ভেনেজুয়েলায় শতাব্দীর শক্তিশালী ভূমিকম্পের নেপথ্যের কারণ জানালেন বিশেষজ্ঞরা

বিশ্বজুড়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে পৃথক তিনটি দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে একদিনের ব্যবধানে এসব ভূকম্পন অনুভূত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। একই সময়ে বিশ্বের ভিন্ন ভিন্ন প্রান্তে এ ধরনের ভূমিকম্পের ঘটনায় এগুলোর মধ্যে কোনো অভ্যন্তরীণ যোগসূত্র রয়েছে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বিজ্ঞানী ও বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে পরপর দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্পে ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলা। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, এতে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত দেশটির কর্তৃপক্ষ কোনো আনুষ্ঠানিক হতাহতের সংখ্যা প্রকাশ করেনি।
আজ বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা ক্যালটেকের ভূকম্পবিদ ড. লুসি জোন্সের বরাতে জানিয়েছে, এ ধরনের ঘটনার মধ্যে কোনো ধরনের যোগসূত্র নেই।
তিনি বলেন, ভূমিকম্পগুলো পৃথক ফল্ট সিস্টেম এবং প্লেট সীমানায় সংঘটিত হয়েছে। এর অর্থ হলো একটির কারণে অন্যটি ঘটেনি। হাজার হাজার মাইল দূরে সংঘটিত বড় ভূমিকম্পগুলো সাধারণত অন্য কোথাও আরেকটি বড় ভূমিকম্পের সম্ভাবনা বাড়ায় না।
জোন্স বলেন, সময়কালটি কাকতালীয় মিলে গেছে। কিন্তু স্থানগুলো ভিন্ন ভিন্ন রয়েছে। প্রতিটি ভূমিকম্প সক্রিয় প্লেট সীমানা বরাবর আঘাত হেনেছে। এসব এলাকায় কয়েক দশক এমনকি শতাব্দী ধরে চাপ তৈরি হচ্ছিল।
তিনি বলেন, অঞ্চলগুলোতে বড় ভূমিকম্প প্রাকৃতিক চক্রের একটি প্রত্যাশিত ঘটনা। যদিও ভূমিকম্প ঠিক কখন একটি ঘটবে তা সঠিকভাবে ভবিষ্যদ্বাণী করা অসম্ভব।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলার ভূমিকম্পের মূল কারণ হলো ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থলে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ভূগর্ভস্থ চাপ। এই চাপ হঠাৎ মুক্তি পাওয়ায় অগভীর “স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিং” প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শক্তিশালী কম্পন সৃষ্টি হয়েছে।
ভূতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্যারিবীয় প্লেট প্রতি বছর ধীরে ধীরে দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের তুলনায় সরে যাচ্ছে, যার ফলে বোকোনো ফল্টসহ একাধিক সক্রিয় ফাটল অঞ্চলে শক্তি সঞ্চিত হচ্ছে। এই শক্তি নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলে হঠাৎ ভূমিকম্পের আকারে তা প্রকাশ পায়।
ইউএসজিএসের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক ভূমিকম্প দুটি খুব অল্প সময়ের ব্যবধানে সংঘটিত হওয়ায় এটিকে “ডাবলেট” ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, যা একই ফল্ট সিস্টেমে ধারাবাহিক ফাটল সক্রিয়তার ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও সতর্ক করেছেন যে, আফটারশক অব্যাহত থাকতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে আরও শক্তিশালী কম্পনের ঝুঁকিও রয়েছে। পাশাপাশি ভূমিধসসহ গৌণ বিপর্যয়ের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভেনেজুয়েলা এমন একটি ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত, যেখানে ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান টেকটোনিক প্লেটের সংযোগস্থল রয়েছে। ভূতাত্ত্বিকভাবে এটি অত্যন্ত সক্রিয় একটি অঞ্চল।
ইউএসজিএস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক ভূমিকম্প দুটি ক্যারিবীয় ও দক্ষিণ আমেরিকান প্লেট সীমান্তের কাছে অগভীর “স্ট্রাইক-স্লিপ ফল্টিং”-এর কারণে সংঘটিত হয়েছে। এই ধরনের ফল্টে ভূত্বকের দুটি অংশ অনুভূমিকভাবে বিপরীত দিকে সরে যায়, এবং এই সঞ্চালন দ্রুত হলে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
সংস্থাটির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ভূমিকম্পকে একটি নির্দিষ্ট বিন্দু নয়, বরং একটি বৃহৎ ফল্ট এলাকার স্লিপিং প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা বেশি উপযুক্ত। বুধবারের দুটি ভূমিকম্প একসঙ্গে সংঘটিত হওয়া একটি জটিল রাপচার প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেয়, যেখানে একই অঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে ফাটল সক্রিয় হয়।
প্রথম ভূমিকম্পটির মাত্রা ছিল ৭ দশমিক ২ এবং এর কেন্দ্র ছিল রাজধানী কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে মোরন শহরের কাছে। দ্বিতীয়টি ছিল আরও কাছাকাছি ও অগভীর, যার গভীরতা ছিল মাত্র ১০ কিলোমিটার। অগভীর ভূমিকম্প সাধারণত বেশি ধ্বংসাত্মক হয়।
তীব্র কম্পনে রাজধানী কারাকাসসহ পুরো দেশ কেঁপে ওঠে। প্রতিবেশী দেশ কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতাতেও কম্পন অনুভূত হয়। পরবর্তীতে ২০টিরও বেশি আফটারশক রেকর্ড করা হয়।
ভূতাত্ত্বিকদের মতে, ভেনেজুয়েলার “বোকোনো ফল্ট” ব্যবস্থার সক্রিয়তার ফলেই এই ভূমিকম্পগুলো ঘটেছে। ক্যারিবীয় প্লেট প্রতি বছর প্রায় ২০ মিলিমিটার হারে দক্ষিণ আমেরিকান প্লেটের তুলনায় পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে শক্তি সঞ্চয় করে বড় ভূমিকম্প সৃষ্টি করে।
ইউএসজিএস আরও সতর্ক করেছে যে আফটারশক অব্যাহত থাকতে পারে এবং নতুন করে শক্তিশালী কম্পনের ঝুঁকি রয়েছে। একই সঙ্গে উত্তর ভেনেজুয়েলায় ভূমিধসের সম্ভাবনাও রয়েছে।
(ঢাকাটাইমস/২৫ জুন/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































