নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখতে হবে

জহির রায়হান
| আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৭, ২১:২৬ | প্রকাশিত : ০৯ মার্চ ২০১৭, ১৬:০৮
ইসমাত জেরিন খান

ইসমাত জেরিন খান। জারমাটজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই)স্ট্যান্ডিং কমিটির কো-চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।বাবা মরহুম এম এ মালেক খান ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। বাবাকে দেখেই উদ্যোক্তা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তিনি এখন সফল উদ্যোক্তা। বাংলাদেশের নারীদের ব্যবসায় অগ্রগতি, ব্যবসায় নারীদের সুযোগ-সুবিধা বা উদ্যোক্তা হতে গেলে নারীদের কী করা প্রায়োজন-এসব বিষয় নিয়ে ঢাকাটাইমসের সঙ্গে কথা বলেছেন ইসমাত জেরিন। সাক্ষাতকার নিয়েছেন  জহির রায়হান

ঢাকাটাইমস: নারীদের ব্যবসা করার ক্ষেত্রে কী সুবিধা দিচ্ছে সরকার?

ইসমাত জেরিন খান: বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ। আর এই সম্ভাবনার দেশে অর্ধেকের বেশি নারী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে ২০২১ সালের মধ্যে মিলেনিয়াম গোল অর্জনের চিন্তা করা হচ্ছে। সেখানে নারীদের উন্নয়ন না করা হলে বর্তমান সরকারের অর্জন থেমে যাবে। এই বিষয়টা আমাদের প্রধানমন্ত্রী বুঝেই নারীদের একত্রিত করার চেষ্টা করছেন। নারীদের এগিয়ে নিতে প্রধানমন্ত্রী সব চেষ্টাই করছেন।

ঢাকাটাইমস: নারী উদ্যোক্তা হিসেবে কী ধরনের সুবিধা পাচ্ছেন আপনি?

ইসমাত জেরিন খান: আমার ব্যবসা হচ্ছে বহুমুখী পাটপণ্যের। মার্চের ৯ থেকে ১১ তারিখে আমাদের একটি মেলা আছে। সেই মেলায় আমরা যারা নারী উদ্যোক্তা আছি সেখানে আমাদের অংশগ্রহণ বেশি থাকবে। জুট ডাইভারসিফিকেশন প্রমোশন সেন্টার (জেডিপিসি) এ মেলা করছে। আমরা যারা স্টল নিচ্ছি তারা একটা ছাড় পাচ্ছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অনেক সুযোগ দিচ্ছেন নারী উদ্যোক্তাদের। ইকোনোমিক জোনে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্পেসাল জায়গা রাখার কথা বলা হয়েছে। এসএমই উদ্যোক্তা যারা আছেন তাদের সিঙ্গেল ডিজিটে লোন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ইপিবির মাধ্যমে আমরা যারা বাইরে মেলা করতে যাই সেখানেও আমাদের বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়। নারীদের এ সুযোগ সুবিধা কিন্তু সরকার দিচ্ছে। এখন নারীদের এগিয়ে আসতে হবে। নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য স্বপ্ন দেখতে হবে। স্বপ্ন দেখাটাই গুরুত্বপূর্ণ।

ঢাকাটাইমস: ব্যবসা ক্ষেত্রে নারী কতটা এগিয়েছে, আর এগিয়ে যাওয়ার এই পথ সহজ ছিল কি না?

ইসমাত জেরিন খান: নারীদের এগিয়ে যাওয়ার পথটা কখনই সহজ ছিল না। এখনও সহজ নয়। অনেক প্রতিবন্ধকতা পার হয়েও নারীরা এগিয়ে আসছে। তবে এখন সরকার নারীদের যেভাবে সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে তাতে নারীদের এগিয়ে না আসার আর কোনো কারণ নেই।

ঢাকাটাইমস: ব্যবসা করার ক্ষেত্রে নারীরা পারিবারিক বাঁধার মুখে পড়ছে?

ইসমাত জেরিন খান: পারিবারিক যে সমস্যা ছিল সেটা কিন্তু অনেকটা কেটে ওঠা সম্ভব হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সমস্যা এখনও রয়ে গেছে।

ঢাকাটাইমস: ব্যবসা করার ক্ষেত্রে যে তথ্য প্রয়োজন সেগুলো সহজে পাওয়া যায়?

ইসমাত জেরিন খান: ব্যবসা বাড়ানোর জন্য অনেক তথ্য দরকার হয়। কিন্তু আমাদের কোনো রিসার্স সেল নেই। বাংলাদেশে এ নিয়ে এখনও কোনো গবেষণা নেই। আমাদের আইটি সেক্টরের অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এখনও এমন কোনো সার্ভার আথবা সফটওয়্যার তৈরি হয়নি যাতে ব্যবসার সকল তথ্য আমরা পাবো।

ঢাকাটাইমস: নারী উদ্যাক্তারা ব্যাংকঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে কী সুবিধা পাচ্ছে?

ইসমাত জেরিন খান: ব্যাংক এ ক্ষেত্রে ঋণ দিচ্ছে। কিন্তু নারীদের যারা নতুন ‍উদ্যোক্তা হিসেবে এগিয়ে আসছে তারা অনেকেই জানে না কীভাবে ঋণ পাওয়ার জন্য আবেদন করতে হয়। ব্যাংকেরও দুর্বলতা রয়েছে। ব্যাংকের লোকেরা সরাসরি ক্লাইন্টের সঙ্গে সময়টা দেন না। আবার নারীরা এখনও ওইভাবে নিজেদের তৈরি করতে পারেনি। এছাড়া ট্রেড লাইসেন্স আপডেট করা, ভ্যাট কাগজ আপডেট করা। তাদের লোন পাওয়ার জন্য যে কাগজ দরকার সেগুলো অনেক সময় ঠিক থাকছে না।

ঢাকাটাইমস: এসব ক্ষেত্রে কি ব্যবসা সংগঠন ভূমিকা রাখতে পারে?

ইসমাত জেরিন খান: সংগঠন একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।তাই নারী উদ্যোক্তাদের  একটা ফোরামের মধ্যে নিয়ে আসতে হবে। কারণ একজন ব্যবসায়ী সামনের দিকে এগোতে চাইলে অ্যাসোসিয়েশনের গুরুত্ব কিন্তু অনেক বেশি। নারী উদ্যোক্তাদের অ্যাসোশিয়েশনের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

ঢাকাটাইমস: সিঙ্গেল ডিজিতে ঋণ নেয়ার সুযোগ কি গ্রামীণ নারীরা পাচ্ছে?

ইসমাত জেরিন খান: প্রত্যন্ত অঞ্চলের নারীরা এখনও এই (১০শতাংশের নিচে সুদ) সুবিধা পাচ্ছে না। যারা ঢাকাকেন্দ্রিক তাদের অনেক লবিং থাকে, তাদের অনেক লোকজন থাকে। যারা ঢাকার বাইরে থাকে তারা আসলে সঠিক চ্যানেলের মধ্য দিয়ে আসতে পারছে না। যে কারণে ঐ লোনটা পাওয়া তাদের জন্য সহজ হচ্ছে না। কারণ এখনও অনেক ব্যাংক গ্যারান্টার চায়। অনেকেই সেটা দিতে পারেন না। কিছু কিছু ব্যাংক এখনও মরগেজ চায়। আমাদের দেশ তো শুধু ঢাকা কেন্দ্রিক নয়। ৬৪টি জেলা কেন্দ্রিক বাকি জেলাগুলোকে এগিয়ে নিতে হলে ব্যাংকের যে সমস্যা আছে সেগুলো অবশ্যই কাটিয়ে উঠতে হবে।

ঢাকাটাইমস: ব্যাংক লোন নিতে গেলে স্বামীর পরিচয় দেওয়া বাধ্যবাধকতা আছে কি না?

ইসমাত জেরিন খান: এখন অনেক পরিবর্তন হচ্ছে। লোন পাওয়ার ক্ষেত্রে সব ডকুমেন্ট ঠিক থাকলে তখন অটোমেটিক আপনার উপর ব্যাংক ভরসা করবে। সে লোন দিতে চাইবে। কারণ এখন  অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান আছে যারা ফোন দিয়ে লোন দিতে চায়। কিন্তু ডকুমেন্ট ঠিক না থাকার কারণে তারা লোন দিতে পারছে না। স্বামীর পরিচয় তেমন একটা বিষয় না।

ঢাকাটাইমস: এক্ষেত্রে  গ্রামীণ নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কী করা প্রয়োজন

ইসমাত জেরিন খান: উদ্যোক্তা হতে হলে তাকে আগে সচেতন হতে হবে ।তার লোন পাওয়ার জন্য কাগজপত্র ও ডকুমেন্টগুলো ঠিক আছে কি না দেখতে হবে। বিষয়গুলো ঠিক থাকলে ব্যাংক লোন না দিলে তখন সে ঢাকায় এসে প্রধান কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারবে।

ঢাকাটাইমস: নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সরকারি ও বেসরকারি ট্রেনিং সেন্টার আছে কি না?

ইসমাত জেরিন খান: নারীদের উদ্যোক্তা বানাতে ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা বাংলাদেশ সরকার অনেক বেশি করছে। আমি কয়েক দিন আগে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে কাজ করেছি নারী উদ্যোক্তাদের নিয়ে।এসএমই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমেই আমি এশিয়ান প্রডাক্টিভিটি অরর্গানাইজেশন (এপিও) এবং আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও)  নারী উদ্যোক্তাদের ট্রেইনার। আমাদের দিয়ে কিন্তু অনেক ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এসএমই ফাউন্ডেশন নারী উদ্যোক্তাদের ব্যাংক লোন পাওয়ার জন্য বিভিন্ন ট্রেনিং দিচ্ছে। তবে সেটি যথেষ্ট নয়। আমদের যে পরিমাণ নারী উদ্যোক্তা আছে বা যারা আগ্রহ প্রকাশ করছে ব্যবসায় আসার জন্য। তার জন্য  আরো বেশি ট্রেনিংয়ের আয়োজন করতে হবে।

ঢাকাটাইমস: বাংলাদেশে নারীরা কাজের ক্ষেত্রে কতুটুকু নিরাপদ

ইসমাত জেরিন খান: নিরাপত্তার জায়গা ভিন্ন ইস্যু। আপনাকে কাজ করতে গেলে চ্যালেঞ্জ নিতেই হবে। তা না হলে তো আসলে সামনে আগানো যাবে না।

ঢাকাটাইমস: নারী উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে সরকারের প্রতি আপনার  পরামর্শ

ইসমাত জেরিন খান: সরকার তো আসলে অনেক কাজ করছে।তবে মনিটরিং বাড়ানো দরকার। যে ফান্ডগুলো নারীদের জন্য আসছে যে ফান্ডগুলো অ্যাসোসিয়েসন বা বিভিন্ন চেম্বারের মাধ্যমে আসছে।সেটা প্রান্তিক নারীদের কাছে পৌঁছেছে কি না, মাঝামাঝি কোনো গোষ্ঠি সে সুযোগগুলো নিয়ে নিচ্ছে কি না- সকরারকে তা মনিটরিং করতে হবে।

ঢাকাটাইমস: আপনার প্রতিষ্ঠান নিয়ে কী ইচ্ছে

ইসমাত জেরিন খান:  আমার প্রধান ইচ্ছে হচ্ছে বাংলাদেশের পণ্যকে বিশ্বের দরবারে পরিচিত করা। বিশেষ করে পাটজাত পণ্য এবং হাতে তৈরি পণ্য।

ঢাকাটাইমস: পাটজাত পণ্যের চাহিদা কেমন?

ইসমাত জেরিন খান: বাংলাদেশ এখন সব সেক্টরেই মোটামুটি ভালো করছে। সে দিক থেকে এখন বাংলাদেশ সরকার চাচ্ছে পাটকে এগিয়ে নিতে। এটি একটি চ্যালেঞ্জের বিষয় পাট দিয়ে নতুন নতুন পণ্য তৈরি করা। আমাদের পাটের ব্যবহার আরো বাড়াতে হবে।আমরা এখন বিদেশে পাট নিয়ে কাজ করছি কিন্তু আমি মনে করি দেশীয় পণ্য দেশের মানুষের বেশি কেনা উচিত। কারণ দেশের মানুষের ভালোবাসা বেশি থাকলে বাইরের মানুষের ভালোবাসাও বেড়ে যাবে। আর পাটজাত পণ্যের চাহিদা প্রচুর।

ঢাকাটাইমস: নারী উদ্যাক্তাদের উদ্দেশে কিছু বলুন

ইসমাত জেরিন খান: সকল নারীদের প্রতি একটি আহবান থাকবে- যারা উদোক্তা হতে চান তারা নিজেদের প্রতি আস্থা রাখুন এবং নিজেদের তৈরি করুন। উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য নিজে তৈরি হয়ে গেলে সব কাজ এমনিতেই হয়ে যাবে।

ঢাকাটাইমস: আপনাকে ধন্যবাদ।

ইসমাত জেরিন খান: আপনাকেও ধন্যবাদ

(ঢাকাটাইমস/৯মার্চ/জেআর/জেডএ)

সংবাদটি শেয়ার করুন

অর্থনীতি বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন ফিচার বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত