আজ ঐতিহাসিক পলাশী দিবস

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ২৩ জুন ২০২৬, ০৯:২৭
অ- অ+

আজ ২৩ জুন, ঐতিহাসিক পলাশী দিবস। ১৭৫৭ সালের এই দিনে নদিয়ার পলাশীর আম্রকাননে সংঘটিত এক যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীন শাসনের অবসানের সূচনা ঘটে। বাংলার নবাব সিরাজউদ্দৌলা ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বাহিনীর কাছে পরাজিত হন এবং এর মধ্য দিয়েই ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়।

ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই যুদ্ধ শুধু বাংলার রাজনৈতিক ভবিষ্যৎই বদলে দেয়নি, বরং প্রায় দুই শতাব্দী ধরে উপমহাদেশকে বিদেশি শাসনের অধীনে নিয়ে যাওয়ার ভিত্তি রচনা করেছিল। তাই দিনটি বাঙালির ইতিহাসে এক বেদনাবিধুর স্মৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।

অষ্টাদশ শতকে বাংলা ছিল উপমহাদেশের অন্যতম সমৃদ্ধ অঞ্চল। কৃষি, বস্ত্রশিল্প ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সমৃদ্ধ এই অঞ্চলে ইউরোপীয় বিভিন্ন শক্তি ব্যবসা পরিচালনা করত। তাদের মধ্যে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ছিল সবচেয়ে প্রভাবশালী। ব্যবসার আড়ালে তারা ধীরে ধীরে সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধি করতে থাকে।

১৭৫৬ সালে নবাব হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর সিরাজউদ্দৌলা কোম্পানির বেআইনি কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগী হন। তিনি দুর্গ নির্মাণ ও অস্ত্র মজুদের মতো কার্যক্রমকে বাংলার সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি হিসেবে দেখতেন। এর ফলে নবাব ও কোম্পানির মধ্যে দ্বন্দ্ব ক্রমেই তীব্র হয়ে ওঠে।

এই বিরোধের চূড়ান্ত পরিণতি ঘটে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন। সাম্রাজ্যবাদীদের প্রলোভনে নিজ মাতৃভূমির সাথে বিশ্বাসঘাতকতার কারণ ছিল নিজেদের মধ্যে অনৈক্য, ক্ষমতার কাড়াকাড়ি ও হানাহানি। আমরা জানি, প্রাকৃতিক নিয়ম মোতাবেক ঐক্যে জয় আর অনৈক্যে পরাজয়। ১৭৫৭ সালে ঐতিহাসিক পলাশীর আম্র্রকাননে জাতির অনৈক্যের কারণে রবার্ট ক্লাইভের ৩৫০০ ইংরেজ বাহিনীর কাছে নবাবের ৫০,০০০ বাহিনীর পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল। এটা ছিল জাতির জন্য বড় একটি শিক্ষা। আমরা যদি অনৈক্য, হানাহানি ভুলে ঐক্যবদ্ধ জাতি হতে পারি প্রিয় জন্মভূমিকে সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত থেকে মুক্ত রাখতে পারি, তাহলে পলাশীর প্রেক্ষাপট তৈরি হবে না। যার জন্য বাংলার নবাবের পরাজয় হয়েছিল সেই শিক্ষা এখনই গ্রহণ করার সময় এসেছে।

পলাশীর প্রান্তরে নবাবের বিশাল বাহিনীর মুখোমুখি হয় রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন তুলনামূলক ছোট ব্রিটিশ বাহিনী। সৈন্যসংখ্যা ও সামরিক শক্তির বিচারে নবাবের পক্ষই ছিল অনেক বেশি শক্তিশালী। কিন্তু যুদ্ধের ফলাফল নির্ধারিত হয় অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতার মাধ্যমে।

ইতিহাসবিদদের মতে, নবাবের সেনাপতি মীর জাফর এবং তার সহযোগীরা গোপনে ব্রিটিশদের সঙ্গে সমঝোতা করেন। যুদ্ধের সময় তাদের নিষ্ক্রিয় অবস্থান নবাবের পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে নবাবের বিশ্বস্ত সেনানায়ক মীর মদন ও মোহনলাল সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করলেও শেষ পর্যন্ত পরাজয় এড়ানো সম্ভব হয়নি।

যুদ্ধে পরাজয়ের পর সিরাজউদ্দৌলা মুর্শিদাবাদে ফিরে যান। পরে তিনি বন্দি হন এবং নিহত হন। এরপর ব্রিটিশদের সমর্থনে মীর জাফর বাংলার নবাব হিসেবে ক্ষমতায় বসেন। তবে প্রকৃত ক্ষমতা ধীরে ধীরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে চলে যায়।

পলাশীর যুদ্ধের প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। বাংলার রাজস্ব ও সম্পদের ওপর কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং পরবর্তী সময়ে তারা প্রশাসনিক ক্ষমতাও নিজেদের হাতে নিয়ে নেয়। এই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক শক্তির ভিত্তিতেই ব্রিটিশরা ধীরে ধীরে সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে তাদের শাসন বিস্তার করে।

ইতিহাসবিদরা মনে করেন, পলাশীর পরাজয় শুধু একটি যুদ্ধের পরাজয় ছিল না; এটি ছিল জাতির অনৈক্য, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্রের করুণ পরিণতি। তাই পলাশীর ইতিহাস আজও জাতীয় ঐক্য, দেশপ্রেম ও স্বাধীনতা রক্ষার গুরুত্বের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হিসেবে বিবেচিত হয়।

দিবসটি উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আলোচনা সভা, স্মরণসভা এবং নানা কর্মসূচির আয়োজন করেছে। ইতিহাসের এই বেদনাবিধুর দিনটি স্মরণ করে নবাব সিরাজউদ্দৌলার আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ।

(ঢাকাটাইমস/২৩ জুন/আরজেড)

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
অবশেষে মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’কে নেওয়া হলো গবেষণা ইনস্টিটিউটে
দীর্ঘ চার মাস আটকে থাকার পর হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করল ‘এমভি বাংলার জয়যাত্রা’
বিশ্বকাপ ফুটবলে ২৪ ঘণ্টায় তিন তারকা মেসি-এমবাপ্পে-হালান্ডের জোড়া গোলের জয়
ঢাকাসহ দেশের ১৫ জেলায় ঝড় ও বজ্রবৃষ্টির পূর্বাভাস, নদীবন্দরে ১ নম্বর সতর্কসংকেত
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা