প্রধানমন্ত্রীর প্রথম বিদেশ সফর: মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার, চীনে বিনিয়োগ ও কৌশলগত সহযোগিতায় জোর

সরকার গঠনের চার মাসের মাথায় প্রথম সরকারি বিদেশ সফরে আগামীকাল রবিবার (২১ জুন) মালয়েশিয়ার উদ্দেশে রওনা হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। মালয়েশিয়ায় দুই দিনের সফর শেষে তিনি চার দিনের সরকারি সফরে চীন যাবেন। দুই দেশ সফরে অন্তত দুই ডজন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ), চুক্তি এবং নোট অব এক্সচেঞ্জ সই হওয়ার কথা রয়েছে, যা বাংলাদেশের অর্থনীতি, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার ও কৌশলগত সহযোগিতার ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমানের প্রথম সরকারি বিদেশ সফর কোন দেশে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ছিল। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েনের প্রেক্ষাপটে অনেকেই ধারণা করেছিলেন, প্রথম সফর ভারত অথবা চীনে হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত মালয়েশিয়াকে প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেয় সরকার।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় প্রথম সফরের গন্তব্য নির্বাচন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকার ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির বার্তা দিতে চেয়েছে বলেই মালয়েশিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, কোরবানির ঈদের আগেই প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়া সফরে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। পরবর্তীতে সেই পরিকল্পনাই চূড়ান্ত করা হয়।
মালয়েশিয়ায় শ্রমবাজার পুনরায় চালু
প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরের অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হচ্ছে দেশটির শ্রমবাজার পুনরায় চালু করা। বর্তমানে প্রায় আট লাখ বাংলাদেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় কাজ করছেন। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগের পর ২০২৪ সালের ১ জুন থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য দেশটির শ্রমবাজার কার্যত বন্ধ রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সফরে শ্রমবাজার পুনরায় চালু, কর্মীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে।
এছাড়া শিক্ষা, জ্বালানি, কৃষি, হালাল খাদ্যশিল্প, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি, সুনীল অর্থনীতি, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও আলোচনা হতে পারে।
বর্তমানে প্রায় ১২ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করছেন। ফলে উচ্চশিক্ষা ও কারিগরি শিক্ষা খাতেও নতুন সহযোগিতা কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক এবং দুটি নোট অব এক্সচেঞ্জ সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২২ জুন সকালে পুত্রজায়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠক শেষে প্রতিনিধি পর্যায়ের আলোচনা এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হবে।
পরে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দুই দেশের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হবে।
সফরকালে মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম ইবন ইস্কান্দারের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি এমএমসি পোর্ট, এয়ার এশিয়া এবং পেট্রোনাস গ্রুপের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও বৈঠক করবেন তিনি।
চীন সফরে বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সহযোগিতায় জোর
মালয়েশিয়া সফর শেষে ২২ জুন বিকেলে চীনের উদ্দেশে রওনা দেবেন প্রধানমন্ত্রী। চার দিনের এই সফরে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ১৬টি সমঝোতা স্মারক এবং তিনটি চুক্তি সই হওয়ার কথা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, সফরের মূল লক্ষ্য হবে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ, উন্নয়ন সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণ।
চীন বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার। প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য চীন থেকে আমদানি করে। পাশাপাশি অবকাঠামো উন্নয়নেও দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন সহযোগী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াংয়ের বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে একটি যৌথ ইশতেহার ঘোষণার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ও চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্তির পর এটি হবে তৃতীয় যৌথ ইশতেহার। একই সঙ্গে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ (জিডিআই)-এ বাংলাদেশের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণের ঘোষণাও আসতে পারে।
চীন সফরে বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি, জ্বালানি উন্নয়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, বৃত্তিমূলক শিক্ষা, উন্নয়ন সহযোগিতা, মোংলা বন্দরের সম্প্রসারণ, উচ্চমানের বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি এবং তাজা কাঁঠাল রপ্তানি নিয়ে একাধিক সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে।
এ ছাড়া বিএনপি এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যেও একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পরিকল্পনা রয়েছে।
তথ্য ও সম্প্রচার খাতেও সহযোগিতা বাড়াতে চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা শিনহুয়া, চায়না মিডিয়া গ্রুপ, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) এবং বাংলাদেশ টেলিভিশনের মধ্যে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে।
চীন সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে দেশটির প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠক।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং, ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান ঝাও লেজিসহ চীনের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করবেন তিনি।
সফরকালে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘সামার দাভোস’-এ অংশ নেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ফোরামে চীনা বিনিয়োগকারীদের সামনে বাংলাদেশের সম্ভাবনা তুলে ধরবেন প্রধানমন্ত্রী।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়া ও চীন সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশ একদিকে অর্থনৈতিক স্বার্থ এগিয়ে নিতে চাচ্ছে, অন্যদিকে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার বার্তাও দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সফরের মাধ্যমে এমন কোনো ধারণা তৈরি হওয়া উচিত নয় যে বাংলাদেশ কোনো একটি বৃহৎ শক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। বরং আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেই জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
(ঢাকাটাইমস/২০ জুন/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন











































