দুই যুগ পর খনন হচ্ছে নেত্রকোণার রোয়াইলবাড়ি দুর্গ

নেত্রকোণা প্রতিনিধি, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৪ জুন ২০১৭, ১৮:০৮ | প্রকাশিত : ০৪ জুন ২০১৭, ১৭:৫৬

নেত্রকোণার ঐতিহাসিক নিদর্শন কেন্দুয়ার রোয়াইলবাড়িতে সুলতানি আমলের দুর্গটি প্রায় দুই যুগ পর আবারো খনন করছে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তর।

এবারের খননে খোঁজ মিলেছে দুর্গের মূল ফটক বা প্রবেশদ্বার।

এর আগে রোয়াইলবাড়ি দুর্গ প্রথম খনন হয় ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৪ সাল নাগাদ।

গত ২১ এপ্রিল থেকে প্রত্নতত্ব অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মাহাবুব-উল আলম ও গবেষণা সহকারী সাবিনা ইয়াসমিন নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি টিম এই খনন কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।

সহকারী পরিচালক মো. মাহাবুব-উল আলম জানান, প্রায় সাতশ বছর আগের ঐতিহাসিক এই নিদর্শনটিতে এবারের খননের লক্ষ্য দুর্গের মূল ফটক খোঁজ বের করা। তাই পুরো দুর্গ এলাকার নকশা এঁকে দক্ষিণ দিকে খনন কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। শুরুতে সন্ধান মেলে দুর্গের মূল ফটকের চিহ্ন। অলংকৃত ইট-পাথর সংগ্রহ করা হচ্ছে। এবারের খনন কাজ চলবে আগামী ১৫ জুন পর্যন্ত।

দুর্গের অবস্থান নিয়ে তিনি জানান, নেত্রকোণা জেলার কেন্দুয়া উপজেলা সদর হতে প্রায় ১২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে রোয়াইলবাড়ি। নান্দাইল চৌরাস্তা থেকে প্রায় ১৮ কিমি দক্ষিণ পূর্বে নান্দাইল-কেন্দুয়া পাকা সড়কের ওপর অবস্থিত সাহিতপুর বাজার। সাহিতপুর বাজার থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে এবং ১৮ বাড়ি রেলস্টেশন থেকে ১০ কিলোমিটার উত্তর পূর্বে রোয়াইলবাড়ি দুর্গ অবস্থিত। ভৌগোলিক  অবস্থান উত্তর ২৪ ৩৭'০১.৪" উত্তর অক্ষাংশ এবং ৯০ ৪৭'.০৬" পূর্ব দ্রাঘিমাংশ।

অধিদপ্তরটির এই কর্মকর্তা দুর্গের নামকরণের বিষয়ে বলেন, রোয়াইলবাড়ি দুর্গ কোটবাড়ি দুর্গ নামেও পরিচিত। কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ি আমতলা ইউনিয়নের রোয়াইলবাড়ি একটি গ্রাম। ‘রোয়াইলবাড়ি’ শব্দটি আরবি এবং বাংলা দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। ‘রোয়াইল’ শব্দটি আরবি রেইল বা রালাহ হতে এসেছে যার অর্থ মানুষ অথবা ঘোড়ার অগ্রবর্তী দল বা অশ্বারোহী সৈন্যদল এবং বাংলা ‘বাড়ি’ যা ঘর বা বাসস্থান। রোয়াইলবাড়ি অর্থাৎ সৈন্যদলের বাসস্থান।

রোয়াইলবাড়ি দুর্গ এবং এর পারিপার্শ্বিক পরিবেশ নিয়ে তথ্য দিয়ে বলেন, আয়তাকারে নির্মিত এ দুর্গের আয়তন ৫৩৩.২৩ মিটার (উত্তর-দক্ষিণ) ৩২৭.৫৭ মিটার (পূর্ব-পশ্চিম)। এ দুর্গের পশ্চিমে রয়েছে বর্তমানে মৃতপ্রায় বেতাই নদী যা পরিখারূপে ছিল। এ নদী থেকে পরিখা কেটে দুর্গের উত্তর ও দক্ষিণ দিক সুরক্ষিত করা হয়েছে। দুর্গের পূর্ব দিকে ছিল দুটি বিশাল আকারের দীঘি। দীঘি থেকে কিছু পূর্বে ছিল পরিখা। বেতাই নদী থেকে সেই পরিখাতে পানি সরবরাহ করা হতো। দীঘি দুটির মাঝখানে দুর্গে প্রবেশের জন্য একটি প্রবেশ পথ ছিল বলে ধারণা করা হয় যা বর্তমানে বিলীন। দুর্গের পরিখা সংলগ্ন ছিল একটি মাটির প্রাচীর। মাটির প্রাচীর ও পরিখাবেষ্টিত এই দুর্গের ভেতরে উত্তর দক্ষিণে দীঘি ও ইটের প্রাচীরবেষ্টিত একটি অভ্যন্তরীণ দুর্গ ছিল। দুর্গের উত্তর পশ্চিম কোণে রয়েছে বুরুজ ঢিবি। বুরুজ থেকে বেশ দক্ষিণে একটি ছোট পুকুর দেখা যায়। বিপদের সময় এ পুকুর পানীয় জলের জন্য ব্যবহার করা হত বলে মনে হয়। দুর্গের দক্ষিণে পনের গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে।

মসজিদের ৩০ মিটার উত্তরে একটি প্রাচীর কবরস্থান আছে। এটি স্থানীয়ভাবে নিয়ামত বিবির মাজার ও ডেঙ্গুমিয়ার সমাধি নামে পরিচিত। মুসলিম যুগের শুরুতে বাংলায় মুসলিম কর্তৃত্ব ছিল তিস্তা এবং করতোয়া নদীর উত্তর-পূর্ব এবং পশ্চিম ভাগ ও গঙ্গার উত্তর ভাগ। যদিও দক্ষিণ, পূর্ব অঞ্চলে বিস্তার করেছিল কিন্তু তা বলবনি যুগের পূর্ব পর্যন্ত স্থায়ী হয়নি। খ্রিস্ট্রীয় ১২৫৭ সালে রোয়াইলবাড়ি ছিল ব্রহ্মপুত্রের পূর্ব ভাগ অর্থাৎ পূর্ব ময়মনসিংহ এবং তা ত্রয়োদশ শতক পর্যন্ত ছিল। শ্রী কেদারনাথ মজুমদার প্রণীত ময়মনসিংহের ইতিহাস ও ময়মনসিংহের বিবরণ গ্রন্থে মজিদ জালাল, ঈসা খাঁ নাসিরুজিয়াল পরগনা, রোয়াইল বাড়ি জয় করেছিলেন এবং এটা ছিল দেয়ালঘেরা আবাসভূমি। মুসলিম যুগের শুরুতে রোয়াইল বাড়ি দুর্গটি সৈন্যবাহিনী এবং পদাতিক বাহিনীর আউটপোস্ট বা স্টেশন ছিল বলে ধারণা করা হয়।

তিনি জানান, রোয়াইল বাড়ি দুর্গে প্রথম খনন হয় ১৯৯১-১৯৯২ অর্থবছর এবং পরবর্তী দুই বছর ১৯৯২-১৯৯৩, ১৯৯৩-১৯৯৪ অর্থবছরে খনন করা হয়েছিল। খননে মূলত দুর্গের উত্তর পশ্চিম কোণায় বুরুজ ঢিবি। দুর্গের দক্ষিণে পনের গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের ধ্বংসাবশেষ বা বার দুয়ারী মসজিদ আবিষ্কৃত ও প্রাচীরবেষ্টিত একটি বুরুজ কমপ্লেক্স উন্মোচিত হয়।

দীর্ঘ বিরতির পর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রোয়াইলবাড়ি দুর্গে প্রত্নতাত্ত্বিক খননের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ২১ এপ্রিল রোয়াইলবাড়ি দুর্গের দক্ষিণের প্রাচীরের নির্মাণ কৌশল ও গঠনপ্রণালী এবং প্রবেশ পথের স্বরূপ উদঘাটনের উদ্দেশ্যে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজ আরম্ভ করা হয়। এ নাগাদ মোট আটটি খনন খাদে (এফ ৫০,৫১,জি ৫০,৫১,এইচ ৫০,৫১,আই ৫১ ও জি ৪৯) খনন পরিচালিত হয়েছে। মাটির উপরিতল হতে সর্বোচ্চ ১.০০ মিটার হতে ১.৫০ মিটার গভীরতা পর্যন্ত  খনন করা হয়। খননের ফলে দক্ষিণের দুর্গ প্রাচীরের কাঠামো সমূহ ও অষ্টকোণাকার পাথর নির্মিত বুরুজ আবিষ্কৃত হয়েছে। এছাড়া অলংকারিক পাথর, অলংকারিক ইট ও মৃৎ পাত্রের টুকরা পাওয়া গেছে এবং খনন চলমান রয়েছে বলে জানান প্রত্নতত্ন অধিদপ্তরের  সহকারী পরিচালক মো. মাহাবুব-উল আলম।

নেত্রকোণা জেলা পর্যটন উন্নয়ন জোটের সদস্য সচিব তপন সাহা অভিযোগ করে বলেন, দুর্গ এলাকাটি সরকারিভাবে চিহ্নিত করে বাউন্ডারি দেয়াল তৈরি করা হয়নি। যার কারণে বিশাল এই দুর্গ এলাকা দিন দিন দখলে যাচ্ছে। অবৈধভাবে কাগজপত্র তৈরি করে দখল নিয়ে গেছে অনেকেই। খোয়া যাচ্ছে দুর্গের অমূল্য সম্পদ। দুর্গ এলাকার মাত্র এক একর ৯০ শতক ভূমি রয়েছে সরকারি খাস ভূমি হিসেবে। বাকি সব সম্পদ ১৯৮২ সালে বিআরএস মূলে স্থানীয় মালিক বনে গেছেন।

তপন সাহা আরো বলেন, প্রতিদিন এই দুর্গ এলাকা দেখতে প্রচুর দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। দর্শনার্থীরা এসে পড়েন বিড়ম্বনায়। এখানে নেই কোনো পয়নিষ্কাশনের ও পানীয় জলের ব্যবস্থা। সম্প্রতি জেলা পরিষদের উদ্যোগে দুটি ছাতাকৃতি যাত্রী ছাউনি নির্মাণ করা হয়। দূর্গটিকে বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে সরকারের প্রতি বছর হাজার হাজার টাকা রাজস্ব আয় হতো বলেছেন নেত্রকোণা জেলা পর্যটন উন্নয়ন জোটের সদস্য সচিব।

(ঢাকাটাইমস/০৪জুন/প্রতিনিধি/জেবি)

সংবাদটি শেয়ার করুন

বাংলাদেশ বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত