বিরোধী দল ছায়া সংসদ গঠন করতে পারে: কায়সার কামাল

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পীকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেছেন, জাতীয় সংসদকে কার্যকর ও শক্তিশালী করতে সরকারি ও বিরোধী দল উভয়কেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে বিরোধী দল ছায়া সংসদ গঠন করতে করতে পারে। একই সঙ্গে জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর সংস্কার ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা জরুরি।
মঙ্গলবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) শরৎ উৎসব ও ৩১তম ব্যাচের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী হিসেবে নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, “আমিও আপনাদের মতো ঐতিহ্যবাহী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র ছিলাম। ছাত্রজীবনের স্মৃতি কখনো মুছে যায় না। আজ এই মিলনায়তনে উপস্থিত হয়ে আমার মনে হচ্ছে, যেন আমি আবার সেই দিনগুলোতে ফিরে গেছি।”
শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, এ প্রতিষ্ঠান জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির অন্যতম কেন্দ্র। এখানকার শিক্ষার্থীরাই ভবিষ্যতে শিক্ষক, গবেষক ও জাতি গঠনের কারিগর হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। কোনো সরকার এককভাবে উন্নত জাতি গড়ে তুলতে পারে না; বরং প্রত্যেক দায়িত্বশীল নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে জাতি গঠনে অবদান রাখতে হয়।
শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়জীবনকে শুধু ডিগ্রি অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। মেধা, মনন, নৈতিকতা ও গবেষণার মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুশিক্ষিত করে একটি সুন্দর বাংলাদেশ বিনির্মাণে এখন থেকেই প্রস্তুতি নিতে হবে।
দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ঐতিহাসিক অবদানের কথা উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বলেন, ভাষা আন্দোলন, মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক সংগ্রামে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁদের নেতৃত্বে দেশের মানুষ বিভিন্ন সময়ে অধিকার আদায়ের সংগ্রামে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।
ডেপুটি স্পীকার বলেন, অতীতের গণতান্ত্রিক অর্জন ও নাগরিক অধিকার রক্ষায় সবাইকে সচেতন থাকতে হবে। স্বাধীনভাবে কথা বলা ও লেখার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানুষের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, “আপনাদের নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরা ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি। আমরা নতুন জীবন পেয়েছি। আমরা কি আবারও বসন্তকে হারিয়ে ফেলব? আমরা আর চাই না, দেশ থেকে বসন্ত হারিয়ে যাক। তাই আমাদের প্রত্যেককে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে, যেন আর আমরা বসন্তকে হারিয়ে না ফেলি।”
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। আমলাতন্ত্র, সিভিল প্রশাসনসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কার্যকর সংস্কার না হলে সরকারের উন্নয়ন উদ্যোগের সুফল জনগণের কাছে যথাযথভাবে পৌঁছাবে না। তাই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক, কার্যকর ও জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে তিনি সরকারের প্রতি প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম জোরদার করার আহ্বান জানান।
এসময় ডেপুটি স্পীকার জাতীয় সংসদের কার্যকারিতা প্রসঙ্গে বলেন, সংসদীয় গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে সরকারি ও বিরোধী দলকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। সংসদ কার্যকর না থাকলে দেশ আবারও বিপথে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। সরকারের নীতি ও কর্মকাণ্ডের পর্যালোচনা, ভুলত্রুটি চিহ্নিতকরণ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে বিরোধী দলের গঠনমূলক ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেন, ওয়েস্টমিনস্টার সংসদীয় ব্যবস্থার আদলে বিরোধী দলের একটি কার্যকর ছায়া সংসদ থাকলে গণতন্ত্র সংহত এবং নির্বাহী বিভাগকে অধিকতর জবাবদিহিতার আওতায় আনা যেতে পারে ।
এর মাধ্যমে সরকারের নীতি, মন্ত্রিসভার কার্যক্রম ও বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সরকারের ভুলত্রুটি তুলে ধরে বিকল্প প্রস্তাব উপস্থাপন এবং সংসদীয় জবাবদিহি নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি হবে।
তিনি আরও বলেন, “আমরা কে সরকারী দল বা কে বিরোধী দল তা বিবেচ্য বিয়ষ নয়, আমরা সকলেই বাংলাদেশের দল-বাংলাদেশী। আমরা প্রত্যেকে নিজ নিজ জায়গা থেকে দেশকে গড়ে তোলার জন্য এগিয়ে আসব এবং কাজ করব।”
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ভূমিকার কথা উল্লেখ করে ডেপুটি স্পীকার বলেন, “আপনাদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতের শিক্ষক, গবেষক, বিসিএস কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বিচারক, সাংবাদিক, লেখক, উদ্যোক্তা, নীতিনির্ধারক এবং রাষ্ট্রনায়কেরা উঠে আসবেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে শুধু একটি ডিগ্রি অর্জনের পর্যায় হিসেবে নয়, বরং নিজেকে একজন যোগ্য, মানবিক ও দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।”
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক হোসনে আরা বেগম। এ সময় বিশেষ অতিথিবৃন্দ, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষক, নবীন ও প্রবীণ শিক্ষার্থী, আমন্ত্রিত অতিথি, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রতিনিধি, জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













