দুই পা হারিয়ে ৮ মাস গর্তে লুকিয়ে, যেভাবে বেঁচে ফিরলেন ইউক্রেনীয় সেনা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৪:৩৯
অ- অ+

ড্রোন হামলায় দুই পা হারিয়েছিলেন ইউক্রেনের সেনাসদস্য কস্তিয়ানতিন ভ্লাসেনকো। ধ্বংসপ্রাপ্ত একটি স্কুলের বয়লারঘরের নিচে ছোট্ট গর্তে কেটেছে তাঁর আট মাসেরও বেশি সময়। চারদিকে শত্রুপক্ষের ড্রোন, উদ্ধারের চেষ্টা মানেই মৃত্যুর ঝুঁকি। একপর্যায়ে বেঁচে ফেরার আশাও ছেড়ে দিয়েছিলেন ৪৯ বছর বয়সী এই সেনা। শেষ পর্যন্ত বিশাল এক মালবাহী ড্রোনে ঝুলিয়ে তাকে উদ্ধার করা হয়। প্রায় ৭০ মিটার উচ্চতায় উড়িয়ে ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে।

গত ৪ অক্টোবর ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনীর এই উদ্ধার অভিযান সম্পন্ন হয়। ইউক্রেনীয় সামরিক কর্মকর্তাদের দাবি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে কোনো সেনাকে এভাবে আকাশপথে ড্রোনের সাহায্যে উদ্ধারের ঘটনা এটিই প্রথম।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইউক্রেনের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় শহর খারকিভের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নিজের বেঁচে ফেরার অভিজ্ঞতা জানিয়েছেন ভ্লাসেনকো। তখন তার দুই পায়ের কাটা অংশ ব্যান্ডেজে মোড়ানো ছিল।

ভ্লাসেনকো বলেন, আমি নিজেকে আগেই মৃত ভেবে নিয়েছিলাম। জানতাম, আর কোনো আশা নেই।

ধ্বংসস্তূপের নিচে আট মাস

ইউক্রেনের ৩০তম মেকানাইজড ব্রিগেডের সদস্য ভ্লাসেনকো গত বছরের মে মাসে খারকিভ অঞ্চলের সম্মুখসারির একটি অবস্থানে দায়িত্ব পালন করতে যান। সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন ‘বাসকি’ সাংকেতিক নামের আরেক সেনাসদস্য।

প্রথমে তারা একটি ছোট মাটির বাংকারে অবস্থান করতেন। প্রতিদিন ড্রোনের মাধ্যমে তাদের কাছে খাবার ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়া হতো। এমনকি ভ্লাসেনকোর জন্মদিনে চকলেট ও দামি সিগারেটও পাঠানো হয়েছিল।

কিন্তু ওই অবস্থান থেকে সেনাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। ভ্লাসেনকোর ভাষ্য অনুযায়ী, তাকে প্রতিস্থাপন করতে যাওয়া দুই সেনা নিহত হন। তাদের মরদেহ উদ্ধারে গিয়ে প্রাণ হারান আরও দুই সেনা।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘তখনই বুঝতে পেরেছিলাম, এটাই সম্ভবত সবকিছু বদলে দেওয়ার মুহূর্ত। এখান থেকে আর কেউ বের হতে পারবে না।’

প্রায় ১০ মাস একসঙ্গে থাকার পর গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে তাদের বাংকারে পানি ঢুকে পড়ে। বাধ্য হয়ে তারা কাছের একটি ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুল ভবনে আশ্রয় নেন।

সেখানে শুকনো কাপড় ও খাবারের একটি প্যাকেট সংগ্রহ করতে বাইরে বের হলে তাদের শনাক্ত করে রাশিয়ার একটি নজরদারি ড্রোন। এরপর আরেকটি রুশ ড্রোন হামলা চালায়। এতে নিহত হন বাসকি। সেদিন ছিল তার ৫০তম জন্মদিন।

বিস্ফোরণে ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের পাতা ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পড়ে গিয়ে গুরুতর আহত হন ডান পায়েও। চলাফেরার ক্ষমতা প্রায় হারিয়ে তিনি স্কুলের পুরোনো বয়লারের নিচে থাকা ছোট্ট একটি গর্তে আশ্রয় নেন। গর্তটির আকার ছিল প্রায় ৮০ বাই ৬০ সেন্টিমিটার।

বাঁচতে নিজেই কাটেন পা

দিন যত গড়াতে থাকে, ভ্লাসেনকোর বাঁ পায়ের ক্ষত তত খারাপ হতে থাকে। ডান পায়ের নিচের অংশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। হাড় বেরিয়ে এসেছিল বাইরে।

একপর্যায়ে বেঁচে থাকার তাগিদে নিজের ছুরি দিয়ে ডান পায়ের পাতাও কেটে ফেলেন তিনি। রক্তপাত বন্ধ করতে ব্যবহার করেন টুর্নিকেট।

ভ্লাসেনকো বলেন, আমাকে পায়ের পাতাটি কেটে ফেলতেই হয়েছিল। সেটি আমার পেছনে টেনে টেনে চলছিল। হাড়ও ক্রমেই আরও বেশি বেরিয়ে আসছিল।’

ধ্বংসপ্রাপ্ত স্কুলের নিচে ওই ছোট্ট গর্তে আট মাসেরও বেশি সময় আটকে ছিলেন ভ্লাসেনকো। ইউক্রেনের সম্মুখসারিতে তার মোট অবস্থানের সময় ছিল ৪৯১ দিন।

এলাকাটি পরিচিত ‘কিল জোন’ নামে। আকাশে অসংখ্য ড্রোনের টহল থাকায় সেখানে সামান্য নড়াচড়াও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। ফলে পিকআপ বা সাঁজোয়া যান দিয়ে আহত সেনাদের সরিয়ে নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছিল।

ভ্লাসেনকোকে উদ্ধারে ইউক্রেনীয় সেনারা মাটিতে চলাচলকারী চালকবিহীন যানও পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তার কাছে পৌঁছানোর জন্য পাঠানো দুটি যানই রুশ ড্রোনের হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়।

উদ্ধার অভিযানের পরিকল্পনার দায়িত্বে থাকা ‘অ্যালেক্স’ সাংকেতিক নামের এক কর্মকর্তা জানান, একপর্যায়ে তাদের মনে হচ্ছিল, ভ্লাসেনকোকে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না।

ছয় প্রপেলারের ড্রোনে উদ্ধার

এমন পরিস্থিতিতে তাদের নজরে আসে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান গুরজুফ ডিফেন্সের তৈরি একটি ভারী মালবাহী ড্রোন। ছয়টি উল্লম্ব রোটরযুক্ত এই ড্রোন সর্বোচ্চ ৯০ কেজি ওজন বহন করে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উড়তে পারে।

দীর্ঘদিন সম্মুখসারিতে থাকার কারণে ভ্লাসেনকোর ওজন কমে আনুমানিক ৭০ কেজিতে নেমে এসেছে বলে ধারণা করেছিলেন কর্মকর্তারা। তাই ড্রোনটির সাহায্যে তাকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরের নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়।

তবে অভিযানটি ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বড় আকারের ড্রোন প্রায়ই রাশিয়ার ছোট এফপিভি ড্রোনের হামলার শিকার হয়। এসব ড্রোনের সাহায্যে চালকেরা দূর থেকে সরাসরি দৃশ্য দেখে আক্রমণ করতে পারেন।

অক্টোবরের শুরুর দিকে ভ্লাসেনকোর কাছে নিয়মিত সরবরাহের প্যাকেটের সঙ্গে পৌঁছায় একটি বিশেষ নিরাপত্তা বেল্ট এবং নির্দেশনামূলক ভিডিওসহ একটি ফোন। তখন তিনি বুঝতে পারেন, তাকে উদ্ধারের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

৪ অক্টোবর তার কাছে পৌঁছায় বিশাল ছয় প্রপেলারের ড্রোনটি। ভ্লাসেনকো একটি ক্যারাবিনারের সাহায্যে ড্রোনের উইঞ্চে ঝোলানো নিরাপত্তা বেল্টের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেন। এরপর ড্রোনটি তাকে প্রায় ৭০ মিটার বা ২৩০ ফুট উচ্চতায় তুলে নেয়।

উদ্ধার অভিযানে মূল ড্রোনটির সঙ্গে ছিল আরও তিনটি ছোট ছয় প্রপেলারের ড্রোন। এগুলোর কাজ ছিল রুশ আক্রমণকারী ড্রোনগুলোকে বিভ্রান্ত করা।

এ ছাড়া চারটি ইউক্রেনীয় এফপিভি ড্রোন দল, কামান এবং বড় স্থির-পাখার ড্রোন ব্যবহার করে রুশ ড্রোনের পরিচিত অবস্থানগুলোতে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে হামলা চালানো হয়। উদ্ধার অভিযানের পথ নিরাপদ রাখাই ছিল এর উদ্দেশ্য।

সব ঝুঁকি পেরিয়ে প্রায় ১৫ মিনিটের উড়ান শেষে ভ্লাসেনকোকে বহনকারী ড্রোনটি নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছায়। নিরাপত্তার কারণে সেই স্থানের সুনির্দিষ্ট অবস্থান প্রকাশ করেনি ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনী।

আকাশে ঝুলেও ছিল পানিতে পড়ার ভয়

দীর্ঘদিন মৃত্যুর অপেক্ষায় থাকা ভ্লাসেনকোর জন্য উদ্ধার অভিযানটি ছিল জীবনে ফিরে আসার মতো ঘটনা। যে মানুষটি একসময় বেঁচে থাকার আশা ছেড়ে দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত ড্রোনের সাহায্যে তিনি নিরাপদ স্থানে পৌঁছান।

তবে আকাশে ঝুলে ওড়ার সময়ও ভয় পিছু ছাড়েনি তার। সবচেয়ে বড় আতঙ্ক ছিল পানিতে পড়ে যাওয়া।

ভ্লাসেনকো বলেন, ‘আমি ভয় পাচ্ছিলাম না যে কোথাও বনের মধ্যে পড়ে যাব। কিন্তু পানিতে পড়ে যাওয়ার ভয় ছিল, কারণ আমি সাঁতার জানি না।’

রয়টার্স জানিয়েছে, ভ্লাসেনকোর অভিজ্ঞতার বিবরণ ইউক্রেনীয় সামরিক বাহিনীর তথ্য এবং উদ্ধারকারী ড্রোনে থাকা ক্যামেরার ভিডিওর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে তার বর্ণনার সব বিষয় স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমটি।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যাওয়ার পথে নেতানিয়াহুর গাড়িবহরে বোতল নিক্ষেপ
রাজধানীতে ২৪ ঘণ্টায় ৪৭৭ আসামি গ্রেপ্তার, সবচেয়ে বেশি মিরপুরে
ইউরোপের তিন দেশ থেকে ফেরত পাঠানো হলো ৩৫ বাংলাদেশিকে
ঢাকা-কক্সবাজার রুটে চলবে মহানগর এক্সপ্রেস, উদ্বোধন ২৬ অক্টোবর