সূফিকবির সমাধিতে ঠাঁই আড়াইশ বছরের কাঁঠালবৃক্ষ

কাজী রফিক, ঢাকাটাইমস
| আপডেট : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:৫৭ | প্রকাশিত : ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৮:১৪

মধ্যযুগের বিস্মৃতপ্রায় অনেক কবির একজন রংপুরের পীরগঞ্জের কাজী হেয়াত মামুদ। যতোটা না কাব্যের কারণে তারও বেশি তার পরিচয় রয়েছে সূফিসাধক হিসেবে। তার মৃত্যুর পর অন্তত আড়াইশ বছর পার হয়েছে। কিন্তু এই সাধক কবির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা-ভালোবাসার ভাটা পড়েনি। তাকে ঘিরে লোকমুখে প্রচলিত নানা গল্পগাথা। এসবেরই যেন সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি কাঁঠালবৃক্ষ। কবির সমাধির পাশে এই বৃক্ষটিও সমানে ভালোবাসার পাত্র তার ভক্ত-অনুরাগীদের কাছে।

ধারণা করা হয়, ১৬৮০ থেকে ১৭০০ সালের মধ্যে পীরগঞ্জের ঝাড়বিশিলা গ্রামে জন্ম নেন হেয়াত মামুদ। আর ১৭৬০ থেকে ১৭৬৫ সালের কোনও এক সময়ে তার মৃত্যু হয়। তার সমাধি হয় মৃত্যুর পর। অনেক বছর অবহেলায় থাকার পর ১৯৭৩ সালে সমাধিটি সংস্কার করে গনপূর্ত বিভাগ।

রংপুর জেলার লালদিঘী বাজারের বিপরীতে গ্রামের ভেতর দিয়ে পাকা সড়ক। এই সড়ক ধরে সবুজে ঘেরা শ্যামল বনানীর মধ্য দিয়ে ১২ কিলোমিটার গেলে চেত্রকোল ইউনিয়নের একটি গ্রাম ঝাড়বিশিলা। আর সেখানেই চিরনিদ্রায় শায়িত কবি কাজী হেয়াত মামুদ। সমাধির সামনে লেখা ‘কবি হেয়াত মামুদ (রঃ) পবিত্র মাজার শরীফ’। মূলত স্থানীয়রা তাকে কবি নন, চেনেন আধ্যাত্মিক সাধক এবং পীর হিসেবে।

প্রচলিত রয়েছে, স্থানীয় এক ব্যক্তি কাজী হেয়াত মামুদের মৃত্যুর পর তাকে নিয়ে কটূক্তি করেন। এক রাতে তিনি স্বপ্নে দেখতে পান সাধক হেয়াত মামুদ তার কবরের পেছনে কাঁঠাল গাছটি তাকে কেটে ফেলতে বলছেন। পরদিন সকালে একথা ছড়িয়ে পড়ে। স্বপ্নাদিষ্ট ওই ব্যক্তির কথা মতো কেটে ফেলা হয় সমাধির পেছনের কাঁঠাল গাছটি।

কিন্তু এক রাতের ব্যবধানেই পুনরায় পূর্বের স্থানে গাছটি গজিয়ে ওঠে। শুধু তাই নয় গাছভর্তি পাকা কাঁঠাল। এই ঘটনা হেয়াত মামুদের অলৌকিক কীর্তি বলে স্থানীয়দের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। যারা তাকে নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন তারাও সাধকের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে শুরু করেন।

ওই ঘটনার পর থেকে সমাধির পাশে সেই কাঁঠালবৃক্ষটিও পরম যত্নে এবং সমাদরে ঠাঁই দাঁড়িয়ে রয়েছে। নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় গাছের আশপাশ। গাছটির দিকে তাকালে সহসা কেউ এর বয়স আন্দাজ করতে পারবে না। যদিও স্থানীয়দের বিশ^াস এটির বয়স কমপক্ষে আড়াইশ বছর হবে। প্রায় বিশ ফুট উচ্চতার গাছটির ডাল-পালাও তেমন ছড়ানো ছিটানো না।

প্রতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি এই সমাধি ঘিরে জমে ওঠে ভক্ত-অনুরক্তদের মিলনমেলা। নানা প্রান্ত থেকে আগত মানুষ সাধক-কবির প্রতি নিবেদন করেন তাদের শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

জানা যায়, হেয়াত মামুদের বাবা শাহ কবীর ছিলেন ওই সময়কালের সরকারের দেওয়ান। বাবার পর তিনি স্থানীয় কাজী হিসেবে কর্মরত ছিলেন। কাজী হওয়ার পাশাপাশি সূফিকবিতায় নিজের দর্শনকে প্রকাশ করেন তিনি। সেসব লেখনির বেশ কিছু এখনও পাওয়া যায়।

সুদীর্ঘকাল ধরে হেয়াত মামুদের বংশধররা পূর্বপুরুষের সেই ভিটে আগলে রেখেছেন। বর্তমানে সেই বাড়িতে বংশধর কাজী আব্দুল মান্নান দুই স্ত্রী, দুই সন্তান আর পাঁচ নাতনি নিয়ে বাস করছেন। কীর্তিমান হেয়াত মামুদের আধ্যাত্মিক নানা কাহিনির বয়ান দিয়েছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, প্রাচীন সেই বাড়িটি আর নেই। সব কিছুই গড়ে তোলা হয়েছে নতুন করে। তবে বাড়ির ভিতরে সাধককবির স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ব্যবহার করা খাটটি অবশিষ্ট আছে।

এই বংশের বর্তমান প্রজন্মের সাধনা ইয়াসমিন পীরগঞ্জ মহিলা কলেজে ডিগ্রির ছাত্রী। ঢাকা টাইমসকে সাধনা বলেন, ‘কবির বংশধর হিসেবে আমরা ওভাবে কোনো সম্মান পাই না। কারণ সরকারের পক্ষ থেকেও কবির বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয় না। কবির কিছু কবিতা পাঠ্যবইয়ে সংযুক্ত করা উচিত, এতে সবাই জানতে পারবে মধ্যযুগের কবি হেয়াত মামুদ সম্পর্কে।’

সমাধির সন্নিকটে হেয়াত মামুদের নামে রয়েছে একটি মাদ্রাসা। প্রায় কুড়ি বছর ধরে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এম এ সালেক।

ঢাকা টাইমসকে সালেক বলেন, ‘হেয়াত মামুদ সূফিসাধক ছিলেন। আধ্যাত্মিকতার নানা বিষয় নিয়ে তিনি কবিতা লিখিছেন। আর লোকমুখে প্রচলিত থাকা কাঁঠাল গাছটির কাহিনীও স্থানীয় সবাই বিশ্বাস করেন।’

(ঢাকাটাইমস/০৩ডিসেম্বর/কারই/ডিএম)

সংবাদটি শেয়ার করুন

ফিচার বিভাগের সর্বাধিক পঠিত

বিশেষ প্রতিবেদন বিজ্ঞান ও তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

শিরোনাম :