জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও আমাদের প্রত্যাশা

ঢাকা টাইমস ডেস্ক
  প্রকাশিত : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০১:৪৮| আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০২:০২
অ- অ+

আজ ৫ আগস্ট। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি। এদিন ছাত্র-জনতার সম্মিলিত বিপ্লবে পতন ঘটে জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের। ঐতিহাসিক এ দিবসে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।

দেশমাতৃকা ও গণতন্ত্র রক্ষার ঐতিহাসিক এই অভ্যুত্থানে আহত, পঙ্গুত্ববরণকারী ও দৃষ্টি হারানো সকল বীর যোদ্ধার ত্যাগ ও অবদান শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এই গণঅভ্যুত্থানের পটভূমি তৈরি করতে গিয়ে ফ্যাসিবাদের ১৬ বছর যারা শহীদ, গুম, খুন, ক্রসফায়ারের শিকার হয়েছেন। বিনম্র চিত্তে স্মরণ করছি ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের। শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি ৫২, ৬৯ ও ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের।

জুলাই গণঅভ্যুত্থান ছিল দীর্ঘ শোষণ, বঞ্চনা, দুঃশাসন, দুর্নীতি, লুটপাট, ক্রসফায়ার, গুম-খুন, অপহরণ, নির্যাতন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে জনতার ক্ষোভের বিস্ফোরণ। বৈষম্যের বিরুদ্ধে লাখো ছাত্র-জনতা বন্দুকের নলের সামনে এসে বুক চিতিয়ে দাঁড়ালো। হাসিনার নির্দেশে নির্বিচারে গুলি চালানো হলো ছাত্র-জনতার ওপর। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের সারি সারি লাশ পড়ে থাকলো ঢাকার রাজপথে। ঢাকার পিচঢালা কালো রাস্তা শিশুদের রক্তে লাল হয়ে গেল। অকাতরে জীবন দিলো দেশের মানুষ। হাজারো ছাত্র-জনতার জীবন উৎসর্গের মধ্য দিয়ে শ্বাসরুদ্ধকর পরিবেশ থেকে মুক্তি পায় আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ।

শেখ হাসিনার ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনে সোনার বাংলাকে পরিণত করা হয়েছিল মৃত্যু-উপত্যকায়। ফ্যাসিস্ট শাহির ভয়ংকর সময়ে দেশের মানুষ ছিল অধিকারহারা। দেশে গণতন্ত্র ছিল না। মানবাধিকার ছিল না। আইনের শাসন ছিল না। ভোটাধিকার ছিল না। বাকস্বাধীনতা ছিল না। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল না। ন্যায়বিচারের ব্যাংক হয়ে হয়ে পড়েছিল দেউলিয়া। মানবতার কোষাগার শূন্য হয়ে পড়েছিল। ছিল না স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি।

সাংবাদিক, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীরাও রেহাই পাননি শেখ হাসিনার নিষ্ঠুর শাসন থেকে। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক আফতাব আহমদ, সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ দম্পতি, অ্যাডভোকেট এ ইউ আহমদ, ব্যাংকার বি এম বাকের হোসাইনসহ অসংখ্য পেশাজীবীকে হত্যা করা হয়েছিল। শেখ হাসিনার ১৬ বছরে জীবন দিতে হয় ৬৮ জন সাংবাদিককে। শুধু জুলাই বিপ্লবের সময় জীবন দিতে হয়েছে ৬ জন সাংবাদিককে। আহত ও জেলে যেতে হয়েছে অনেককে।

পিলখানায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়। শাপলা চত্বরে ব্রাশফায়ারে অসংখ্য আলেমকে হত্যা করা হয়। গুম-খুন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। ভিন্নমতের লোকদের ধরে নিয়ে টুকরো টুকরো করে কেটে নদীতে ফেলে দেয়া হতো। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, কৃষিবিদ, শিক্ষক, ব্যাংকার থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক কর্মী- কেউ রেহাই পায়নি শেখ হাসিনার নিষ্ঠুরতা থেকে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে এক কাপড়ে ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। মিথ্যা মামলা দিয়ে কারাগারে আটকে রাখা হয় বছরের পর বছর। কারাগারে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ার পরও দেশের সবচেয়ে জননন্দিত নেত্রীকে চিকিৎসা না দিয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয় হাসিনা সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কনিষ্ঠ সন্তান আরাফাত রহমান কোকোর ওপর অমানুষিক নির্যাতন মধ্যযুগীয় বর্ববরাতাকেও হার মানিয়েছে। বিএনপি মহাসচিব, মার্জিত রাজনীতিক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকেও বারবার হাসিনার বন্দিশালায় রুদ্ধ রাখা হয়েছিল। বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৯৮৩টি মিথ্যা ও হয়রানিমূলক মামলা করা হয়। একইভাবে জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের ওপরও চালানো হয় নিষ্ঠুর নির্যাতন।

সাংবাদিকদের সেকেন্ড হোম জাতীয় প্রেস ক্লাব দখল করে নেয় দলীয় সাংবাদিকদের দিয়ে। দৈনিক আমার দেশ, দিনকাল, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টেলিভিশন, ইসলামিক টেলিভিশনসহ সারাদেশের দুই শতাধিক সংবাদ মাধ্যম বন্ধ করে দেয়। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, সংগ্রাম সম্পাদক আবুল আসাদ, যায়যায় দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, শীর্ষ কাগজ সম্পাদক একরামুল হক, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রুহুল আমিন গাজীসহ অনেক সাংবাদিককে কারারুদ্ধ করে নিষ্ঠুর নির্যাতন চালানো হয়।

চাকরি, পদোন্নতি হতো দলীয় বিবেচনায়। ভিন্নমতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তিমূলক বদলি, পদোন্নতিবঞ্চিত ও চাকরিচ্যুতি ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এবং র‌্যাব গোপন টর্চার সেল আয়নাঘরতৈরি করে সেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চালানো হতো বর্বর নির্যাতন।

ভোটাধিকার হরণ, ভিন্নমত দলন, বিনাবিচারে মানুষ হত্যা, গুম-খুন, ক্রসফায়ার, নির্যাতন-নিপীড়ন, গায়েবি মামলা, দুর্নীতি, লুটপাট, বিদেশে অর্থ পাচার, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে নিত্যপণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, ব্যাংকের ভল্টে সোনা জালিয়াতি, বিমানবন্দরের ভল্ট থেকে সোনা চুরি, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংক লুট, শোষণ-বঞ্চনা এমনভাবে বেড়ে ছিল যে, দেশ মনুষ্য বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়ে। দুর্নীতি এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একটি আইসিইউ ইউনিটের পর্দার দাম ৩৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেখানো হয়েছিল।

এমনই পরিস্থিতিতে বিরোধী রাজনৈতিক জোটের পক্ষে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এক দফার ডাক দেন। এরই মধ্যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্ররা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। ছাত্রদের পক্ষে এসে দাঁড়ায় পেশাজীবী-জনতা। রাজপথে নেমে আসে অভিভাবক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও। হাসিনার নির্দেশে তাদের ওপর গুলি চালানো হলো। পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবি নির্বিচারে গুলি চালালো ছাত্রদের বুকে। সারি সারি লাশ পড়ে থাকলো রাস্তায়। হাসপাতালগুলোর বেড এমনকি মেঝে পর্যন্ত পরিপূর্ণ হয়ে যায় আহত ও গুলিবিদ্ধ ছাত্র দ্বারা। শেখ হাসিনা পঙ্গু হাসপাতাল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসকদের নির্দেশ দেন 'নো ট্রিটমেন্ট, নো রিলিজ। অর্থাৎ কর্তব্যরত চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে আহতদের কোনো চিকিৎসা না দিতে এবং কাউকে এখান থেকে বাইরে না যেতে দিতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। বিনা চিকিৎসায় অনেকের মৃত্যু হলো।

গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আমাদের সে সন্তানরা শহীদ হয়েছেন, তাদের মৃতদেহ প্রশাসনের নির্দেশে সুরতহাল করতে দেয়া হয়নি, কাউকে কাউকে ডেথ সার্টিফিকেটও দেয়া হয়নি। এমনকি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে যাওয়ার পর যারা সেখানেই শহীদ হয়েছেন তাদের ডেথ সার্টিফিকেটে গুলিতে মারা গেছে- এই কথাটিও লিখতে দেয়া হয়নি। শ্বাসকষ্ট কিংবা জ্বরে মারা গেছে এ ধরনের কথা লিখতে বাধ্য করা হয়েছে। আন্দোলনে শহীদের লাশ দাফন করতে যাচ্ছে জানতে পারলে রাস্তায় পুলিশ তাদের পরিবারের ওপর হামলা-আক্রমণ করেছে।

মানবতাবিরোধী অপরাধের মাত্রা এতটাই ভয়াবহ ছিলো যে, দ্রুত শহীদদের লাশ দাফন করতে বাধ্য করা হয়েছে। এ কারণে তাদের কোনো পোস্টমর্টেম রিপোর্ট দেয়া হয়নি। ঘটনাটি কোনো স্বাভাবিক বিষয় নয় বরং তা মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি জাজ্জ্বল্যমান প্রমাণ। এটিই প্রমাণ করে কী ধরনের নিষ্ঠুরতার সাথে জুলাই-আগস্টে হত্যাকাণ্ডগুলো চালানো হয়েছিল। কিন্তু ছাত্ররা থামলো না। তাদের ওপর বিমান থেকেও চালানো হলো গুলি। একজন নয়, দুজন নয়- চৌদ্দ শ ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হলো। দমানো গেলো না তাদের। দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার এক অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থান দেখলো বাংলাদেশ।

দেড় যুগ ধরে নিপীড়িত মানুষের ক্ষোভের বারুদ বিস্ফোরিত হলো চব্বিশের জুলাই-আগস্টে। পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। উল্লাসে ঢাকার রাজপথে নেমে আসে কোটি জনতা। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জিত হয়েছিল। এর ৫৩ বছর পর স্বাধীন ভূখণ্ডে দাঁড়িয়ে বুকে মাথায় লাল-সবুজের গর্বিত পতাকা নিয়ে আরো এক বিজয় অর্জন করলো তেজোদীপ্ত তারুণ্য। তাদের দৃঢ় প্রত্যয়ে পাশে এসে দাঁড়ানো পেশাজীবীসহ স্বতঃস্ফূর্ত জনতার অকুণ্ঠ সমর্থন জন্ম দিল এক উজ্জ্বল চব্বিশ-এর। জনগণ যার নাম দিয়েছে দ্বিতীয় বিজয়

এই দ্বিতীয় বিজয় হতাশ জাতির মাঝে আশার আলো জাগিয়েছে। মানুষ নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। বেড়েছে জনপ্রত্যাশাও। আমাদের প্রত্যাশার কথা যদি বলি, আমরা চাই এমন একটি দেশ যেখানে দুর্নীতি, হানাহানি, গুম, খুন, রাহাজানি, ক্রসফায়ার, ধর্ষণ থাকবে না; নাগরিক নির্যাতনের জন্য থাকবে না আয়নাঘর। থাকবে না বৈষম্য, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বাজার সিন্ডিকেট, ক্ষমতার অপব্যবহার। থাকবে না মব জাস্টিস।

আমরা একটা কল্যাণমূলক রাষ্ট্র চাই, যে রাষ্ট্র সব নাগরিকের কল্যাণে কাজ করবে। আমরা সেই রাষ্ট্র চাই, যেখানে সব নাগরিক সমঅধিকার ভোগ করবেন। কোনো বৈষম্য থাকবে না। চাকরির ক্ষেত্রে দলীয় বিবেচনা নয়, মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ-পদোন্নতি হবে।

আমরা এমন একটা রাষ্ট্র চাই, যার মালিক হবেন দেশের জনগণ। আমরা নীতিভিত্তিক রাষ্ট্র চাই, নেতাভিত্তিক নয়। যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন, জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে তাদের। এক ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়, জনগণের ইচ্ছায় দেশ পরিচালিত হবে। আমরা চাই জনগণই ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে। দিনের ভোট রাতে হবে না। হবে না ডামি নির্বাচন। প্রহসনের নির্বাচন কিংবা কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে জনরায় কেড়ে নেয়া হবে না।

নতুন বাংলাদেশকে আমরা স্বাবলম্বী দেখতে চাই। সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতির অবসান চাই। একটা শোষণমুক্ত সমাজ চাই। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন চাই। আমরা সর্বত্র ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন চাই। আমরা আর কোনো বিচারপতির মুখে শুনতে চাই না টুথ ইজ নো ডিফেন্স। আমরা এমন এক দেশ চাই, যেখানে নারী-পুরুষ, শিশু-বৃদ্ধ, জাতি-ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, মতাদর্শ নির্বিশেষে সবাই নাগরিক হিসেবে রাষ্ট্রের কাছে সর্বোচ্চ মর্যাদা পাবে। সাংবিধানিকভাবে দেশের প্রত্যেক নাগরিকের স্বীকৃতি ও অধিকার সুরক্ষা পাবে। সরকারি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মানুষকে সম্মান করবে সর্বোচ্চ সেবা দেবেন। মোদ্দা কথা, আমরা দুর্নীতিমুক্ত জবাবদিহিমূলক এবং ন্যায়বিচারের বাংলাদেশ দেখতে চাই।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে সংস্কার চাই। এ বাহিনী যেন রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ বা দলীয় ঠ্যাঙ্গাড়ে বাহিনীতে পরিণত না হয়। এমন এক রাষ্ট্র কল্পনা করি, যেখানে নৈতিকতা, মানবিকতা, ন্যায়বিচার, সমতা এবং স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে। নারী-পুরুষের সমান অধিকার নিশ্চিত হবে। সমাজে দারিদ্র্যের শিকার কেউ হবে না, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত হবে। সরকারের ভূমিকা হবে নমনীয়, প্রয়োজনমতো কঠোরতা ও মানবিকতা প্রদর্শন। বিরোধী দলকে শোষণ না করে, সব দলের মূল লক্ষ্য হবে রাষ্ট্রের উন্নয়ন। একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংবিধানের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে বৈষম্য দূর হবে। বিনা খরচে মানসম্মত শিক্ষা ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে। কথায় কথায় ওষুধের মূল্যবৃদ্ধি হবে না।

সম্পদের সুষম বণ্টন, সামাজিক নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে অর্থনৈতিক সমতা আনা হবে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা হবে। নারীর ক্ষমতায়ন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতের জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করার প্রতিশ্রুতি থাকবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক নীতি থাকবে।

আমরা আর কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চাই না। আমরা আশা করি, সুশৃঙ্খল ও সমৃদ্ধতায় আমাদের এই দেশ হবে এমন এক আইডল, যা দেখে পিছিয়ে পড়া দেশগুলো শিক্ষা নেবে। বাংলাদেশের দিকে অবাক বিস্ময়ে তাকাবে। আমাদের এই মাতৃভূমিতে একজন লোকও না খেয়ে থাকবে না। রাস্তায় ধুলো-মলিন দিন কাটাবে না কোনো শিশু। কেউ কাউকে ধোঁকা দেবে না, দেশের টাকা বিদেশে পাচার করবে না। অন্যের ক্ষতি করবে না। অন্যের দুঃখে ব্যথিত হবে, পাশে দাঁড়াবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে।

নারীদের জন্য চাই মায়ার চাদরে ঘেরা অকৃত্রিম প্রেমের বাংলাদেশ। লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হবে না একজন মা-বোনও। ঘরে-বাইরে, চাকরিস্থলে তারা থাকবেন নিরাপদ। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য চাই বিশুদ্ধ মায়া ও শ্রদ্ধার বাংলাদেশ। কেউ আর নিজেদের বৃদ্ধ বাবা-মাকে বোঝা মনে করবে না। বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে হবে না কোনো বাবা-মাকে।

দীর্ঘদিন বাংলাদেশ বিভেদ আর বিভক্তির মধ্য দিয়ে গিয়েছে। দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব নিয়েও ছিল টানাপোড়েন। অন্যায়-অনিয়ম, লুটপাট, সন্ত্রাস, মূল্যস্ফীতি, ভোট চুরি, ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল নিত্যদিনের চিত্র। অতীত ও পুরনো দিনকে প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র-জনতা নতুন বাংলাদেশের সূত্রপাত করেছে।

নতুন বাংলাদেশে চাই মুক্ত রাজনৈতিক পরিবেশ, যেখানে ভয়ের ঊর্ধ্বে থেকে সরকারের সমালোচনা করা যাবে। যেখানে শ্রেণিহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা পাবে এবং সবাই ন্যায়বিচার পাবে। রাষ্ট্র যেন তার প্রতিটা নাগরিকের কথা গুরুত্বের সঙ্গে শোনে। আমরা চাই, বাংলাদেশের মানুষ মাথা উঁচু করে বাঁচুক। যার যে বিশ্বাস, তা নিয়েই বেঁচে থাকুক। চাই আগামীর বাংলাদেশ হোক মানবিক, দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত ও পরমতসহিষ্ণু। বিভেদের বদলে হোক ঐক্য। তাই আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দরকার নিজেকে পাল্টানো।

আমরা সবাই বাংলাদেশের পরিবর্তন চাই, কিন্তু নিজের পরিবর্তন করতে নারাজ। ব্যক্তি বা নাগরিক কেমন হওয়া উচিত- এটা সবাই জানি মোটামুটি। এবার শুধু জানলেই হবে না বরং মানতে হবে আমাদের। সততা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা আর ভালোবাসার মানদণ্ডে এগিয়ে থাকতে হবে প্রতিটি নাগরিককে। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, মব জাস্টিস ও অন্যায়কে না বলার সাহস থাকতে হবে প্রতিটি নাগরিকের। নিজেকে পরিবর্তন করতে হবে, তাহলেই সামগ্রিক পরিবর্তন সহজ হবে।

দুষ্টের দমন ও শিষ্টের লালন করতে হবে। এতো দিন দুষ্টরা ছিল রাষ্ট্র ও সমাজের কর্ণধার। আর এই মুহূর্তে দুষ্টদের দমন করে শিষ্টের লালন করতে হবে সবাইকে। অপরাধী যেই হোক, তার বিচার নিশ্চিতের পাশাপাশি বিনা দোষে কাউকে ন্যূনতম কষ্ট যেন না পেতে হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিটি বিবেককে জাগ্রত রেখে তারপর সাদাকে সাদা আর কালোকে কালো বলতে হবে।

এতো দিন নেতার পরিবর্তন হলেও নীতির পরিবর্তন দেখিনি। এবার নীতির পরিবর্তন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। ক্ষমতার রাজনীতি নয় বরং কল্যাণের রাজনীতি দেখতে চাই। রাতে ভোট চুরি করে আর দিনের বেলায় ভোট সুষ্ঠু হয়েছে- এই মর্মে বক্তব্য শুনতে চাই না আর। নিজ দলের বিরুদ্ধে ভেটো দিলে এমপি পদ স্থগিত করার মতো বাজে সিস্টেমগুলোর পরিবর্তন চাই। আমরা চাই সবকিছুতে স্বয়ংসম্পূর্ণ নতুন এক বাংলাদেশ, যেখানে রাজনীতিতে থাকবে স্বকীয়তা, অর্থনীতি হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। জীবন যাপন হবে স্বাধীন ও জবাবদিহিতায় এক অনন্য অসাধারণ জীবনমানের।

একটা বনের স্বাধীন পাখিকে খাঁচায় বন্দি করে যতই আদর-আপ্যায়ন করা হোক না কেন, এই অবকাঠামোগত উন্নয়ন আর জামাই আদর পাখির কাছে পছন্দ হবে না।

মুক্ত-স্বাধীন পাখিটি চায় খোলা আকাশে ওড়ার স্বাধীনতা। আমরা অবকাঠামোগত দিক দিয়ে উন্নত হচ্ছি ঠিকই, কিন্তু সেই সাথে বিসর্জন দিতে হচ্ছে ওই পাখিটির মতো খোলা আকাশে ওড়ার স্বাধীনতা! আমরা গণতন্ত্র চাই। আমরা ভোটাধিকার ফেরত চাই। আমরা চাই জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই দেশ পরিচালনা করুক।

সর্বশেষ, চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আমরা জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা ফ্যাসিস্ট শাহীকে তাড়াতে সক্ষম হয়েছি। এটা আংশিক সাফল্য। শত শহীদের আত্মবলিদান তখনই সার্থক হবে যদি দেখা যায় ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই, দেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা আছে, আইনের শাসন কার‌্যকর আছে, বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আছে।

লেখক: মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন।

(ঢাকাটাইমস/০৫আগস্ট)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
কারাগারে মুজিব পরদেশী
দুই বছরেও মুছে যায়নি ৫ আগস্টের রক্তাক্ত স্মৃতি
ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যকার সংঘর্ষের জন্য দায়ী নাসিরুদ্দিন পাটোয়ারী: আবু হানিফ
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস: রাজধানীতে নাশকতা ঠেকাতে ডিএমপির বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা