সরকারের কাছে জনগণ আসলে কী চায়

“মানুষ শান্তি চায়, মব আর সন্ত্রাসের রাজত্ব এখন শেষ। ষড়যন্ত্র, শত্রুতামূলক মামলার হয়রানি থেকে বাঁচতে চায়, মানুষ আইনের শাসন চায়, মানুষ জীবন, ঘরবাড়ি ও মালের নিরাপত্তা চায়, রাস্তায় স্বাভাবিক চলাচলের গ্যারান্টি চায়, ঘরে ঘুমানোর নিশ্চয়তা চায়। এই তো গণতান্ত্রিক, নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের চাওয়া।”
এই কথাগুলো কেবল আবেগের বহিঃপ্রকাশ নয়; বরং রাষ্ট্র ও নাগরিকের সম্পর্কের মৌলিক ভিত্তির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল দর্শনই হলো- রাষ্ট্র জনগণের সেবক, জনগণই ক্ষমতার উৎস। নাগরিকের জীবন, সম্পদ, সম্মান ও স্বাধীনতা রক্ষা করা রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব। তাই শান্তি, নিরাপত্তা ও আইনের শাসনের দাবি কোনো বিলাসিতা নয়; এটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার।
সভ্যতার ইতিহাসে আমরা দেখি, মানুষ যখনই সংঘাত, সহিংসতা ও অরাজকতার মধ্যে পড়েছে, তখনই শান্তির জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। শান্তি কেবল যুদ্ধ না থাকার নাম নয়; শান্তি মানে ভয়হীন জীবন, স্বাভাবিক কাজকর্মের পরিবেশ, সামাজিক আস্থার পুনর্গঠন। মব বা উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিচার- যা আইনের তোয়াক্কা না করে তাৎক্ষণিক ‘শাস্তি’ দিতে চায়- তা কখনোই ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করতে পারে না। বরং এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট করে এবং রাষ্ট্রের কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
যখন মানুষ দেখে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া হচ্ছে, তখন তারা অনিরাপত্তায় ভোগে। কারণ আজ যে অন্যের ওপর ‘মব জাস্টিস’ চলছে, কাল সেটি তার ওপরও নেমে আসতে পারে। তাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা মানে কেবল অপরাধ দমন নয়; বরং সামাজিক আস্থার পুনর্নির্মাণ।
সন্ত্রাস তা রাজনৈতিক হোক, সামাজিক হোক কিংবা সংগঠিত অপরাধের রূপে হোক, সমাজকে ভেতর থেকে ক্ষয় করে। সন্ত্রাসের সংস্কৃতি মানুষের সৃজনশীলতা নষ্ট করে, বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করে, শিক্ষাঙ্গনকে অস্থির করে তোলে। একটি পরিবার যখন সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত থাকে, তখন সেই পরিবার উন্নয়ন, সংস্কৃতি বা মানবিক বিকাশের দিকে মনোযোগ দিতে পারে না। ভয়মুক্ত পরিবেশ ছাড়া কোনো অর্থনৈতিক বা সামাজিক অগ্রগতি টেকসই হতে পারে না। শিল্পোদ্যোগী বিনিয়োগ করবেন তখনই, যখন তিনি নিশ্চিত হবেন তার কারখানা নিরাপদ। কৃষক মাঠে যাবেন তখনই, যখন জানবেন তার ফসল লুট হবে না। শিক্ষার্থী ক্লাসে মনোযোগ দেবে তখনই, যখন ক্যাম্পাসে সন্ত্রাসের আশঙ্কা থাকবে না। তাই শান্তি ও নিরাপত্তা কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এটি উন্নয়নের পূর্বশর্ত।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মতভেদ থাকবে, বিরোধিতা থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যদি রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে মামলা ব্যবহার করা হয়, তাহলে বিচারব্যবস্থা তার মর্যাদা হারায়। হয়রানিমূলক মামলা নাগরিকের মৌলিক অধিকারকে ক্ষুন্ন করে এবং বিচারপ্রার্থীর ওপর অযথা মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। যখন মানুষ মনে করে মামলা মানেই হয়রানি, তখন তারা আইনের আশ্রয় নিতে ভয় পায়। ফলে প্রকৃত অপরাধী পার পেয়ে যায় এবং নিরপরাধ ব্যক্তি বিপাকে পড়ে।
একটি কার্যকর গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, স্বচ্ছ বিচারপ্রক্রিয়া এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত আইন প্রয়োগ। আইনের শাসন মানে আইন সবার জন্য সমান- ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিকের জন্য একই মানদণ্ড।
মানুষের সবচেয়ে মৌলিক চাহিদা- নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা। একটি পরিবার যখন রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে না, তখন সেই সমাজে উন্নয়নের কোনো পরিমাপই অর্থবহ থাকে না। ঘরবাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া, জমি দখল, চাঁদাবাজি, লুটপাট- এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; এগুলো রাষ্ট্রের নৈতিক ব্যর্থতার ইঙ্গিত দেয়। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত- প্রতিটি নাগরিককে নিরাপদ রাখা। পুলিশ, প্রশাসন ও বিচারব্যবস্থা- এই তিন স্তম্ভের কার্যকর সমন্বয় ছাড়া তা সম্ভব নয়। পাশাপাশি নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমেরও ভূমিকা রয়েছে- অন্যায় তুলে ধরা, জনমত গঠন এবং স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা।
স্বাভাবিক চলাচলের অধিকার একটি মৌলিক নাগরিক অধিকার। রাস্তাঘাট অবরোধ, যানবাহন ভাঙচুর, হঠাৎ সহিংসতা- এসব মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করে। কর্মজীবী মানুষ সময়মতো কর্মস্থলে পৌঁছাতে পারে না, শিক্ষার্থী পরীক্ষা মিস করে, রোগী হাসপাতালে পৌঁছাতে বিলম্ব হয়। এতে অর্থনীতি ও মানবিকতার উভয় ক্ষেত্রেই ক্ষতি হয়। গণতন্ত্রে প্রতিবাদের অধিকার রয়েছে, কিন্তু তা যেন অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন না করে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে, আবার জনজীবনও স্বাভাবিক থাকবে।
রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারা মানে কেবল শারীরিক নিরাপত্তা নয়; এটি মানসিক প্রশান্তির প্রতীক। নাগরিক যখন জানে যে তার দরজায় অযথা কড়া নাড়বে না কেউ, মিথ্যা অভিযোগে তুলে নিয়ে যাবে না, কিংবা দুষ্কৃতকারী হামলা করবে না- তখনই সে প্রকৃত স্বাধীনতা অনুভব করে। এই নিশ্চয়তা দিতে না পারলে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সাফল্য প্রশ্নবিদ্ধ হয়। কারণ গণতন্ত্রের মূল কথা হলো মানুষের মর্যাদা রক্ষা। ভয় ও অনিশ্চয়তার মধ্যে সেই মর্যাদা টিকে থাকতে পারে না।
গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়। সেই কারণে তার প্রথম দায় জনগণের প্রতি। উন্নয়ন প্রকল্প, অবকাঠামো নির্মাণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি- এসব গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু যদি নাগরিক নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত না হয়, তাহলে উন্নয়নের সুফল টেকসই হয় না।
সরকারের উচিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, মব বা গোষ্ঠীগত সহিংসতার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া, হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার ও তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকার রক্ষায় দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ।
শান্তি ও নিরাপত্তা কেবল প্রশাসনিক উদ্যোগে আসে না; এটি সামাজিক চুক্তির ফল। নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা থাকতে হয়। যখন মানুষ দেখে অপরাধীর বিচার হচ্ছে, নিরপরাধ রক্ষা পাচ্ছে, আইন সবার জন্য সমান- তখনই আস্থা জন্মায়। এই আস্থা ভেঙে গেলে সমাজে সন্দেহ, গুজব ও বিভাজন বাড়ে। ফলে মব সংস্কৃতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তাই ন্যায়বিচারের দ্রুত ও দৃশ্যমান প্রয়োগ জরুরি।
গণমাধ্যমের দায়িত্বও অনস্বীকার্য। তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং মতামত প্রকাশ- এসবের মাধ্যমে গণমাধ্যম সমাজকে সচেতন করে। নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে রাষ্ট্রকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে পারে। তবে সমালোচনা যেন গঠনমূলক হয় এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ ভুয়া খবর বা উসকানিমূলক প্রচার সহিংসতা উসকে দিতে পারে।
গণতন্ত্রে মতভেদ স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি যদি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়, তাহলে সহিংসতা ও মামলাবাজি বেড়ে যায়। সহনশীলতা, সংলাপ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা- এই মূল্যবোধগুলো চর্চা করতে হবে। বিরোধী মতকে দমন নয়, বরং যুক্তি দিয়ে মোকাবিলা করা গণতন্ত্রের শক্তি। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভাষা ও আচরণও গুরুত্বপূর্ণ। উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতি উত্তপ্ত করতে পারে, আবার সংযত ও দায়িত্বশীল ভাষা সমাজে স্থিতিশীলতা আনতে পারে।
শান্তি, আইনের শাসন, নিরাপত্তা, হয়রানিমুক্ত জীবন—এসব কোনো অতিরঞ্জিত দাবি নয়। এগুলো একটি সভ্য, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম শর্ত। মানুষ চায় না অরাজকতা; মানুষ চায় স্থিতি। মানুষ চায় না ভয়; মানুষ চায় নিশ্চয়তা। মানুষ চায় না প্রতিহিংসা; মানুষ চায় ন্যায়। গণতান্ত্রিক সরকারের সাফল্য পরিমাপের সবচেয়ে বড় মানদণ্ড হলো—নাগরিক কতটা নিরাপদ, কতটা মর্যাদাবান এবং কতটা স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারছে। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের জীবনে নিরাপত্তা ও স্বস্তি বয়ে আনে।
আজকের এই আহ্বান আসলে রাষ্ট্রের প্রতি স্মারক- ক্ষমতার উৎস জনগণ; আর সেই জনগণের প্রথম চাওয়া শান্তি ও নিরাপত্তা। নির্বাচিত সরকারের কাছে মানুষের প্রত্যাশা স্পষ্ট: আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সহিংসতার অবসান, হয়রানি বন্ধ, নাগরিকের ভয়মুক্ত জীবন। তাহলেই গণতন্ত্রের ভিত্তি সুদৃঢ় হবে, রাষ্ট্র হবে মানুষের আস্থার ঠিকানা।
লেখক: সংবাদকর্মী।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































