রাসায়নিকনির্ভর কৃষির অন্ধদৌড়ে হারিয়ে যাচ্ছে উর্বরতা
মাটির আর্তনাদ কি শুনছে কেউ?

বাংলাদেশের কৃষি একসময় ছিল প্রকৃতিনির্ভর। মাঠে মাঠে জৈব সার ব্যবহার হতো, ফসলের জমি বছরজুড়ে বিশ্রাম পেত, নদীর পলি জমিকে নতুন প্রাণ দিত, আর কৃষকের অভিজ্ঞতাই ছিল কৃষিবিজ্ঞানের প্রধান ভিত্তি। কিন্তু সময় বদলেছে। জনসংখ্যা বেড়েছে, খাদ্যচাহিদা বেড়েছে, কৃষিকে বাণিজ্যিকীকরণের চাপ বেড়েছে। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার লক্ষ্যে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে কৃষি উৎপাদন বাড়াতে যে পথ বেছে নিয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও নানা ধরনের কৃত্রিম উপাদানের ব্যবহার।
প্রথম দিকে এই পদ্ধতি উৎপাদন বাড়াতে সহায়ক হলেও এখন সেই সাফল্যের আড়ালে তৈরি হয়েছে ভয়ংকর এক সংকট- মাটির উর্বরতা ধীরে ধীরে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। আজ বাংলাদেশের বহু অঞ্চলের জমি আগের মতো ফসল দিচ্ছে না। একই জমিতে আগের চেয়ে বেশি সার দিতে হচ্ছে, বেশি কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে, তবুও ফলন আশানুরূপ হচ্ছে না। মাটির জৈব উপাদান কমে যাচ্ছে, কেঁচো ও উপকারী অণুজীব বিলুপ্ত হচ্ছে, পানির ধারণক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে।
একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে প্রকৃতি হারাচ্ছে তার স্বাভাবিক ভারসাম্য। এই ধারা যদি অব্যাহত থাকে, তবে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ভয়াবহ খাদ্যসংকটের মুখোমুখি হতে পারে শঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। এটি কেবল কৃষির সংকট নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বের প্রশ্ন। তাই এখনই সতর্ক হওয়া জরুরি।
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছিল খাদ্য ঘাটতি। দুর্ভিক্ষ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কারণে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। সেই বাস্তবতায় উচ্চফলনশীল বীজ, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহারকে কৃষি বিপ্লবের অংশ হিসেবে দেখা হয়। ধান, গম ও অন্যান্য খাদ্যশস্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আসে। কৃষক দ্রুত ফলন পেতে শুরু করেন। কিন্তু কৃষিতে এই সাফল্যের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় মাটির ওপর নিরবচ্ছিন্ন চাপ। একই জমিতে বারবার একই ধরনের ফসল চাষ, অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ, নির্বিচারে কীটনাশক ব্যবহার এবং জৈব সার ব্যবহারের অভ্যাস কমে যাওয়ায় মাটির স্বাভাবিক গঠন নষ্ট হতে থাকে।
কৃষকেরা তাৎক্ষণিক ফলনের দিকে ঝুঁকেছেন, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে তেমন চিন্তা করা হয়নি। বাংলাদেশের বহু কৃষক এখন মনে করেন, সার ছাড়া জমি আর ফসল দেয় না। অথচ বাস্তবতা হলো, অতিরিক্ত রাসায়নিক প্রয়োগই জমিকে এমন অবস্থায় নিয়ে গেছে, যেখানে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা শক্তি ধ্বংস হয়ে পড়েছে। জমি এখন যেন কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা এক ক্লান্ত দেহ।
একসময় গ্রামের জমিতে কেঁচো ছিল প্রচুর। বর্ষাকালে মাটি নরম থাকত, ফসলের গোড়া শক্ত থাকত, জমি সহজে আর্দ্রতা ধরে রাখত। এখন অনেক জায়গায় মাটি শক্ত হয়ে যাচ্ছে, ফেটে যাচ্ছে, পানি ধরে রাখতে পারছে না। কৃষকেরা বলছেন, আগের তুলনায় এখন দ্বিগুণ সার দিয়েও ফলন কম হচ্ছে। এটি একটি ভয়াবহ সতর্কসংকেত।
মাটির প্রাণ হলো তার জৈব উপাদান। এই জৈব উপাদান মাটিকে উর্বর রাখে, পানি ধারণ করে, অণুজীবকে বাঁচিয়ে রাখে এবং গাছের শিকড়কে পুষ্টি সরবরাহ করে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষিজমিতে জৈব উপাদানের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। অনেক এলাকায় ধানের খড়, গবাদিপশুর গোবর বা ফসলের অবশিষ্টাংশ জমিতে ফিরিয়ে না দিয়ে জ্বালানি বা অন্য কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে মাটি তার প্রাকৃতিক পুষ্টি ফিরে পাচ্ছে না। জৈব সার ব্যবহারের বদলে রাসায়নিক সারই হয়ে উঠেছে কৃষির প্রধান ভরসা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি উর্বর জমিতে অন্তত ৩ থেকে ৫ শতাংশ জৈব উপাদান থাকা প্রয়োজন। অথচ বাংলাদেশের অনেক এলাকায় এই হার ১ শতাংশেরও নিচে নেমে গেছে। এর অর্থ হলো, মাটি ধীরে ধীরে মৃতপ্রায় হয়ে পড়ছে। মাটির জৈব উপাদান কমে গেলে ফসল শুধু কম হয় না, জমি প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রতিও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। খরা হলে জমি দ্রুত শুকিয়ে যায়, আবার অতিবৃষ্টি হলে মাটি ক্ষয়ে যায়। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতও আরও ভয়াবহ হয়ে দাঁড়ায়।
বাংলাদেশে কৃষিতে কীটনাশকের ব্যবহার গত কয়েক দশকে ভয়াবহভাবে বেড়েছে। পোকামাকড় দমন এবং দ্রুত ফলন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে অনেক কৃষক মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করছেন। অনেক ক্ষেত্রে সঠিক মাত্রা, সময় বা পদ্ধতি না জেনেই এই রাসায়নিক প্রয়োগ করা হয়। ফলে ক্ষতি হচ্ছে বহুমাত্রিক। প্রথমত, জমির উপকারী পোকামাকড় ও অণুজীব মারা যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, মাটি ও পানিতে বিষাক্ত উপাদান জমা হচ্ছে। তৃতীয়ত, মানুষের শরীরে ঢুকছে ক্ষতিকর রাসায়নিক।
অনেক কৃষক মনে করেন, বেশি ওষুধ দিলে বেশি সুরক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু বাস্তবে পোকামাকড়ও ধীরে ধীরে প্রতিরোধক্ষম হয়ে উঠছে। ফলে একই পোকা দমনে আরও বেশি মাত্রার কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে। এটি একটি বিপজ্জনক চক্র। ফসলের মাঠে ব্যবহৃত অনেক কীটনাশক নদী-খাল হয়ে পানিতে মিশছে। মাছ, ব্যাঙ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর জীবন হুমকির মুখে পড়ছে। কৃষিজমির আশপাশের পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে।
শুধু তাই নয়, বাজারে আসা সবজি ও ফলমূলেও প্রায়ই অতিরিক্ত কীটনাশকের উপস্থিতি পাওয়া যায়। এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। ক্যানসার, কিডনি রোগ, হরমোনজনিত সমস্যা এবং নানা জটিল রোগের সঙ্গে এসব বিষাক্ত উপাদানের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ রয়েছে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কৃষকেরা কেন এত বেশি রাসায়নিক ব্যবহার করছেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের কৃষি ব্যবস্থার গভীরে যেতে হবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ কৃষক ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক। তাদের প্রধান লক্ষ্য হলো দ্রুত ফলন পাওয়া এবং টিকে থাকা। কৃষি এখন আর শুধু জীবনধারণের উপায় নয়; এটি কঠিন প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র। কম সময়ে বেশি উৎপাদন না হলে কৃষকের পক্ষে টিকে থাকা কঠিন। এ ছাড়া কৃষকদের বড় একটি অংশ পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পান না। অনেক সময় সার ও কীটনাশক বিক্রেতাদের পরামর্শেই কৃষকেরা রাসায়নিক ব্যবহার করেন। সেখানে ব্যবসায়িক স্বার্থও জড়িত থাকে। ফলে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি রাসায়নিক ব্যবহারকে উৎসাহ দেওয়া হয়।
অন্যদিকে কৃষিতে জৈব পদ্ধতি বা টেকসই চাষাবাদের জন্য পর্যাপ্ত সরকারি সহায়তা, বাজারব্যবস্থা ও সচেতনতা গড়ে ওঠেনি। একজন কৃষক যদি জৈব চাষ করতে চান, তবে তাকে বাড়তি শ্রম, সময় ও ঝুঁকি নিতে হয়। কিন্তু বাজারে তিনি অনেক সময় ন্যায্য মূল্য পান না। ফলে অধিকাংশ কৃষক সহজ ও দ্রুত ফলনের পথেই হাঁটছেন।
বাংলাদেশ এমনিতেই জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম। অতিবৃষ্টি, খরা, নদীভাঙন, লবণাক্ততা ও অনিয়মিত আবহাওয়া কৃষিকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে। এর সঙ্গে যখন মাটির উর্বরতা হ্রাস যোগ হচ্ছে, তখন সংকট আরও গভীর হচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ার কারণে বহু জমি আগের মতো ফসল উৎপাদন করতে পারছে না। উত্তরাঞ্চলে খরার প্রকোপ বাড়ছে। আবার কোথাও অতিবৃষ্টি জমির উর্বর অংশ ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে। একটি সুস্থ মাটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জৈব উপাদানসমৃদ্ধ মাটি পানি ধরে রাখতে পারে, খরা সহ্য করতে পারে এবং অতিরিক্ত কার্বন শোষণ করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মাটি যখন দুর্বল হয়ে পড়ছে, তখন কৃষিও জলবায়ু পরিবর্তনের কাছে আরও অসহায় হয়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে- এ কথা সত্য। ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। মাছ, সবজি ও আলু উৎপাদনেও সাফল্য এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই সাফল্য কতটা টেকসই? যদি মাটির উর্বরতা ক্রমাগত কমতে থাকে, তবে একসময় উৎপাদন হঠাৎ করেই কমে যেতে পারে। তখন শুধু খাদ্য আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়বে না, দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। খাদ্যের দাম বাড়বে, পুষ্টিহীনতা বাড়বে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে।
বিশ্বব্যাপী এখন খাদ্যনিরাপত্তা শুধু উৎপাদনের প্রশ্ন নয়; এটি টেকসই উৎপাদনের প্রশ্ন। অল্প সময়ের জন্য বেশি ফলন পাওয়া যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জমিকে জীবিত রাখা। বাংলাদেশ যদি এখনই সতর্ক না হয়, তবে আজকের উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্য আগামী দিনের ভয়াবহ বিপর্যয়ে পরিণত হতে পারে।
বাংলাদেশে কৃষিজমির পরিমাণও দ্রুত কমছে। শিল্পায়ন, নগরায়ণ, আবাসন প্রকল্প, ইটভাটা এবং অবকাঠামো নির্মাণের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে অবশিষ্ট জমির ওপর চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে। একই জমি থেকে বারবার ফসল নেওয়া হচ্ছে। জমিকে বিশ্রাম দেওয়ার সুযোগ নেই। অনেক এলাকায় বছরে তিন থেকে চারবার ফসল উৎপাদন করা হচ্ছে। এর ফলে মাটির পুষ্টি দ্রুত নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। একদিকে জমি কমছে, অন্যদিকে সেই জমির উর্বরতাও কমছে—এটি ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত অশনিসংকেত।
রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের অতিরিক্ত ব্যবহার শুধু মাটির ক্ষতি করছে না; কৃষকের জীবনও ঝুঁকির মধ্যে ফেলছে। গ্রামাঞ্চলে বহু কৃষক নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই কীটনাশক স্প্রে করেন। অনেকেই গ্লাভস, মাস্ক বা সুরক্ষাপোশাক ব্যবহার করেন না। ফলে শ্বাসকষ্ট, ত্বকের রোগ, মাথা ঘোরা, চোখের সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বহু কৃষক জানেনই না যে তারা প্রতিদিন ধীরে ধীরে বিষের সংস্পর্শে আসছেন। কৃষি যদি কৃষকের জীবনকেই অনিরাপদ করে তোলে, তবে সেটি কোনো সুস্থ উন্নয়ন হতে পারে না।
বিশ্বের বহু দেশ ইতিমধ্যেই বুঝতে পেরেছে যে অতিরিক্ত রাসায়নিকনির্ভর কৃষি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তাই তারা ধীরে ধীরে টেকসই কৃষি, জৈব কৃষি, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের দিকে ঝুঁকছে। ইউরোপের বহু দেশে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমানোর জন্য কঠোর নীতি নেওয়া হয়েছে। অনেক দেশে জৈব খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। কৃষকদের জৈব সার ব্যবহারে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে। ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভুটানসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশেও টেকসই কৃষি নিয়ে নতুনভাবে চিন্তা শুরু হয়েছে। যদিও নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবু অন্তত এই উপলব্ধি তৈরি হয়েছে যে মাটিকে বাঁচানো ছাড়া কৃষির ভবিষ্যৎ নেই। বাংলাদেশেও এই উপলব্ধি জরুরি।
শুধু উৎপাদনের পরিসংখ্যান দেখিয়ে আত্মতুষ্টিতে ভোগার সময় এখন আর নেই। সংকট গভীর হলেও সমাধানের পথ একেবারে বন্ধ নয়। বরং এখনই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই সামাল দেওয়া সম্ভব। এজন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সামাজিক সচেতনতা।
বাংলাদেশে কৃষিনীতি ও খাদ্যনীতিতে মাটির স্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নিয়মিত মাটির পরীক্ষা, মাটির স্বাস্থ্যমানচিত্র তৈরি এবং অঞ্চলভিত্তিক পুষ্টি ব্যবস্থাপনা চালু করা জরুরি। গোবর, কম্পোস্ট, সবুজ সার এবং কৃষিবর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরির উদ্যোগ বাড়াতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ে জৈব সার উৎপাদন ও ব্যবহারে কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমাতে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। উপকারী পোকা সংরক্ষণ, ফাঁদ ব্যবহার, জৈব কীটনাশক এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার বাড়াতে হবে।
কৃষকেরা সমস্যার মূল কারণ নন; তাঁরা অনেক সময় পরিস্থিতির শিকার। তাই তাদের দোষারোপ না করে প্রশিক্ষণ, তথ্য ও সহায়তা দিতে হবে। মাঠপর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তাদের কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। জৈব ও নিরাপদ খাদ্যের জন্য আলাদা বাজারব্যবস্থা তৈরি করা জরুরি। যাতে কৃষকেরা টেকসই কৃষি করে ন্যায্য মূল্য পান। বাংলাদেশের মাটি, জলবায়ু ও কৃষিব্যবস্থার উপযোগী টেকসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গবেষণার বিকল্প নেই। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
মাটির সংকটকে এখনো বাংলাদেশে জাতীয় জরুরি সমস্যা হিসেবে দেখা হয় না। অথচ এটি এমন এক সংকট, যার প্রভাব ধীরে ধীরে পুরো জাতিকে গ্রাস করতে পারে। নীতিনির্ধারকদের বুঝতে হবে, শুধু রাস্তা, সেতু বা ভবন নির্মাণ উন্নয়নের একমাত্র সূচক নয়। দেশের মাটি যদি অনুর্বর হয়ে যায়, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে না। খাদ্যনিরাপত্তা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা সম্ভব নয়। মাটিকে রক্ষা করার লড়াই শুধু সরকারের একার নয়। এটি পুরো সমাজের দায়িত্ব। তাই গণমাধ্যম, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, গবেষক, পরিবেশকর্মী এবং সাধারণ মানুষকে একসঙ্গে এটা প্রতিকারের জন্য কাজ করতে হবে।
(ঢাকাটাইমস/১৬মে/মোআ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













