কালো টাকা এবং আন্তর্জাতিক ও দেশি প্রভাব

অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী
 | প্রকাশিত : ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, ১২:১৪

দেশে দেশে কালো টাকা একটি বহুল সমস্যা বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। Monetary Transmission mechanism অনুসারে অর্থ প্রবাহ এক স্থানে সংরক্ষিত না থেকে বরং বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ে। আর এ অর্থ প্রবাহ দুটো ধারার মাধ্যমে হয়ে থাকে: প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো অন্যটি অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। এই অপ্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যে যে লেনদেন হয় সেটিকে বলা হচ্ছে কালো টাকা। লেখক কাওসার রহমান নিরীক্ষাধর্মী কাজ করেছেন “কালো টাকার সন্ধানে” গ্রন্থে।

অবশ্য বাংলার কালো টাকা বলা হলেও ইংরেজিতে কিন্তু Black Economy Underground Economy, Dinty Money বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়। সাধারণত: একটি দেশের এক তৃতীয়াংশ থাকে কালো টাকা। কিন্তু বাংলাদেশ কালো টাকার পরিমাণ কত এ নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কিছু কাজ হলেও কাওসার রহমান প্রথমবারের মত কালো টাকার উপর একটি বিস্তৃত কাজ করেছেন।

কাওসার রহমান তার গ্রন্থে মোট আটটি অধ্যায়ে আলোচনা করেছেন। এগুলো হচ্ছে: গুপ্তধনের খোঁজে, কালো টাকা কালো নয়, টাকা পাচারের হাল-হকিকত, ইনভয়েস কারসাজিতে কালো টাকা, পাচার করা টাকায় সেকেন্ড হোম, হুন্ডির নতুন মাধ্যম মোবাইল ব্যাংকিং, কালো টাকা নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক আমরা ও ব্যবসায়ী চক্র, কালো টাকার ভয় ক্ষমতাসীনদের।

প্রতিটি অধ্যায়ে ফুটে উঠেছে দেশের প্রতি মমত্ববোধ। Capital Fight না হলে দেশের কি উন্নয়ন হতো তার একটি প্রাঞ্জল আলোচনা। আজকাল পাঠকেরা বলে থাকেন, অনেক অর্থনীতিবিদ সহজ জিনিসকে এমন কঠিন করে উপস্থাপন করেন গাণিতিক মডেল দেন যাতে অর্থনীতি যে মানুষের উন্নয়নের জন্য, এ কথাটি বারবার বাধাগ্রস্ত হয়ে থাকে। এ কারণেই কাওসার রহমানের গ্রন্থটি সাধারণ পাঠকের কাজে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

“গুপ্তধনের খোঁজে” অধ্যায়ে লেখক শুরু করেছেন ১৭৫০ সালের আগস্ট মাস থেকে। পৃ: ১৬ তে লেখক OECD সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন তা যথাযথ। কালো টাকার বিরাট অংশ Foreign Loan, aid এবং Donation এর অংশ হিসেবে সাদা অর্থ দেশ থেকে পাচার হয়ে যায়। আর এটি করে উন্নত বিশ্ব বা নামী-দামী বিজনেস পার্টনাররা। এক্ষেত্রে OECD কি কখনো তাদের উন্নত দেশসমূহের সত্যিকার চিত্র তুলে ধরবেন? কালো টাকা কালো নয়” অধ্যায়টি সম্পূর্ণরূপে পাঠকের চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এ বক্তব্যটি এ কারণে করছি যে পাঠকদের মনে একটি ধারণা থাকতে পারে টাকা আবার কালো হয় কি না। লেখক সে দৃষ্টিতে বিশদ ব্যাখ্যা দিয়েছেন। পৃ: ২৩ এ তিনি কিছু পদক্ষেপ নেয়ার কথা বলছেন। অবশ্য এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন করা কঠিন বৈকি।

“টাকা পাচারের হাল-হকিকত” অধ্যায়টিতে তিনি বেশ কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনসমূহকে একত্রিত করে দর্শক নন্দিতভাবে তা তুলে ধরেছেন। তিনি পৃ: ৩৫ এ যে ধারণা পোষণ করেছেন, “তবে বাংলাদেশ ব্যাংক, কাস্টমস, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সঙ্গে কাজ করলে বা সতর্ক থাকলেই পাচার রোধ করা সম্ভব” এটি অবশ্য প্রশ্ন সাপেক্ষ? কেননা উন্নয়নশীল দেশ হোক, মধ্যম আয়ের দেশ হোক আর উন্নত বিশ্ব হোক Global Framework of Monetary Transmission এ যত তথ্য কথাই বলা হোক না কেন টাকা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পাচার হবে।

‘ইনভয়েস কারসাজিতে কালো টাকা’ প্রবন্ধে লেখক অবশ্য দেশ থেকে কিভাবে অর্থ পাচার হচ্ছে সেটির চালচিত্র তুলে ধরেছেন। আসলে Business Ethics এর সেই পুরনো প্রশ্নটি এসে যায় নৈতিকতার মানদ- ব্যবসায়ী, শুল্ক কর্তৃপক্ষ, ব্যাংকার, আমলা করে থাকেন। আর শুল্ক কর্তৃপক্ষের বৈধ জিনিসকে যে কি কষ্ট দেন তা কেবলমাত্র ভুক্তভোগী জানেন।

একটি বাস্তব ঘটনা বলি। বর্তমান সরকারের আমলে সামাজিক অর্থনীতির বিকাশ: সরকারি সংস্থা বিএনএফের মাধ্যমে ঘটেছে বলে ১০৬ পৃষ্ঠার একটি বই ভারত থেকে প্রকাশিত হয়েছে। বইটি যখন ভারত থেকে ১০ কপি পাঠানো হলো DTDC কুরিয়ারের মাধ্যমে বাংলাদেশ বিমানের শুল্ক কর্মকর্তা ২৫০৬/- টাকা আদায় করেছেন। সৌজন্য সংখ্যা পাশাপাশি এর জন্যে কোন অর্থ প্রাপ্তিও হবে না অথচ বর্তমান সরকার প্রশংসা করা এবং সরকারি সংস্থার প্রশংসা করা কি অপরাধ? এ ধরনের শুল্ক আইনের সাথে যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেয়া দরকার। নচেৎ আমি এখন যেমন ১৯০ কপি বই কিভাবে আনব তা বুঝতে পারছিনা তেমনি হয়তো যারা ব্যবসায়ী বিকল্প ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হবে। অথচ আইন মান্যকারী নাগরিকের জন্যে আইনের বিধান সহজ করা উচিত।

“পাচার করা টাকায় সেকেন্ড হোম’ প্রবন্ধটি অত্যন্ত সুগঠিত। আসরে অবৈধভাবে টাকা পাচার করে অনেকেই মালয়েশিয়া, দুবাইতে সেকেন্ড হোম কিনছে। এমনকি কানাডাতেও প্রবাসী হচ্ছে। এদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা মহল একটু তৎপর হওয়া উচিত। নচেৎ অর্থ পাচার বন্ধ হবে না।

‘হুন্ডির নতুন মাধ্যম মোবাইল ব্যাংকিং” প্রবন্ধটিও বেশ বাস্তবসম্মত। লেখক এতে ফুটিয়ে তুলেছেন বাস্তব অবস্থা। আশা ছিল বর্তমান গভর্নরের আমলে বিকাশসহ যে সমস্ত ব্যাংক এ ধরনের এজেন্ট ব্যাংকিং করছে তাকে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনবেন সে আশা নিরাশায় পরিণত হয়েছে। তারপরও ২৪ জানুয়ারি যে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে সেখানে যাতে মোবাইল ব্যাংকিং সম্পর্কে এবং এ সমস্ত এজেন্ট ব্যাংকিং সম্পর্কে সুষ্পষ্ট নীতিমালা থাকে সে ব্যাপারে একজন ফিন্যান্সিয়াল ইকোনমিস্ট হিসেবে জোর দাবি জানাচ্ছি। মোবাইল ব্যাংকিং এর ক্ষেত্রে উচ্চ হার মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে হাজার টাকায় ২০ টাকা চার্জ নেয়া হয়। অন্যদিকে ভারতে দশ হাজার টাকায় নেয় ভারতীয় ৩.৫০ রুটি। কালো টাকা নিয়ন্ত্রণে রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ী চক্র” প্রবন্ধটিও সুলিখিত।

“কালো টাকার ভয় ক্ষমতাসীনদের” প্রবন্ধে লেখক প্রাঞ্জল ভাষায় কালো টাকার ক্ষতিকর প্রভাব তুলে ধরেছেন। আসলে বিরোধী দলে থাকলে কালো টাকা পাচার করা সহজ, ভাবখানা এমন আমরা, আমরাই তো। বিভিন্ন পয়েন্টে তাদের মধ্যে যোগসূত্র ঘটায়। আর স্থানীয় থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে কালো টাকার অপব্যবহার ঘটে। নারী-শিশু এবং অস্ত্র মাদক নিয়ন্ত্রণ করে থাকে কালো টাকার অপব্যবহারকারীরা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিবেদন জানাব, তিনি যে ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশান করতে চাচ্ছিলেন তার বাস্তবতা প্রসারিত করতে হলে বাংলাদেশ “কমিউনিটি ব্যাংকিং” ব্যবস্থা চালু করার জন্য। আর এ কমিউনিটি ব্যাংকিং হলে গ্রামীণ এলাকা থেকে অর্থ শহর এলাকা হয়ে রাজধানী হয়ে বিশ্ব কেন্দ্রে পাচার হয়ে যাবে। অ্যামানুয়েলের ভাষায় Uneguel Exchange. আর তাই বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি কমিউনিটি ব্যাংকিং চালুর সুস্পষ্ট ব্যবস্থা নেয়ার। কালো টাকা রোধ করা সম্ভব না হলেও মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

অধ্যাপক ড. মুহম্মদ মাহবুব আলী

ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিস্ট (পোস্ট ডক্টরেট ফেলো)

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত