এত টাকা দিয়ে আমি কি করবো?

রাজীব নূর খান
| আপডেট : ০২ মে ২০১৭, ১১:২০ | প্রকাশিত : ০২ মে ২০১৭, ০৯:৫০

ঘটনা হলো অফিসের কাজে বের হয়েছি। মগবাজার থেকে সিএনজিতে উঠেছি উত্তরা যাব। অন্যদিনের তুলনায় আজ রাস্তা মোটামুটি ফাঁকা। ভয়াবহ গরম পড়েছে। ঘামে শার্ট পুরোপুরি ভিজে গেছে। পকেট থেকে মোবাইল বের করে ফেসবুক চালাচ্ছি। হঠাৎ দেখি আমার পাশে একটা বড় ব্যাগ। প্রথমেই মনে হলো ব্যাগের মধ্যে বোমা। আবার মাথার মধ্যে কে যেন বলল, ব্যাগ ভর্তি টাকা। টাকা? সাথে সাথে ব্যাগ খুলে দেখি টাকা। কম করে হলেও এক শ টা বান্ডিল। সব এক হাজার টাকার নোটের বান্ডিল। মাথা পুরাই নষ্ট। আমার হাত পা কাঁপছে, আনন্দে অথবা ভয়ে।

এখন আমি কি করবো? মাথা কাজ করছে না। টাকাগুলো থানায় জমা দিয়ে দিব? নাকি টাকা গুলো নিয়ে বাসায় চলে যাবো? অথবা যার টাকা তাকে খুঁজে বের করে তার কাছে দিয়ে দিব? অথবা যেহেতু অফিসের কাজে বের হয়ে টাকা গুলো পেয়েছি- কাজেই টাকাগুলো অফিসে জমা দিয়ে দেওয়া যেতে পারে।

আমি একটা অ্যাড এজেন্সিতে চাকরি করি। নাম 'টাইটান অ্যাড এজেন্সি'। ইলেকট্রনিক্স ও প্রিন্ট মিডিয়ায় আমাদের সংগ্রহ করা বিজ্ঞাপনগুলো যায়। অফিসে আমার পদ এক্সজিকিউটিভ। বড় বড় প্রতিষ্ঠানে গিয়ে তাদেরকে অনেক তেল মালিশ করে বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করি। কি যে কষ্টের কাজ তা বলার ভাষা আমার নেই। অল্প কিছু টাকা বেতন পাই। বউ বাচ্চা নিয়ে সেই টাকা দিয়ে সারা মাস চলতে খুব কষ্ট হয়ে যায়। মাসের শেষে পরিচিত লোকজনের কাছে হাত পাততে হয়।

মহাখালী'তে লম্বা জ্যাম। সিএনজি দাঁড়িয়ে আছে। সিএনজি ড্রাইভার একটু পরপর লুকিং গ্লাসে তাকিয়ে আমাকে দেখছে। ব্যাটা কি কিছু বুঝতে পেরেছে নাকি? নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি ড্রাইভারের সাথে আলাপ শুরু করলাম- দেখেছো- আজ কি গরম পরেছে? ব্যাটা কোনো জবাব দিল না। মনে মনে বললাম, বদের বাচ্চা বদ। জ্যাম ছেড়েছে সিএনজি চলতে শুরু করেছে। আমি শক্ত করে টাকার ব্যাগটা ধরে রেখেছি। হঠাত করে খুব ঘুম পাচ্ছে। এমন ঘুম পাচ্ছে আমি চোখ মেলে তাকাতে পারছি না। ঘুমিয়ে পড়লাম এবং ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম। এমিরেটস এয়ারলাইন্সের বিমানের টিকিট কেটে সিঙ্গাপুর যাচ্ছি বউ বাচ্চা নিয়ে। সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর নেমে হঠাৎ আমার ইচ্ছা হলো- না, সিঙ্গাপুর যাবো না। যাবো ইন্দোনেশিয়া। বালি দ্বীপে যাবো। গত মাসে আমার বন্ধু রবিন তার বউ বাচ্চা নিয়ে গিয়েছে।

ঠিক এই সময় বিকট শব্দে সিএনজি থামল। তাকিয়ে দেখি পুলিশ সার্জন। আমি খুব ভয় পেলাম কিন্তু বিরক্তির ভাব নিয়ে সার্জনের দিকে তাকালাম। সার্জন আমার দিকে তাকিয়ে করুন গলায় বলল- স্যরি স্যার আপনাকে বিরক্ত করলাম। সিএনজি'র কাগজ পত্র ঠিক নেই। তাই থামিয়েছি। আমার সার্জনের জন্য খুব মায়া লাগল। বেচারা'রা সারাদিন রোদ বৃষ্টির মধ্যে ডিউটি করে। ইচ্ছা হলো এক হাজার টাকার নোটের বান্ডিল একটা দিয়ে দেই। বউ বাচ্চা নিয়ে মালয়েশিয়া থেকে ঘুরে আসুক। কয় টাকা আর তারা বেতন পায়?

বনানী এসে সিএনজি ড্রাইভারকে ধমক দিয়ে বললাম- কচু চালাও। রাখো, আমি আর তোমার গাড়িতে যাবো না। মিটারে ভাড়া উঠেছে- এক শ' নব্বই টাকা। কিন্তু আমি ম্যানিব্যাগ থেকে পাঁচ শ' টাকার একটা নোট বের করে দিলাম আর বললাম পুরোটা রেখে দাও। সিএনজিওয়ালা আমাকে একটা স্যালুট দিল একেবারে পুলিশের মতন করে। এই ব্যাটা মনে হয় আগে পুলিশে ছিল। সিএনজিওয়ালাকে ধমক দিয়ে মনটা খারাপ হয়েছে, ব্যাটাকে বিনা কারণে ধমক দিয়েছি। আচ্ছা, সিএনজিওয়ালাকে একটা নতুন সিএনজি কিনে দিলে কেমন হয়?

দুপুর দুইটা। খুব ক্ষুধা পেয়েছে। অন্য সময় রাস্তার পাশের চায়ের দোকান থেকে চা বিস্কুট অথবা রুটি কলা কিনে খাই। আজ আমি লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক। এই টাকা আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। আল্লাহর ইশারা ছাড়া তো কিছুই হয় না। শুনেছি বনানীতে সেরিনা হোটেল টা খুব ভালো করেছে। তাদের খাবার নাকি খুব মজা। দুপুরে সেখানেই খেলাম। খাবার মেন্যু আহামরি কিছু না- স্পাইসি বিফ চিলি ফ্রাই, মাটন কারি উইথ পটেটো, ভেজিটেবল এগ ফ্রাইড রাইস আরও কি কি যেন ছিল- নাম জানি না। খাবার খেয়ে কোনো স্বাদ পেলাম না। বিল মাত্র তেইশ শ' টাকা। ম্যানিব্যাগ থেকেই দিলাম। এখনও আরও কিছু টাকা অবশিষ্ট আছে। সারা মাসের খরচের টাকা।

বাইরে এসে একটা বেনসন সিগারেট ধরিয়ে ভাবছি, চাকরিটা ছেড়ে দিব। এত কষ্ট আর ভালো লাগে না। চাকরি করছি, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পরিশ্রেম করি, তবুও সংসারে অভাব। মাস শেষে টানাটানি। টাইটান এজেন্সিকে বিদায় জানালাম মনে মনে। আর যাবো না অফিসে। রিজাইন লেটার মেইল করে পাঠিয়ে দিব এইচআর'কে। এমডি মোকবুল হোসেন আমাকে বেশ কয়েকদিন খুব অপমান করেছে। হারামজাদা ছোটলোক। আমি নিজে একটা কোম্পানি দেব, সেখানে একদিন মুকবুল হোসেনকে দাওয়াত দিব। মানূষের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় তাকে শিখিয়ে দিব।

এখন কি করবো? কই যাবো? কিছুই বুঝতে পারছি না। শপিং করলে কেমন হয়? যমুনা পিউচার পার্ক অথবা বসুন্ধরায় যাওয়া যেতে পারে। বাচ্চাটার জন্য বেশ কিছু খেলনা কিনলাম। কয়েক সেট জামা কিনলাম। টাইটান অফিসের 'সিইও' এর ছোট মেয়ে লীনা সেদিন অফিসে এসেছিল। সুন্দর একটা ফ্রক পরেছিল। নীল রঙ্গের একটা ফ্রক। ছোট ছোট সাদা ফুল আঁকা। সেদিনই মনে মনে ভেবেছিলাম- আমার মেয়ের জন্য এই রকম একটা ফ্রক কিনব। কিনতেও গিয়েছিলাম। দাম শুনে আমার মাথা ঘুরে উঠেছে। আজ কোনো সমস্যা নাই। এখন, এই রকম ফ্রক চারটা কিনলেও সমস্যা নাই। বউ এর জন্যও শাড়ি কিনতে হবে। একদিন বেইলিরোড দিয়ে বাসায় ফেরার পথে একটা দোকানে পুতুলের গায়ে পড়া শাড়ি দেখিয়ে বউ বলেছিল- তোমার যখন অনেক টাকা হবে, সেদিন আমাকে এই রকম একটা শাড়ি কিনে দিও। আজ এক ডজন শাড়ি কিনব। এত গুলো শাড়ি দেখে নীলা কি প্রচন্ড অবাকই না হবে! আমি মনে মনে নীলার অবাক মুখখানা দেখে নিলাম। শুধু বউ বাচ্চার জন্য কিনলে হবে না। বাড়িতে বাবা মাকেও টাকা পাঠাতে হবে। আমাদের জমিজমা বলতে কিছু নেই। শুধু বসতভিটা টাই সম্বল। সেটাও চেয়ারম্যানের কাছে বন্ধক আছে। মাত্র পঞ্চাশ হাজার টাকা। গত বছর মা খুব অসুস্থ হয়ে পড়ল। মাকে ঢাকা এনে চিকিৎসা করাতে হলো। হাতে টাকা ছিল না। শেষ সম্বলটা বন্ধক রেখে মার চিকিৎসা করালাম। দুই একদিনের মধ্যেই চেয়ারম্যানের ঝামেটা শেষ করবো।

মোবাইল বাজছে। অফিস থেকে ফোন আসছে। 'সিএফও' বোরহান সাহেব ফোন দিয়েছেন। এই লোক ফোন করলেই আমার রাগ লাগে। কথা বলে না, যেন ইট উড়িয়ে মারে। বোরহান সাহেব চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, কোথায় আপনি? আমি বললাম, তুই কোথায় শালা? অফিসে এসি রুমের মধ্যে বসে আসিছ? চিনিস আমাকে? থাপ্পড় দিয়ে তোর দাঁত ফেলে দিব। বদের বদ। তুই একটা বিরাট বদ। বদের বাচ্চা। এতদিন অনেক সহ্য করেছি, আর না। 'সিএফও' বোরহান সাহেব মনে হয় বোবা হয়ে গেছেন। গৎ জাতীয় একটা শব্দ শুনতে পেলাম। ইচ্ছা করছে ফোন দিয়ে কয়েকটা গালি শুনিয়ে দেই। এমন গালি দেব- যে ব্যাটার কান দিয়ে রক্ত পড়বে। গত একটা বছর অনেক জ্বালিয়েছে। পেইন দিয়ে-দিয়ে কলিজাটা ভাজা ভাজা করে দিয়েছে। আমি কাউকে কোনোদিন লাথি দেইনি তার মানে এই না যে, আমি লাথি দিতে জানি না।

বিকাল চারটা বাজে। শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। মনে হয় প্রেসার লো হয়ে গেছে। বাসায় চলে যাই। বাসায় গেলে বউ মাথায় হাত বুলিয়ে দেবে। লেবু দিয়ে সরবত বানিয়ে দিবে। সবচেয়ে বড় কথা মেয়েটা আমার কোলে এসে বসে থাকবে। তাকে কিছুইতেই কোল থেকে নামানো যাবে না। ঘুমের মধ্যেও মেয়েটা আমার গলা জড়িয়ে ধরে ঘুমাবে। বাপ সোহাগি মেয়ে।

সন্ধ্যায় বাসায় ফিরলাম। আমার বাসা ছয় তলা। সিড়ি গুলো খুব উঁচু উঁচু। উঠতে খুব কষ্ট হয়। কয়েক দিনের মধ্যে এমন একটা ফ্ল্যাট কিনব যে লিফট থাকবে। এবং ব্যালকনিটা অনেক বড় থাকবে। সেখান থেকে অনেকখানি আকাশ দেখা যাবে।

ঘরে ঢুকতেই মেয়েটা আমাকে বাবা-বাবা বলে জড়িয়ে ধরলো। বউ বলল- তোমার হাতে ব্যাগ কিসের? ব্যাগে কি? আমি বললাম, টাকা। ব্যাগ ভরতি টাকা। কিসের টাকা? এত টাকা তুমি কোথায় পেলে? বউ এর কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে পারলাম না। চোরের মতো মুখ করে বসে থাকলাম। বউ এবার কঠিন চিৎকার দিলো। আমি বললাম, রাস্তায় পেয়েছি। বউ বলল- এক্ষন এই টাকা তুমি ফেলে দিবে অথবা থানায় জমা দিয়ে আসবে। কি মনে করে এই টাকা তুমি ঘরে বয়ে আনলে? ছিঃ। আমি বললাম, এই টাকা দিয়ে আমাদের অভাব দূর হবে। আমরা সুখে শান্তিতে আরাম আয়েশ করে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারব। বউ বলল, আর কোনো কথা না। তুমি যাও।

আমি রমনা থানায় টাকা জমা দিয়ে রাত ১১ টায় বাসায় ফিরে, আলু ভর্তা আর ডিম ভাজি দিয়ে ভাত খেতে বসলাম। বাইরে ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে। একটু পর-পর বাজ পড়ছে।

সংবাদটি শেয়ার করুন

সাহিত্য বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত