রাজধানীর পল্লবীতে ‘ভূমিদস্যু’ তারিকের পেছনে কোন রাজনৈতিক শক্তি?

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা টাইমস
  প্রকাশিত : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৬:৪৮| আপডেট : ০২ নভেম্বর ২০২৬, ১৭:৩৪
অ- অ+

একসময় আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্যদের ঘনিষ্ঠজন—এখন আবার বিএনপির প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায়! ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে রাজনৈতিক পরিচয় বদলের এমন অভিযোগ উঠেছে রাজধানী ঢাকার মিরপুর পল্লবীর ভূমিদস্যু তারিক আল মামুনের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, একসময় সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফের পরিবার, ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এবং বরখাস্ত (কারান্তরীণ) সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে পল্লবী-ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় জমি দখলের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন তিনি। তার প্রতিষ্ঠানের নাম ‘আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেড’। আর ৫ আগস্টের পর সেই নেটওয়ার্কেরই রাজনৈতিক আশ্রয় বদলে গেছে—এবার সামনে এসেছে বর্তমানে ক্ষমতাসীন বিএনপির কয়েকজন নেতার নাম।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারিক আল মামুনের সঙ্গে পল্লবীর প্রভাবশালী একজন বিএনপি নেতা, একজন প্রতিমন্ত্রীর ভাই মঈনুল হক মঈন এবং বিএনপির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ কয়েকজনের যোগাযোগের অভিযোগ সামনে এসেছে। এমনকি বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে দলটির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তারিকের ছবি নিয়েও চলছে আলোচনা।

লল্ডন প্রবাসী অনুসন্ধানী সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝরও সামাজিক মাধ্যমে ভূমিদস্যু তারিক আল মামুনের জমি দখলের আদ্যোপান্ত প্রকাশ করেছেন। যা নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে বিভিন্ন মাধ্যমে।

স্থানীয়রা বলছে, ক্ষমতার ছায়া বদলালেও পল্লবী-মিরপুরে জমি দখলের কারবার থামেনি; বরং নতুন রাজনৈতিক আশ্রয়ে তা আরও বিস্তৃত হয়েছে।

তারিক আল মামুনের মালিকানাধীন আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেডকে ঘিরে সরকারি-বেসরকারি জমি দখল, খাল ভরাট, প্লট বিক্রি, জাল দলিল তৈরি এবং প্রভাব খাটানোর একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অভিযোগের পক্ষে বিভিন্ন নথি, অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ঢাকাটাইমসের হাতে এসেছে।

তারিকের বিরুদ্ধে ভূরিভূরি অভিযোগ থাকলেও তার কথিত সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না অনেকে। এমনকি নাম প্রকাশ করে অভিযোগ জানানো কিংবা সরাসরি কথা বলতেও অনীহা প্রকাশ করছেন ভুক্তভোগীরা। ভূমিদস্যু তারিককে নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।

কারা ছিলেন আর্টিকেল স্ট্রাকচারের মালিকানায়?

প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেডের চেয়ারম্যান মো. রফিকুল আলম চুন্নুর ২৭০০ শেয়ার ছিল। তিনি আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফের বড় ভাই। আর শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে তারিক আল মামুন কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)। তিনি ২৬০০ শেয়ারের মালিক। তার বাড়ি কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে। চলাফেরাও করেন সশস্ত্র দেহরক্ষী নিয়ে।

অন্য শেয়ারহোল্ডার মো. খলিলুর রহমান ওরফে ‘কসাই খলিল’। তিনি কোম্পানির পরিচালক এবং শেয়ার ২৫০০। তার বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

এ ছাড়া কোম্পানির পরিচালক মো. মহিউদ্দিন আহমেদ-এর ২২০০ শেয়ার ছিল। তিনি ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। আর্টিকেল কোম্পানিটির প্রধান কার্যালয় বনানীর রূপসা টাওয়ারে এবং একটি কার্যালয় পশ্চিম মাটিকাটা, ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় বলে প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে। ২০২৩ সালের জুলাই থেকে কালশী, পল্লবী ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় তাদের ব্যবসায়িক কার্যক্রম শুরু হয়।

একাধিক সূত্র ঢাকাটাইমসকে নিশ্চিত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনে ভূমিদস্যু তারিকের বিষয়ে একাধিক অভিযোগ রয়েছে। যা নিয়ে দুদক কাজ করছে।

কালশী খাল ভরাট থেকে প্লট বিক্রির অভিযোগ

আর্টিকেল স্ট্রাকচারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো— কালশী খাল দখল ও ভরাট করে সেটিকে প্লট আকারে বিক্রি। ঢাকাটাইমস অনুসন্ধান বলছে, স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের জমিও এই দখল প্রক্রিয়া থেকে রেহাই পায়নি। কৃষক লীগের তৎকালীন কেন্দ্রীয় সহসভাপতি মাকসুদুল ইসলাম মাসুদের জমিতে প্রতিষ্ঠানটির (আর্টিকেল স্ট্রাকচার) সাইনবোর্ড লাগিয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

তাছাড়া স্থানীয় চিকিৎসক ডা. এ এম শাহাবুদ্দিনের জমি জোরপূর্বক দখলে রাখার অভিযোগ রয়েছে আর্টিকেল স্ট্রাকচারের বিরুদ্ধে।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের একজন সার্ভেয়ার তাসলিম হোসেন একাধিকবার সরকারি জমি ভরাটে নিষেধ করেছিলেন। কিন্তু সেই নিষেধ অমান্য করে সরকারি সম্পত্তি ভরাট এবং পরবর্তীতে কথিত ভুয়া দলিলের মাধ্যমে প্লট বিক্রি করে আসছে এই প্রতিষ্ঠানটি।

সূত্র বলছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ১৫ নম্বর ওয়ার্ডের তৎকালীন কাউন্সিলরের জমিও ২০২৪ সালের ২৭ মে আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেডের পরিচালক মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে দখল করেছিলেন। পরে সেখানে একজন সেনা কর্মকর্তার নাম ব্যবহার করে সাইনবোর্ড টাঙানো হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য, মহিউদ্দিন নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক এপিএস গাজী হাফিজুর রহমান লিকুর ছোট ভাই হিসেবে পরিচয় দিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করতেন।

ক্ষমতার পালাবদল, বদলে গেল রাজনৈতিক ঠিকানাও?

৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তারিক আল মামুনের রাজনৈতিক অবস্থান বদলের বিষয়টি এখন প্রকাশ্যে। অভিযোগ আছে, আওয়ামী লীগের সময় যাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা ছিল, সরকার পরিবর্তনের পর তাদের জায়গায় বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা ও তাদের ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলেন তারিক।

এই সূত্রে সামনে এসেছে প্রভাবশালী একজন প্রতিমন্ত্রী, পল্লবীর সিটি ক্লাব সাধারণ সম্পাদক মঈনুল হক মঈন এবং বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে পরাজিত একজন সাবেক ছাত্র নেতা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মঈনুল হক মঈনের সঙ্গে আর্টিকেল স্ট্রাকচারের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে এবং অর্থের বিনিময়ে তারিককে পল্লবীর সিটি ক্লাবের সভাপতি করা হয়েছে। বর্তমানে মঈনুল হক মঈন ওই ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ভাওয়াল এস্টেটের শত শত কাঠা জমি নিয়ে প্রশ্ন

সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, পল্লবীর কামাল মজুমদার ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় ভাওয়াল এস্টেটের বিপুল জমি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ রয়েছে। এরইমধ্যে ভাওয়াল রাজ এস্টেটের প্রায় সাড়ে তিনশ কাঠা জমি বিভিন্নভাবে হাতবদলের প্রক্রিয়ায় গেছে। এসব জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠায় ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে ভূমি সংস্কার বোর্ডের কোর্ট অব ওয়ার্ডসে আবেদন করার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মকর্তাকে প্রভাবিত করে কাঠাপ্রতি কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়ে জমি খারিজ করানোর পর তা ব্যক্তিমালিকানায় নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

গৃহায়ণের জমিতে বাউন্ডারি, প্লট বিক্রির অভিযোগ

কালশী-ইসিবি সড়কের পাশে প্রায় এক হাজার কাঠা জমিতে বাউন্ডারি দিয়ে প্লট বিক্রির অভিযোগও উঠেছে আর্টিকেল স্ট্রাকচারের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, এর মধ্যে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের জমিও রয়েছে। সড়কের অপর পাশে বস্তিবাসীদের পুনর্বাসন প্রকল্পসংলগ্ন এলাকায়ও প্রতিষ্ঠানটির দখলের অভিযোগ রয়েছে।

পরবর্তীতে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সেখানে প্রায় ১৭৮ কাঠা জমি উচ্ছেদ করে। এরপর ওই জমি নিয়ে বিভিন্ন দলিলের ভিত্তিতে আদালতে মামলা করা হয়েছে।

একইসঙ্গে বাউনিয়া বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের পর জমি দখলের অভিযোগও উঠেছে। এসব অভিযোগ নিয়ে সংসদে কথা বলেন জামায়াতের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি কর্নেল (অব.) আব্দুল বাতেন। তারপরেই নড়েচড়ে বসে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

সেনা কর্মকর্তাদের জমি দখলের অভিযোগ, সেনাপ্রধানকে চিঠি

আর্টিকেল স্ট্রাকচারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নথি হিসেবে সামনে এসেছে সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে সেনাপ্রধানের কাছে পাঠানো একটি লিখিত আবেদন।

২০২৪ সালের ১২ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মাসরুর উল্লাহর পক্ষে নাহিদুল ইসলাম খান স্বাক্ষরিত ওই আবেদনে বলা হয়, ১৫ জন সেনা কর্মকর্তা ও তাদের পরিবার-পরিজন বাউনিয়া মৌজায় মোট ২২ দশমিক ৪ কাঠা জমি ২০১৪ সালে ক্রয় করেন।

আবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৩ সালে আর্টিকেল স্ট্রাকচার প্রথমে মাটি ভরাটের কাজ শুরু করে। পরে রাতারাতি জমি ঘেরাও করে সেনা কর্মকর্তাদের সাইনবোর্ড সরিয়ে দেওয়া হয়।

চিঠিতে দাবি করা হয়, স্থানীয় সূত্রে তারা জানতে পারেন—বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান এবং তৎকালীন কুষ্টিয়ার সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফের ভাইয়ের প্রভাব কাজে লাগিয়ে ওই প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছিল। সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জমি দখলমুক্ত করতে সেনা কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও চাওয়া হয়— আবেদনে।

জাল দলিলের অভিযোগ, তদন্তে সিআইডি

আর্টিকেল স্ট্রাকচারের বিরুদ্ধে আরও একটি গুরুতর অভিযোগ হলো ভুয়া দলিল ব্যবহার করে জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা।

অভিযোগকারীদের দাবি, একটি দলিলের তারিখ ৭ জানুয়ারি ১৯৩৭ দেখানো হলেও দলিলগ্রহীতা চুন্নু মিয়ার জন্মতারিখ ১ জানুয়ারি ১৯৪৭। অর্থাৎ দলিলের তারিখের প্রায় ১০ বছর পর তার জন্ম—যা দলিলটির সত্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। এ ছাড়া দলিল নম্বর ১১২ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের ভলিউমে খুঁজে পাওয়া যায়নি বলেও দাবি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে সিআর মামলা নম্বর ১৭৯/২০২৪-এর তদন্তে সিআইডি বিষয়টি খতিয়ে দেখেছে।

একই মামলায় ‘কামিলা বিবি’, ‘পামিলা বিবি’, ‘আমিনা বিবি’ ও ‘কামিনা বিবি’ নামে একাধিক পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগও করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে ২০২৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি একটি স্মারকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট ওয়ারিশান সনদ বাতিল করা হয়।

একতরফা রায়ের অভিযোগ

জমির মালিকানা নিয়ে দেওয়ানি মোকদ্দমা নম্বর ৬৮১/২০২২-এর রায় ও ডিক্রি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।

তাদের দাবি, প্রকৃত মালিকদের যথাযথভাবে অবহিত না করে মামলাটি পরিচালনা করা হয়েছে এবং একতরফা সূত্রে রায় ও ডিক্রি নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রকৃত মালিকরা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্ত ও আইনগত প্রতিকার চেয়েছেন।

মঈনুল হক মঈনকে ঘিরেও অভিযোগ

পল্লবীতে জমি দখল ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগে মঈনুল হক মঈনের নাম সামনে এসেছে। তিনি পল্লবীর সিটি ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ছাড়াও মিরপুর বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি এবং মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরি ইনস্টিটিউটের গভর্নিং বডির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। ঘটনাচক্রে মঈন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের ভাই।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মঈনুলের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক অনুসারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির যোগাযোগ রয়েছে। জমি দখলসহ বিভিন্ন ঘটনায় তার নাম উঠে এলেও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না—এমন অভিযোগও রয়েছে।

মঈনুলের মাধ্যমে ভুক্তভোগী হয়েছেন রূপনগর আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মো. ইয়াছিন বেগ। ঢাকাটাইমসকে তিনি বলেন, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে ১৯৯৯ সালের ২৩ মার্চ দলিল নম্বর-১৭০৯-এর মাধ্যমে মিরপুর রূপনগর আবাসিক এলাকার রোড নম্বর-১৩-এর ২৬ নম্বর প্লটের নামজারি তার নামে করা হয়। এরপর সেখানেই বসবাস করে আসছেন। তিনি জানান, দীর্ঘ ২৭ বছর পর জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সোয়েব আহসান তার বাড়ির ওপর নজর দিয়ে ভুয়া কাগজপত্রের মাধ্যমে আগের নামজারি বাতিল না করেই একই বাড়ির পুনরায় নামজারি করিয়েছেন। পরবর্তীতে প্রতিমন্ত্রীর ভাই মঈন ও তার দলবল বাড়ি ভেঙে গুড়িয়ে দেয়। ওই বাড়িতে থাকা প্রায় অর্ধশতাধিক ভরি স্বর্ণালঙ্কারসহ ঘরের আসবাবপত্র লুট করা হয়। বিষয়টি থানা পুলিশকে অবগত করা হলেও মঈনের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

আন্ডারওয়ার্ল্ডের ছায়ায় তারিক ও অন্যরা

জমি দখলকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সন্ত্রাসীগোষ্ঠীকে ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অনেকে ঢাকাটাইমসকে জানিয়েছেন, বিদেশে অবস্থানরত কয়েকজন শীর্ষ সন্ত্রাসীর স্থানীয় সহযোগীদের মাধ্যমে জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা হয়। তাদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত মামুন, ইউরোপে থাকা ইব্রাহিম এবং নেপালে অবস্থানরত শাহাদাতের নাম এসেছে।

তবে এসব ব্যক্তির সঙ্গে আর্টিকেল স্ট্রাকচার বা তারিক আল মামুনের সরাসরি সম্পৃক্ততার স্বাধীন প্রমাণ ঢাকাটাইমসের হাতে আসেনি।

ছবিতে পুরোনো-নতুন দুই বলয়েরই সখ্য

তারিক আল মামুনকে ঘিরে রাজনৈতিক যোগাযোগের বিষয়টি আরও আলোচনায় আসে বিভিন্ন ছবিকে কেন্দ্র করে। ঢাকাটাইমসের হাতে আসা ছবিতে পলাতক সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা এবং মাহবুব উল আলম হানিফের ভাই রফিকুল ইসলাম চুন্নুর সঙ্গে তারেককে দেখা যায়। আরেকটি ছবিতে আওয়ামী লীগ নেতাদের সঙ্গে শেখ হাসিনার জন্মদিনের কেক কাটতেও তাকে দেখা যায়।

আবার ৫ আগস্টের পর বিএনপির একটি অনুষ্ঠানে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব (বর্তমান রাষ্ট্রপতি) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকসহ দলটির নেতাদের সঙ্গে তারিকের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এই ছবি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠেছে— ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে কি বদলে গেছে তারিকের রাজনৈতিক আশ্রয়ও?

তবে অভিযোগ বিষয়ে জানতে সোমবার দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে প্রতিমন্ত্রীর ব্যবহৃত হোয়াটস অ্যাপ নম্বরে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। তবে তিনি সাড়া দেননি।

রাড্ডা-কাণ্ডের পর সামনে এলো পুরোনো অভিযোগ

মিরপুরের রাড্ডা মা ও শিশুস্বাস্থ্য কেন্দ্র গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তাপ তৈরি হওয়ার পর তারিক আল মামুনের পল্লবীতে জমি দখলের অভিযোগগুলোও সামনে আসে। এরপর ইসিবি এলাকায় একই ধরনের ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে। এসব ঘটনার সূত্র ধরে স্থানীয়দের পুরোনো অভিযোগ ও বিভিন্ন জমির নথি পর্যালোচনা করতে গিয়ে আর্টিকেল স্ট্রাকচার লিমিটেড ও তারিক আল মামুনের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগের তথ্য পাওয়া যায়।

এদিকে বনানীর রুপসা টাওয়ারে তারিক আল মামুনের ১০/১২ টা ফ্ল্যাট রয়েছে। যার মধ্যে অর্ধেক কেনা এবং বাকি ফ্ল্যাট ভাড়ার নিয়ে দখলে রেখেছে। এতে জিম্মি দশায় ফ্ল্যাট মালিক। রুপসা টাওয়ার মালিক সমিতির বর্তমান সাধারণ সম্পাদক তারিক আল মামুন।

দৌলতপুরের স্থানীয়রা জানিয়েছে, একসময় ঠিক মতো দু-মুখো ভাত জুটতো না তারিক আল মামুনের পরিবারের। পরে ঢাকায় এসে টিউশনি করে এবং অন্যের বাড়িতে লজিং থেকে জীবন-যাপন করত। পরবর্তীতে পল্লবী, মাটিকাটা এলাকায় কাঁকড়া ব্যবসার মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পরিচিত ছিল। বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের সান্নিধ্যে এসে হয়ে যান হাজার কোটি টাকার মালিক।

সূত্র বলছে, আওয়ামী লীগ সরকারের অনেক এমপি-মন্ত্রীর সঙ্গে উঠাবসা ছিল তারিকের। বিশেষ করে মাহবুবউল আলম হানিফ, তার ভাই রফিকুল আলম, কুষ্টিয়া দৌলতপুরের পলাতক সাবেক এমপি সারোয়ার জাহান বাদশা ও রেজাউল হক চৌধুরী, কুষ্টিয়া-২ আসনের (ভেড়ামারা ও মিরপুর) কামারুল আরেফিন অন্যতম। পলাতক এসব এমপিদের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যবহৃত রয়েছে তারিকের। একইসঙ্গে প্রতিমাসে পাশ্ববর্তী দেশে অবৈধ উপায়ে পাঠিয়ে দিচ্ছেন মোটাঅঙ্কের টাকা।

তাছাড়া নামে-বেনামে কুষ্টিয়ার বিভিন্ন জায়গায় ফ্ল্যাট, বাড়ি, জমি কিনেছে তারিক আল মামুন। যেগুলো তার আয়কর ফাইলে উল্লেখ নেই। প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার মালিক তারিককে নিয়ে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ একাধিক সংস্থা তদন্ত করছে।

তবে তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তারিক আল মামুন। তিনি বলেন, ‘এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। আমি কখনো কারও জমি দখল করিনি। আমি ঋণখেলাপিও নই।’

বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্কের বিষয়ে তারিক বলেন, ‘একসময় বিএনপির নেতারা আমার সঙ্গে ব্যবসা করতেন। ব্যবসায়িক স্বার্থেই এতদিন তারা আড়ালে ছিলেন। সে সময় আওয়ামী লীগ ঘরানার অংশীদারদের সামনে রাখা হয়েছিল। বর্তমানে তারা পলাতক থাকায় বিএনপিপন্থিদের সঙ্গে নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছি।’

তিনি বলেন, ‘জিয়াউল আহসানকে আমি চিনি না। তার সঙ্গে কোনোদিন যোগাযোগও হয়নি।’ বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ছবি প্রসঙ্গে তারিক বলেন, আমি সিটি ক্লাবের সভাপতি। সে হিসেবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যায়। ছবি থাকা তো দোষের কিছু না।’

তারিককে নিয়ে একাধিক গণমাধ্যমে খবর:

https://shorturl.at/fF5p6

https://shorturl.at/7kAs3

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
‘কোনোভাবেই অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের উদ্দেশ্য সফল হতে দেওয়া হবে না’: ডিআইজি
বেকারত্ব দূরীকরণে টিটিসি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে: এমপি বাদশা
মিরপুরে দুই পোশাক কারখানায় হামলা-ভাঙচুর, নিরাপত্তাকর্মী আহত
মাদারীপুরে গৃহবধূর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার, স্বামী আটক