পদক্ষেপ সমন্বিতভাবে নেওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগত উদ্যোগে মামলা করলে তা রাজনৈতিক কৌশলের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। তবু সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি বিভ্রান্তিকর মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে দুটি সম্ভাব্য ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। প্রথমত, বিএনপি হয়তো বিষয়টিকে ততটা গুরুত্ব দিতে চাইছে না। তারা মনে করতে পারে- ধরনের বক্তব্যের রাজনৈতিক গুরুত্ব সীমিত।

দ্বিতীয়ত, দলটি হয়তো কোনো ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত বাড়তে দিতে চাইছে না। রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় অনেক দলই এ ধরনের পরিস্থিতি এড়িয়ে চলে।

সম্প্রতিক অশালীন বক্তব্যের পুরো ঘটনাকে কেবল ব্যক্তি বা দলীয় দ্বন্দ্ব হিসেবে দেখলে বিষয়টির গভীরতা বোঝা যাবে না। এটি আসলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির বৃহত্তর সংকটের প্রতিফলন।

রাজনীতি যখন নীতি, আদর্শ কর্মসূচির পরিবর্তে ব্যক্তিগত আক্রমণ উত্তেজক বক্তব্যে ভর করে, তখন তা গণতন্ত্রের জন্যও অস্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে। গণতন্ত্রে কঠোর সমালোচনা থাকবে, কিন্তু সেই সমালোচনা যুক্তি তথ্যভিত্তিক হওয়াই কাম্য।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব। এখন রাজনৈতিক বক্তব্য শুধু মঞ্চে সীমাবদ্ধ থাকে না। মুহূর্তের মধ্যে তা ভিডিও ক্লিপ হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে উত্তেজক, আক্রমণাত্মক বা অশ্লীল বক্তব্য অনেক সময় দ্রুত ভাইরাল হয়। কিছু রাজনীতিবিদ হয়তো মনে করেন- ধরনের বক্তব্য তাদের জনপ্রিয়তা বাড়ায়। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা রাজনীতির ভাষাকে আরও নিচের দিকে ঠেলে দেয়।

আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় একটি বিপজ্জনক ধারণা তৈরি হচ্ছেকেউ যদি উচ্চস্বরে আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করেন, তাকেসাহসী’ বলে প্রচার করা হয়। এই মানসিকতা রাজনীতিকে ধীরে ধীরে আরও সংঘাতমুখী করে তোলে।

এই পরিস্তিতি বিএনপির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা। তাদের সামনে দুটি বড় চ্যালেঞ্জ- . রাজনৈতিক আক্রমণের জবাব দেওয়া; . একই সঙ্গে শালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বজায় রাখা। এই দুইয়ের ভারসাম্য বজায় রাখাই একটি পরিণত রাজনৈতিক দলের পরিচয়।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেক কঠিন সময় এসেছে। কিন্তু রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকেই ভাষার শালীনতা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন। কারণ তারা জানতেন, রাজনীতির ভাষা সমাজের ভাষাকেও প্রভাবিত করে। যখন রাজনীতিতে অশালীনতা বাড়ে, তখন তা ধীরে ধীরে সামাজিক আচরণেও প্রভাব ফেলে।

নাছিরউদ্দিন পাটোয়ারীর বক্তব্য নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শুধু একজন ব্যক্তির বক্তব্যের প্রশ্ন নয়। এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষা, রাজনৈতিক কৌশল এবং দলীয় প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি- সবকিছুকেই নতুন করে আলোচনায় নিয়ে এসেছে।

রাজনীতিতে মতপার্থক্য থাকবে, তীব্র বিতর্ক থাকবে, কিন্তু সেই বিতর্ক যেন যুক্তি, তথ্য এবং শালীনতার সীমার মধ্যে থাকেএটাই গণতান্ত্রিক রাজনীতির সৌন্দর্য।

লেখক: সংবাদকর্মী।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
নালিতাবাড়ীতে গলায় বাদাম আটকে ৩ বছরের শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু
আগামীকাল থেকে বাধ্যতামূলক হচ্ছে বাংলা কিউআর
পতেঙ্গায় কোস্ট গার্ডের অভিযানে বিপুল বিদেশি মদ, বিয়ার ও সিগারেট জব্দ
ই-অরেঞ্জের প্রধান উপদেষ্টা মাসুকুর রহমান গ্রেপ্তার
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা