মিরপুরে শ্রমিক বিক্ষোভে অর্থায়নের অভিযোগে আলোচনায় তারিক আল মামুন, খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা

রাজধানীর মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনে সহিংসতার ঘটনায় অর্থায়নের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন এক সময়ে আওয়ামী লীগের সুবিধাভোগী ও বর্তমানে সরকারি দলের কয়েকজন নেতার প্রশ্রয়ে থাকা ভূমিদস্যু খ্যাত আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেডের তারিক আল মামুন। শ্রমিকদের দাবিকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভে উসকানি, লোক জড়ো করা এবং মাঠপর্যায়ে অর্থ সরবরাহ ও ইন্ধনের অভিযোগ উঠেছে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা রশিদুল আলম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ ও তার ভাই রফিকুল আলম বাচ্চুর পার্টনার তারিক আল মামুনকে ঘিরে। ঢাকা টাইমসকে মিরপুরের রাজনীতি ও ব্যবসায়িক অনেক সূত্র জানিয়েছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখা তারিক আল মামুন আপাতত তার সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখতে মিরপুরের বর্তমান প্রভাবশালী একটি রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকলেও তার মূল উদ্দেশ্য কুষ্টিয়ার একটি আসন থেকে আগামীতে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন নিয়ে এমপি হওয়া। তাই সরকারকে অস্থিতিশীল করার অপচেষ্টা চালাতে নানামুখী তৎপরতা তারিক আল মামুনের থাকবে এটাই স্বাভাবিক ।
গত ৩১ অক্টোবর থেকে মিরপুর-১০, ১১ ও ১২ নম্বর এলাকায় পোশাকশ্রমিকদের বিক্ষোভ শুরু হয়। পরে রবিবার, সোমবার ও মঙ্গলবার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পুলিশের গাড়িতে আগুন, সড়ক অবরোধ, ভাঙচুর এবং মেট্রোরেল স্টেশন বন্ধ রাখার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়। এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত অর্ধডজনের বেশি মামলা হয়েছে এবং শতাধিক ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছে।
মিরপুরের এই পরিস্থিতির নেপথ্যে কারা অর্থ জোগাচ্ছে, তা নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, আন্দোলনের মাঠপর্যায়ে প্রতিদিন বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। বিক্ষোভে লোকজন জড়ো করা, তাদের খাবার, যাতায়াত ও মোবাইল খরচের জন্য অর্থ সরবরাহ করা হয়েছে। এই অর্থের উৎস অনুসন্ধানে স্থানীয়ভাবে অনেক গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ও জমি ব্যবসায়ীর নাম এসেছে।
যেখানে আর্টিকাল স্ট্রাকচার লিমিটেডের তারিক আল মামুনের সংশ্লিষ্টতার খবর পাওয়া যাচ্ছে স্থানীয়দের কাছে। ঢাকা টাইমসের একাধিক সূত্রেও মিরপুরের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর তারিক আল মামুনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।
সম্পতি প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর ও নাজমুস সাকিব একাধিক সংবাদ প্রকাশ করেছে তারিক আল মামুনকে নিয়েছে। তাছাড়া দেশের একাধিক মূলধারার গণমাধ্যমে তারিকের আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেড এর জমি দখল ও অন্যায় কর্মকাণ্ড নিয়ে একাধিক সংবাদ প্রচার করেছে।
টোকাই থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিকানা কিভাবে এই তারিক আল মামুন অর্জন করলো তা নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন, বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইন্যাশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, আয়কর বিভাগ এবং সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থা পৃথক তদন্ত করছে বলেও সূত্রগুলো ঢাকা টাইমসকে জানিয়েছে । পূর্বাচল, পল্লবী, কুষ্টিয়াসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হাজার হাজার কোটি টাকার জমির মালিক বনে যাওয়া এই তারিক আল মামুন রাজধানীর বনানীর রূপসা টাওয়ারে অন্তত ৭ টি ফ্ল্যাটের যেমন মালিক তেমনি মাটিকাটাসহ বিভিন্ন এলাকায় তার একাধিক ফ্ল্যাট রয়েছে । যা আসলেই রহস্যে ঘেরা । ঢাকা টাইমস এর সূত্রগুলো বলছে, নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের ঢাকা মহানগর উত্তরের সাধারণ সম্পাদক এস এম মান্নান কচিসহ একাধিক নেতার সঙ্গে তারিক মামুনের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে । আর তাদের সঙ্গে বিরাট অঙ্কের বিনিয়োগও তারিক আল মামুনের কাছে আছে বলে একাধিক সূত্রে জানা যাচ্ছে ।
আন্দোলনে অর্থের জোগানদাতা কে?
বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে, মিরপুরের সহিংসতায় মাঠপর্যায়ে অর্থ ছড়ানো হয়েছে। প্রতিদিন ২ থেকে আড়াই হাজার মানুষকে জড়ো করা, তাদের খাবার, যাতায়াত ও মোবাইল খরচের জন্য বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এই অর্থের উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে তারিক আল মামুনের নাম সামনে এসেছে। সূত্রগুলোর দাবি, আন্দোলনকে কেন্দ্র করে একটি পক্ষ শ্রমিকদের দাবিকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ ক্ষেত্রে অর্থের উৎস, মাঠপর্যায়ে কারা লোকজন জড়ো করেছে এবং কারা এসব কর্মকাণ্ডে সমন্বয় করেছে, তা খতিয়ে দেখছে গোয়েন্দারা। তবে তারিকের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য দেয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বুধবার ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম জানিয়েছেন, যারা দেশকে অস্থিতিশীল করা, জনদুর্ভোগ সৃষ্টি, সড়ক অবরোধ, গাড়ি ভাঙচুর ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট করার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তার ভাষ্য, প্রকৃত শ্রমিকেরা কখনো ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডে জড়িত হন না; স্বার্থান্বেষী মহল তাদের উসকানি দিচ্ছে। অপরাধীরা যত শক্তিশালীই হোক, তাদের আইনের মুখোমুখি করা হবে।
আওয়ামী লীগ আমলে উত্থান তারিকের
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, তারিক আল মামুন দীর্ঘদিন ধরে মিরপুর ও পল্লবীকেন্দ্রিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। আওয়ামী লীগের সুবিধা নেওয়া এই ব্যবসায়ী বর্তমান সরকারের আমলে সিটি ক্লাবের সভাপতি হয়েছেন। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরের একটি পল্লিতে জন্ম নেওয়া তারিক জীবিকার সন্ধানে ঢাকায় এসে পল্লবী, মিরপুর ও ক্যান্টনমেন্টসংলগ্ন এলাকায় কাঁকড়া ব্যবসার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতেন বলে সূত্র জানিয়েছে।
পরবর্তী সময়ে স্থানীয় বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তার যোগাযোগ ও সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বিশেষ করে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ এবং তার ভাই রফিকুল ইসলাম চুন্নুর সঙ্গে তারিকের ঘনিষ্ঠতা ছিল। যা এখনও বহাল রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, হানিফ পরিবারের ঘনিষ্ঠজন হিসেবে পরিচিতি পাওয়া তারিক আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেডের ব্যানারে তার ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বিস্তৃত করে। অন্যের জমি দখল, সরকারি জমিতে প্রতিষ্ঠানের ব্যানার টাঙিয়ে প্রভাব বিস্তার এবং বিভিন্ন অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে।
প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগ
নথি ঘেঁটে দেখা গেছে, হানিফ ও তার ভাই ছাড়াও সাবেক সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান, ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মো. মহিউদ্দিন আহমেদ এবং সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই খলিলুর রহমান ওরফে ‘কসাই খলিল’- তারিকের ব্যবসায়ীক পার্টনার ছিল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে এসব প্রভাবশালী ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাকে ব্যবহার করে পল্লবী, মাটিকাটা ও মিরপুর এলাকায় ব্যাপক জমি দখল করেছে তারিকের আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেড। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এসব ব্যক্তির অনেকেই আত্মগোপনে চলে যান। তাদের কয়েকজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মামলাও হয়েছে। তবে তারিক রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে মাহবুব উল আলম হানিফের পরিবারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তারিকের ব্যবসায়িক ও রাজনৈতিক যোগাযোগ বিস্তৃত হয়। বর্তমান শ্রমিক আন্দোলনে তার সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়েও এ কারণে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তারিক আল মামুনকে বর্তমানে সরকারি দলের কারা কারা আশ্রয় দিচ্ছেন বা প্রশাসন ও পুলিশের কাদের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গোয়েন্দারা সেটারও খোঁজ নিচ্ছেন বলে একটি সূত্রে জানতে পেরেছে ঢাকা টাইমস ।
ছবিতে রাজনৈতিক যোগাযোগের ইঙ্গিত
সম্প্রতি তারিক আল মামুনের রাজনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে কয়েকটি ছবি সামনে আসার পর। ঢাকাটাইমসের হাতে আসা ছবিতে পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এবং মাহবুব উল আলম হানিফের ভাই রফিকুল ইসলাম চুন্নুর সঙ্গে তারিককে দেখা গেছে। অন্য একটি ছবিতে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার জন্মদিনের কেক কাটতেও তাকে দেখা যায়। তবে ৫ আগস্টের পর বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির বিভিন্ন নেতার সঙ্গে তারিকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
নিজের সম্পদ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে বর্তমান সরকারের প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ ও সুসম্পর্ক বজায় রাখছেন তারিক আল মামুন। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ আমলে তার সঙ্গে ব্যবসায়িক অংশীদারত্বে যুক্ত হয়ে বর্তমানে পলাতক রয়েছেন, এমন কয়েকজনের কাছেও প্রতি মাসে নিয়মিত অর্থ পৌঁছে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। স্থানীয় বিএনপির মাঠ পর্যায়ের একাধিক নেতাকর্মীর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাব ও রাজনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে উত্থান হওয়া তারিক এখনো বিভিন্ন মহলে নিজের অবস্থান ধরে রাখার চেষ্টা করছেন। তাদের আশঙ্কা, নিজের স্বার্থ রক্ষা ও অতীত শুভাকাঙ্খীদের ফেরত আনতে তারিক বর্তমান সরকারকে বিব্রত ও অস্থিতিশীল করার কর্মকাণ্ডে ইন্ধন জোগাতে পারেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখনো নিরপেক্ষ তদন্ত বা আনুষ্ঠানিক প্রমাণ সামনে আসেনি।
শ্রমিকদের দাবিতে মজুরি বোর্ড, তবু কেন সহিংসতা?
এদিকে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩০ হাজার টাকা করার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ছয় সদস্যের নতুন নিম্নতম মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শ্রমিকদের দাবি পর্যালোচনার জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু মজুরি বোর্ড গঠনের পরও ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও আশুলিয়ার বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে। এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
৪ নভেম্বর ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার মহিদুল ইসলাম জানান, মিরপুরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১০ হাজারের বেশি পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার কার্যক্রম চলছে।
এদিকে মিরপুরে শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা হয়েছে। এসব ঘটনায় গ্রেপ্তারও অব্যাহত রয়েছে। পুলিশের দাবি, শ্রমিক আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কিছু সদস্য নাশকতামূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়েছেন।
শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়ন, রাজনৈতিক যোগাযোগ এবং জমি দখলসংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে তারিক আল মামুনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













