ব্যক্তি নয়, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করতে চাই: আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেছেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করাই সরকারের অঙ্গীকার। বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যক্তি সরকারের লক্ষ্য নয়, লক্ষ্য হলো সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি. ক্রিস্টেনসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক আবদুস সালামসহ সংবিধান বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের সহযোগিতায় এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
আইনমন্ত্রী বলেন, সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সরকারের হাতে পর্যাপ্ত প্রমাণ রয়েছে। প্রমাণগুলো এতটাই শক্তিশালী যে বিশ্বের যেকোনো ট্রাইব্যুনালকে ‘যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে’ গিয়ে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্তে আসতে হবে।
ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মৌলিক নীতি হিসেবে ‘যুক্তিসংগত সন্দেহের ঊর্ধ্বে’ অপরাধ প্রমাণের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারও সেই নীতির ভিত্তিতেই পরিচালিত হচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধান নিয়ে সাধারণ মানুষের আগ্রহের কথা উল্লেখ করে আইনমন্ত্রী বলেন, এটি শুধু আইনজ্ঞদের আলোচনার বিষয় নয়; দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের চায়ের দোকানেও সংবিধানের বিভিন্ন বিধান, সংশোধনী, প্রয়োগযোগ্যতা এবং মানুষের অধিকার নিয়ে আলোচনা হয়।
তিনি বলেন, আমাদের সংবিধানও একটি ক্লাসিক বিতর্কের বিষয়- শুধু আইনজ্ঞদের মধ্যে নয়, দেশের চায়ের দোকানেও। গ্রামের চায়ের দোকানে মানুষ সংবিধানের বিভিন্ন ধারা, সাংবিধানিক সংশোধনী, অধিকার ও কর্তব্য নিয়ে আলোচনা করেন। এ ধরনের আলোচনা মানুষের সাংবিধানিক সচেতনতা বাড়ায়। এই ধরনের সংলাপের মাধ্যমে মানুষ তাদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হচ্ছে। এ কারণেই আমরা গর্বিত।
যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের কিছু সাদৃশ্য তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে সুপ্রিম কোর্ট যে এখতিয়ার প্রয়োগ করে, তার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামোর মিল রয়েছে।
তিনি বলেন, আর্টিকেল ১০২-এর অধীনে আমাদের সুপ্রিম কোর্ট একই ধরনের এখতিয়ার প্রয়োগ করছে। তবে কখনও কখনও এই এখতিয়ার অপব্যবহার ও ভুলভাবেও ব্যবহার করা হয়।
সংবিধান প্রণয়নে দার্শনিকদের চিন্তার প্রভাবের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতারা জন লক, থমাস হবস ও মন্টেস্কুর তত্ত্ব নিয়ে কাজ করেছিলেন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নেও এসব রাজনৈতিক দর্শনের প্রভাব রয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান প্রণেতারা ১৭৮৭ সালে যে ভিত্তিগত কাজগুলো করেছিলেন, বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়নের সময় আমাদেরও সেই তাত্ত্বিক ভিত্তির অনেকটাই অনুসরণ করতে হয়েছে।
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সরকারের কিছু নীতিগত অবস্থানেরও প্রশংসা করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের পরিবর্তন হলেও কিছু মৌলিক মূল্যবোধ ও নীতির ধারাবাহিকতা দেখা যায়।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও আটক বন্ধ, সংগঠন ও সমাবেশের স্বাধীনতার মতো বিষয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান বাংলাদেশের মানুষের গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য লড়াইকে উৎসাহিত করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, এসব মূল্যবোধের মাধ্যমে আমাদের মানুষ স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে উৎসাহিত হয়েছে।
দেশের বিগত রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী দাবি করেন, গত ফ্যাসিস্ট শাসনামলে গণতন্ত্র ও আইনের শাসনের জন্য লড়াই করা ৪ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। প্রায় ৭০০ মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
এ ছাড়া বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ৬০ লাখের বেশি মানুষ রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হয়েছেন এবং এসব মানুষের বিরুদ্ধে করা মামলার প্রায় ৯৯ শতাংশই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে করা হয়েছিল বলে জানান আইনমন্ত্রী।
বর্তমান সরকারের সময়ে গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ অবস্থানের কথা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, গত ছয় মাসের বেশি সময়ে এ ধরনের ঘটনা প্রায় শূন্যের পর্যায়ে রয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পুলিশ মিথ্যা মামলা করেছে- এমন কোনো অভিযোগ বর্তমান সময়ে পাওয়া যায়নি।
মানবাধিকার কমিশন আইন প্রসঙ্গে আইনমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশে আরও শক্তিশালী জাতীয় মানবাধিকার কমিশন গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। নতুন আইনে নির্যাতনবিরোধী জাতিসংঘের ঐচ্ছিক প্রটোকল অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অনেক দেশ এ ব্যবস্থা গ্রহণ না করলেও বাংলাদেশ তা করেছে।
মানবাধিকার কমিশনের নির্বাচন কমিটির কাঠামো তুলে ধরে তিনি বলেন, এতে প্রেসক্লাব এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। প্রতিবেশী কিছু দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতিতে উচ্চমানের স্বীকৃতি থাকলেও তাদের নির্বাচন কমিটির নেতৃত্ব প্রধানমন্ত্রীর হাতে; বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিটির নেতৃত্ব স্পিকারের হাতে রাখা হয়েছে এবং বিরোধীদলীয় নেতাকেও এতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, আমরা সাংবিধানিক শাসনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। এই পরিস্থিতিতে সুশাসন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারগুলোর একটি।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও আইনগত পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সরকার এমন একটি সময় পার করছে, যখন অর্থনীতি ও আইনের শাসন উভয় ক্ষেত্রেই নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। একইসঙ্গে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাগুলো নিষ্পত্তির কাজও চলছে।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












