এ ভোগান্তির শেষ কোথায়?

আশিক আহমেদ
  প্রকাশিত : ২৮ জুলাই ২০২২, ১৯:২৯| আপডেট : ২৯ জুলাই ২০২২, ১০:৫৫
অ- অ+

মো. আনছার আলী। ১৯৫২ সালে ছুলে মামলার মাধ্যমে (১০০/৫২) তার ৩৩ শতাংশ জমি যশোর ম্যজিস্ট্রেট আদালত থেকে বুঝে পান। ওই জমি ১৯৮৮ সালে তার ছেলে আলতাফ হোসেন রেকর্ড করেন নিজ নামে। আর এতেই বাধে বিপত্তি। বিবাদী কৃষ্ণ চন্দ্র সাহা, তবিবর রহমান কাজী নাবলক মোস্তাক কাজী ও সাফায়েত কাজী ৩০ ধারায় ভূমি অফিসে আপত্তি দাখিল করেন। ওই সময়ে আনছার আলীর ওই ছুলে মামলার নথিপত্র সংশ্লিষ্ট ভূমি কর্মকর্তাদের দেখানো হয়। কিন্তু ভূমি কর্মকর্তারা ওই ছুলেনামা দেখেও বিবাদীদের নামে ওই ৩৩ শতাংশ জমি রেকর্ড করে দেন।

আনছার আলীর ছেলে আলতাফ হোসেন ১৯৯৪ সালে নড়াইল সহকারী জেলা জজ আদালতে রেকর্ড সংশোধনী মামলা করেন। দেওয়ানি মামলা নম্বর-(১৭৫/৯৪)। প্রায় সাত বছর মামলা পরিচালনা করার পরে ২০০১ সালের ২১ নভেম্বর রায় পান আলতাফ হোসেন। নড়াইলের প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালত থেকে রায় দেন আলতাফ হোসেনের পক্ষে। এরপর জেলা জজ আদালতে আপিল করলে ওই আদালতকে ভুল বুঝিয়ে আপিলের রায় পান বিবাদীরা।

২০০৮ সালে হাইকোর্টে সিভিল রিভিউশন করেন আলতাফ হোসেন। হাইকোর্টের বিচারপতি এ কে সিনহা ওই সময়ে বাদীর দখলে জমি দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু গ্রামবাসীরা সালিস করে জমিটি মসজিদকে দিয়েছেন দেখাশোনা করার জন্য। হাইকোর্টের ওই মামলা এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।

মামলাটি পরিচালনা করছেন মৃত আনছার আলীর নাতি মো. ইউছুফ আলী। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগ থেকে মাস্টার্স শেষ করে তাদের এলাকায় একটি বেসরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন।

ইউছুফ আলী বলেন, ‘২০০১ সাল থেকে জায়গা-জমির মামলা নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছি। জমির যে মূল্য তার চেয়ে তিন গুণ টাকা খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু কোনো ফল পাইনি। আমার আইনজীবী বলেছেন, হাইকোর্টে যেকোনো মামলার কজলিস্টে আনতে সাত থেকে আট হাজার টাকার প্রয়োজন হয়। এছাড়াও উকিলের খরচ মিলে হাইকোর্টে প্রায় ৫০ হাজার টাকার দরকার। কিন্তু আমার বৃদ্ধ বাবা এখন অসুস্থ। আর আমিও একটি ছোট চাকরি করি। আমাদের আয় বলতে সামান্য কিছু জমির ফসল। ছোট ভাইও নড়াইলের একটি কলেজে পড়াশোনা করছেন, আমাদের পক্ষে এখন মামলা পরিচালনা করে দুরূহ হয়ে পড়েছে।’

প্রায় ৩৮ বছর ধরে চলছে একটি জমির মামলা; রায়ের পর রায় কিন্তু রায়ের কোনো কার্যকারিতা নেই। দাদা মামলা চালিয়েছেন, তিনি গত হয়েছেন। পরে হাল ধরলেন তার ছেলে। তিনিও মামলা চালিয়ে প্রচুর অর্থ ব্যয় করে এখন বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন। ওয়ারিশ সূত্রে ওই মামলার হাল ধরেছেন আনছার আলীর নাতি ইউছুফ আলী। কিন্তু এখনো কোনো সুরাহা হয়নি।

এমন ভোগান্তির শিকার আমি নিজেও। একজন সংবাদকর্মী হয়েও বছরের পর বছর দুষ্টুচক্রের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছি। ২০০৮ সালে আমার বাবা হাবিবুর রহমান নড়াইল জেলার কালিয়া সহকারী জজ আদালতে একটি রেকর্ড সংশোধনীর মামলা করেন। মামলা নম্বর-১৪৯/০৮। বিবাদীরা ওই মামলায় সমন নোটিশ পেয়েও আদালতে হাজির হননি। আদালত প্রাথমিক রায় দেন।

২০১০ সালে বাবা হাবিবুর রহমানের মৃত্যুর পরে পরিবারের পক্ষে ওই মামলার হাল ধরি আমি। ঢাকায় একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালে কাজ করে নিয়মিত নড়াইলের আদালতে গিয়ে মামলায় আইনি কার্যক্রম সম্পাদন করেছি। সারাদিন অফিস করে রাতে গাবতলী থেকে বাসে চড়ে নড়াইল গেছি। ভোরে বাস থেকে নেমে নড়াইল আদালতের মসজিদে মুখ-হাত ধুয়ে নামাজ পড়ে অপেক্ষা করি আদালতে লোকজন আসার জন্য ।

২০১২ সালে আদালত আমাদের পক্ষে প্রাথমিক রায় দেন। পরে আমি অ্যাডভোকেট কমিশনার চেয়ে আবেদন করি। পরে আদালতে টাকা জমা দিলে অ্যাডভোকেট কমিশনার ওই জমি মাপজোক করে একটি প্রতিবেদন দেন। অ্যাডভোকেট কমিশনার তার প্রতিবেদনে ওই জমিতে অবৈধ পাঁচটি ঘর রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। যা চূড়ান্ত রায়ের একাংশ বলে গণ্য করে আদালত রায় দেন।

এরপর আমি ২০১৪ সালে অবৈধ ঘড়বাড়ি উচ্ছেদ চেয়ে ওই আদালতে একটি উচ্ছেদ মামলা করি। মামলা নম্বর-০৭/১৪। নিয়মানুযায়ী বিবাদীরা হাজির না হওয়ায় এই মামলায়ও আদালত একতরফা রায় দেন আমাদের পক্ষে। পরে আমি ২০১৬ সালে ওই রায় জারি করার জন্য একটি জারি ফাইল করি। যার নম্বর-০২/১৬। বিজ্ঞ আদালত জাবেদ খান নামের একজন জারিকারককে রায় কার্যকরের নির্দেশ দেন।

কিন্তু ওই জারিকারক আরো দুই জারিকারক সাখাওয়াত হোসেন ও শওকত হোসেনকে নিয়ে নালিশি জমিতে যান এবং রহস্যজনকভাবে উচ্ছেদ না করে চলে আসেন। পরে তারা একটি মিথ্যা বানোয়াট ও মনগড়া প্রতিবেদন দাখিল করেন।

এরপর আমি সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ করি। রেজিস্ট্রার জেনারেল নড়াইলের জেলা জজ মুন্সী আবুল বাশারকে ঘটনাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে বলেন। কিন্তু নড়াইলের জেলা জজ একটি প্রতিবেদন পাঠান সুপ্রিম কোর্টে। ওই প্রতিবেদন কী লেখা হয়েছে তা আজ পর্যন্ত জানতে পারিনি ।

পরে বিবাদীরা আমার বিরুদ্ধে একটি ছানি ও একটি ডিক্রি রদের মামলা করেন। এই মামলায় আমি আদালতে জবাব দিয়েছি, একটি বিষয় নিয়ে একাধিক মামলা চলতে পারে না। তাই আদালত তাদের করা ছানি মামলাটি খারিজ করে দিয়েছে। আর ডিক্রি রদের মামলাটি এখনো চলছে।

এই মামলায় আট বছর ধরে বিবাদীরা শুধু সময় নিচ্ছেন। একটি দেওয়ানি মামলায় আইনানুযায়ী যেকোনো পক্ষ তিনবার সময় পাবেন কোনো জরিমানা ছাড়া। আর তিনবার সময় পাবেন জরিমানা দিয়ে। কিন্তু প্রতিপক্ষ এই মামলায় ২০ বারের মতো সময় নিয়েছে। বর্তমানে মামলাটির সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। কিন্তু আসামিরা সময়মতো আদালতে আসেন না।

দেশের প্রচালিত আইনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিয়েই দীর্ঘদিন মামলা লড়ে যাচ্ছি। এখন দেখছি, ন্যায়বিচার কবে পাব তা নিশ্চিত নয়। জমির যে দাম তার চেয়ে বেশি টাকা খরচ হয়েছে, কিন্তু কোনো ফল আসেনি। আর যারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে জমি দখল করে আছে, তারাই এখন লাভবান। নিজেদের জমি ফিরে পেতে আর কত দিন ভোগান্তি পোহাতে হবে?

দেওয়ানি আইনের জটিলতার কারণে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি হতে পারছে না। ফলে বছরের পর বছর মামলা চালিয়ে সাধারণ মানুষ ভোগান্তি পোহাচ্ছে। দেশের প্রচালিত ভূমি আইনে মামলা করে কোনো মানুষ জীবিত অবস্থায় তার ফল দেখে যেতে পারেন বলে মনে হচ্ছে না। আদালতে যাওয়া-আসা, আইনজীবীদের খরচ, আদালতের বিভিন্ন স্তরে ও জায়গায় টাকা দিতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে এসব মানুষ। কিন্তু ফলাফল শূন্য।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারক সংকট, আইনে দুর্বলতা, পেশিশক্তি, রাজনৈতিক রশি টানের কারণে দ্রুত শেষ করা যাচ্ছে না এসব দেওয়ানি মামলা। আমাদের দেশে যে ভূমি আইনে বিচার সালিস হয়, ওই আইন ব্রিটিশ আমলে তৈরি হয়েছে। ১৯০৮ সালে আমাদের ভূমি আইন রচিত হয়েছিল। এখন চলছে ২০২২ সাল, প্রায় ১১৪ বছর আগের আইন দিয়ে সাধারণ মানুষের কোনো উপকার সম্ভব নয়।

ভূমি আইনের জটিলতার কারণে দাঙ্গাবাজ ভূমি দস্যুদের দৌরাত্ম বেড়েই চলেছে। ভূমিদস্যুরা মনে করে জমি দখলের পরে যেকোনো ব্যক্তিমালিকানাধীন ভূমিতে ১২ বছর পার করতে পারলে আদালত থেকে অবৈধভাবে ভূমি দখলকারীর পক্ষে রায় দেওয়া হয়। ফলে তারা অবৈধভাবে ভূমি দখলে উৎসাহ পায়।

আমাদের দেশে যেকোনো দেওয়ানি মামলা সহকারী জজ আদালত থেকে নিষ্পত্তি হতে সময় লাগে চার থেকে পাঁচ বছর। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি। এরপর আপিলে যায় আরো কয়েক বছর। এরপর হাইকোর্টে মামলা গেলে তা কজলিস্টে আসতে পার হয়ে যায় বছরের পর বছর। কোনো কোনো দেওয়ানি মামলা নিষ্পত্তি হতে ৪০-৫০ বছর সময় লাগে। কিন্তু কেন একটি বৈধ জমি ফিরে পেতে এত সময় লাগবে ?

ভূমি বিশেষজ্ঞ আইনজীবীদের বক্তব্যমতে, প্রায় ১১৪ বছরের পুরনো আইন দিয়ে মামলা পরিচালনা করলে কোনো সুফল পাবে না কেউ।

১৯৪৭ সালের আগে মুঘল রুলে জমি আইন চলত। ব্রিটিশরা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ভূমি আইন প্রণয়ন করেন। এই আইন ভারত উপমহাদেশের প্রথম ভূমি আইন। ১৯৮৫ সালের বেঙ্গল ট্যাকি অ্যাক্ট বঙ্গীয় প্রজা স্বত্ব আইন। ১৯৪৯ সালের জিন্নাহ সরকার এস্টেট একুয়েজিশন আইন করেন, যা জমিদারি প্রথা তুলে দেওয়া হয়। এই আইনের ১৫১টি ধারা রয়েছে। এর মধ্যে ৭/৮ ধারা এখনো কার্যকর আছে, বাকিগুলোর কোনো ব্যবহার নেই। এস্টেট একুয়েজিশন আইনের যে ধারাগুলো এখনো কার্যকর রয়েছে সেগুলো হলো ১৭, ১৮, ১৯, ৭৫, এ, বি, ৮৫, ৮৬, ৮৭, ৯৬, ১৪৪, ১৪৫। নন অ্যাগ্রিকালচার ফিন্যান্স অ্যাক্ট ১৯৫১ সালে কৃষিভূমির ক্ষেত্রে প্রস্তুত করা হয়, যার মধ্যে রয়েছে ২৪টি ধারা।

দেওয়ানি মামলার দীর্গসূত্রতা সম্পর্কে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বলেন, ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির একটি আইন করা হয়েছিল, যা আমেরিকা ও কানাডায় প্রচালিত আছে। আমি মন্ত্রী থাকাকালে এমন একটি সংশোধন করেছিলাম। এ সময়ে অবসরপ্রাপ্ত বিচারকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এসব বিরোধ নিষ্পত্তি করা যেতে পারে। কিন্তু সরকার একটি গেজেটের মাধ্যমে এই ব্যবস্থা চালু করতে পারে। এতে আইনজীবীদের কোনো ক্ষতি হবে না। মামলার জট অনেক কমত।

লেখক: জ্যেষ্ঠ অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক, ঢাকাটাইমস।

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
প্রস্তাবিত বাজেটে পুঁজিবাজার: প্রত্যাশা বনাম প্রাপ্তি
কসবা-আখাউড়াকে মাদকমুক্ত করার ঘোষণা কবীর আহমেদ ভূইয়ার
জিয়াউর রহমানকে স্মরণের সর্বোত্তম উপায় তাঁর আদর্শ অনুসরণ : ড. মঈন খান
আর্জেন্টিনা-ব্রাজিলকে ফাইনাল দেখতে চান বাংলাদেশের ক্রীড়ামন্ত্রী
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা