স্মৃতিতে নাট্যজন আতিকুল হক চৌধুরী স্যার

মাসুদুল হাসান রনি, পোজনান, পোল্যন্ড থেকে
| আপডেট : ১৬ জুন ২০১৭, ১০:২৩ | প্রকাশিত : ১৬ জুন ২০১৭, ১০:১২

২০০৬-২০১৩ এই দীর্ঘ সময় নাট্যজন আতিকুল হক চৌধুরী। আতিক স্যারের সাথে একুশে টেলিভিশনে কাজ করার দুর্লভ সুযোগ ঘটেছিল। কাজের বাইরেও তার সাথে রয়েছে নানান স্মৃতি। বিভিন্ন সময় তিনি কাজ ছাড়াও তার রুমে ডেকে নিয়ে গেছেন। ঘণ্টার পর ঘণ্টা নানান বিষয় কথা বলেছেন, সেই সব বিষয়ের উপর জানতে চেয়েছেন আমার অভিমত।

আমি বসতাম তার রুমের পাশে একটি ডেস্কে। তাই স্যার প্রায় সময় আমাকে ডাকতেন তার সদ্য লেখার খসড়া পড়ে শোনানোর জন্য এবং খটোমটো কিছু বাংলা বানান সঠিকভাবে লিখেছেন কি না তা কনফার্ম হবার জন্য। এ ক্ষেত্রে অঞ্জন দা তাকে প্রায় বাংলা বানান ঠিক করে দিতেন। তার রুমের পাশেই আমার ডেস্ক হওয়ায় প্রতিদিনই তার রুমে আমার ডাক পড়তো।

-রনি, কিংকর্তব্যবিমূঢ় বানানটা কি? এইটা কি এক শব্দ?

এই রকম হাজার হাজার বানান বা একশব্দ কিনা জানতে চাইতেন। আমার বাংলা বানানের অবস্থা খুব ভালো না। স্যারের প্রতিদিনের চাহিদা মেটাতে আমাকে শেষ পর্যন্ত অফিসে বাংলা একাডেমির একটা অভিধান কিনে আনতে হয়েছিল।

একুশে টিভিতে স্যারের সবচেয়ে প্রিয়পাত্র ছিলেন মেহেমুদ খোকন। তিনি ছিলেন স্যারের সব কাজের সঙ্গী, স্যার তাকে অসম্ভব ভালবাসতেন।

একটা সময় মেহেমুদকে স্যার ডেকে পাঠালে আমরা ভয়ে থাকতাম। কারণ আমরা নিশ্চিত ছিলাম মেহেমুদ রুম থেকে বের হয়ে আমাদের কাউকে না কাউকে মেমো দিবেন। এই সময়টাতে মেহেমুদের নাম মেমো মেহেমুদ হয়ে গিয়েছিল।

স্যার শত কাজের মাঝেও আনন্দ পছন্দ করতেন। আমরা যখনই কোনো জন্মদিন, বিদায় অনুষ্ঠান, খেলা কিংবা হৈ চৈ করেছি স্যার আমাদের সাথে অংশ নিতেন। তিনি নিজে যেমন সব সময় হাসিমুখ থাকতেন, তেমনি আমদের গোমড়া মুখ পছন্দ করতেন না। কাউকে গোমড়া দেখলে হাসির কথা বলে মন ভাল করে দিতেন।

স্যারের সাথে দীর্ঘ সময় কাজ করার মধ্য দিয়ে খুব কাছ থেকে তাকে যেমন হাসিখুশি, প্রাণবন্ত দেখেছি, তেমনি কখনো কখনো তাকে দূরগ্রহের মানুষ মনে হয়েছে। এর কারণ তিনি মাঝে মাঝে নিজেকে সব কিছু থেকে দূরে সরিয়ে নিতেন! তখন তাকে আপন মনে হত না। ভিনগ্রহের মানুষ মনে হতো।

স্যারের সাথে যেমন ভাল সম্পর্ক ছিল, তেমনি কেউ কেউ এই সম্পর্ককে বিষিয়ে তোলার চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু কেউ তাতে সফল হতে পারেননি। তারা আমার অফিসেরই সহকর্মী!

স্যার মাঝে মাঝে এই নিয়ে আক্ষেপ করে বলতেন- ‘রনি, তুমি তোমার কাজ করে যাও। যারা কোনো কাজ করে না, তারাই পরের খুঁত খুঁজে বেড়ায়। তোমার কাজই ওদের বিরুদ্ধে কঠিন জবাব দিবে।’

একটা সময় আমাদের ফ্লোরে নানান উপলক্ষে সাপ্তাহের সাত দিনই ছিল উৎসবমুখর আর খাবার-দাবারের আয়োজনে ভরপুর। স্যার জানতেন আমি মিষ্টি খুব পছন্দ করি। তিনি যেহেতু ডায়াবেটিসের পেশেন্ট, তাই নিজের ভাগের মিষ্টি সব সময় আমাকে তুলে দিতেন।

স্নেহ-ভালবাসা যেমন পেয়েছি, তেমনি ভুল-টুল হলে ক্ষমা করেননি।

তার অনেক বিষয়ে আমার দ্বিমত ছিল। অকপটে বলতাম, তিনি শুনতেন। কিন্তু কিছু বলতেন না, চুপ মেরে যেতেন। এই নিয়ে আমার বা আমাদের অনেকেরই তার উপর  ভীষণ অভিমানও ছিল!

বলতে দ্বিধা নেই, স্যারের কিছু বিষয় নিয়ে শুরুর দিকে আমি ও সুমনা আপা চরম বিরক্ত হয়েছিলাম। বিশেষত  একুশে দুপুরের স্ক্রিপ্ট নিয়ে তার অযাচিত মাথাব্যাথার জন্য! আমাদের জিএম আমিনুল ইসলাম খোকন ভাই স্যারকে বুঝিয়েছিলেন, ডেইলি লাইভ প্রোগ্রামের স্ক্রিপ্ট অনুষ্ঠানের দুই থেকে চার মিনিট আগে বারবার চেঞ্জ করা ঠিক হবে না । সেটা তিনি পরে বুঝতে পেরেছিলেন বলে স্যার আর কোনদিন এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ করেননি।

স্যারের সাথে এত স্মৃতি, কোনটা রেখে কোনটা বলব। এক কথায় লিখেও শেষ করা যাবে না।

তবে মনটা খারাপ হয়ে গিয়েছিল ২০১৩ সালের ১৭ জুন। তখন আমি এবং একুশে টেলিভিশনের চেয়ারম্যান স্যার মাত্র একদিন আগেই জার্মানির বনে গিয়েছি ‘গ্লোবাল মিডিয়া ফোরামে’ যোগ দিতে। আমরা দেশ ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা পরে আতিক স্যার মারা গেলেন। এই সংবাদটি জানলাম জার্মান পৌঁছে।

চেয়ারম্যান স্যারের কাছে দেশ থেকে নিউজটি এসেছিল।

সুদূর বিদেশ বসে সেদিন কী যে মন খারাপ হল আমাদের! চেয়ারম্যান স্যার একটা অধিবেশনে কী-নোট পড়লেন ভারাক্রান্ত মন নিয়ে। আমি পুরো অধিবেশনে মন খারাপ করে ক্যামেরা অপারেট করি আর মাঝেমাঝে চোখের পানিতে ভেসেছি। আমার চেয়ারম্যান স্যার স্টেজে বসে খেয়াল করেছিলেন আমি বারবার চোখ মুছেছি।

স্যার অধিবেশনের লাঞ্চ ব্রেকে বের হয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে হাত ধরে কিছু সময় চুপ করেছিলেন। আমি বুঝতে পারছিলাম আমাদের দুজনের ভেতরে কি ভাঙচুর হচ্ছিল। স্যার একপর্যায়ে বললেন, বিশ্বাস করো আমার যদি পরের দিনের অধিবেশনটা না থাকতো, আমি এখনি ঢাকা ফিরে যেতাম। মন খারাপ করো না, স্যারের জন্য দোয়া করো।'

বলেই চেয়ারম্যান স্যার দ্রুত সরে গেলেন। স্যারের চোখ দুটো জলে চিকচিক করছিল।

আমার বড় আফসোস শেষ দেখাটা হল না স্যারের সাথে।

আজ আতিক স্যারের মৃত্যুদিন।

স্যার, আপনি যেখানে থাকুন, ভাল থাকুন- এই কামনা করি সব সময়।

লেখক- সাংবাদিক

সংবাদটি শেয়ার করুন

মতামত বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত