নতুন বাজেট ২০২৬-২০২৭ কি ঘুরিয়ে দিতে পারবে অর্থনীতির চাকা?

মোঃ সাইফুল ইসলাম মাসুম
  প্রকাশিত : ১১ জুন ২০২৬, ১২:৫৭
অ- অ+

বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটকে শুধু আয়-ব্যয়ের একটি বার্ষিক হিসাব হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি এমন এক সময়ে উপস্থাপিত হয়েছে, যখন দেশের অর্থনীতি একদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক খাতের চাপ, ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বিনিয়োগ স্থবিরতার সঙ্গে লড়াই করছে; অন্যদিকে নতুন করে প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক আস্থার পুনর্গঠনের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে। প্রায় ৯ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাবিত বাজেট বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ। কিন্তু অর্থনীতির ইতিহাস আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—বাজেটের সাফল্য তার আকারে নয়, বরং তার বাস্তবায়নে। ফলে এই বাজেটকে মূল্যায়ন করতে হলে শুধু সংখ্যার দিকে তাকালে চলবে না; দেখতে হবে এর অন্তর্নিহিত দর্শন, বাস্তবতা, ঝুঁকি এবং সম্ভাবনাকে।

প্রথম দৃষ্টিতেই বাজেটটি একটি উচ্চাভিলাষী দলিল বলে মনে হয়। সরকার ৬.৫ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছে এবং একই সঙ্গে প্রায় ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য স্থির করেছে। কাগজে-কলমে এই লক্ষ্যগুলো আকর্ষণীয়। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা অনেক সময় বাজেট বক্তৃতার চেয়ে কঠিন হয়। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে যে অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, সেখানে এসব লক্ষ্য অর্জন শুধু প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয় নয়; বরং এটি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর নির্ভরশীল।

বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত অংশ নিঃসন্দেহে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা। বাংলাদেশ বহু বছর ধরেই একটি মৌলিক সমস্যার মুখোমুখি—রাষ্ট্রের ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু রাজস্ব আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। কর-জিডিপি অনুপাত এখনও দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় নিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, বাংলাদেশের সমস্যা করের হার নয়; সমস্যা করের পরিধি। দেশের বিপুল সংখ্যক সম্ভাব্য করদাতা কর নেটওয়ার্কের বাইরে থেকে যাচ্ছে। অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ব্যাপক বিস্তার, কর প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা, দুর্বল নজরদারি এবং কর ফাঁকির সংস্কৃতি রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে। এই বাস্তবতায় প্রায় ৭ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য নিঃসন্দেহে সাহসী, তবে একই সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণও। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, প্রায় প্রতি বছরই নির্ধারিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা এবং প্রকৃত আদায়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যবধান তৈরি হয়। যদি সেই ব্যবধান আবারও তৈরি হয়, তাহলে সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং আর্থিক ভারসাম্য সবকিছুই চাপে পড়ে যেতে পারে।

করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধি করে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত মধ্যবিত্তের জন্য কিছুটা স্বস্তি বয়ে আনবে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। সেই বিবেচনায় এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী। কিন্তু একই সঙ্গে বিভিন্ন খাতে ভ্যাট ও শুল্ক কাঠামোর পরিবর্তন যে নতুন মূল্যচাপ তৈরি করবে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অর্থনীতির একটি মৌলিক সত্য হলো—রাষ্ট্র যখন একদিকে কর কমায়, অন্যদিকে তাকে রাজস্ব ঘাটতি পূরণের জন্য বিকল্প উৎস খুঁজতে হয়। ফলে করদাতারা এক জায়গায় স্বস্তি পেলেও অন্য জায়গায় বাড়তি ব্যয় বহন করতে বাধ্য হতে পারেন।

বাজেটের আরেকটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর ঘাটতি। প্রায় ২ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকার বাজেট ঘাটতি দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত। উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে ঘাটতি বাজেট নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং অনেক সময় এটি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে চাঙ্গা করার একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ঘাটতির অর্থায়ন কীভাবে করা হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। সরকার যদি ব্যাপকভাবে ব্যাংকিং খাত থেকে ঋণ গ্রহণ করে, তাহলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। অর্থনীতিতে একে "Crowding Out Effect" বলা হয়। বাংলাদেশের বেসরকারি খাত এমনিতেই উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি অনিশ্চয়তা, ডলার সংকট এবং ব্যবসায়িক পরিবেশের নানা সীমাবদ্ধতার মুখোমুখি। সেখানে সরকারের ঋণ গ্রহণের চাপ বেড়ে গেলে নতুন শিল্প বিনিয়োগ আরও ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যাংকিং খাতের স্বাস্থ্য। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই খেলাপি ঋণ, দুর্বল সুশাসন এবং আস্থার সংকটে ভুগছে। সরকারি পরিসংখ্যানের বাইরে প্রকৃত খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বড় বলে অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন। এ অবস্থায় ব্যাংকিং খাতের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা অর্থনীতির জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বাজেটে ব্যাংকিং সংস্কার নিয়ে কিছু প্রত্যাশা থাকলেও কাঠামোগত পরিবর্তনের সুস্পষ্ট রূপরেখা এখনও দৃশ্যমান নয়। অথচ ব্যাংকিং খাতকে শক্তিশালী করা ছাড়া টেকসই প্রবৃদ্ধির ভিত্তি নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নটি এই বাজেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সামাজিক ও রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধি, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, আমদানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়ন সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে কঠিন করে তুলেছে। বাজারে গিয়ে একজন সাধারণ ভোক্তা যে বাস্তবতা অনুভব করেন, তা জিডিপি প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। মানুষের কাছে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সূচক হলো বাজারের থলে। সেই থলে যদি আগের তুলনায় অর্ধেক পণ্য বহন করে, তাহলে প্রবৃদ্ধির গল্প তাদের কাছে অর্থহীন হয়ে পড়ে।

সরকার ৭.৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ শুধু বাজেটের মাধ্যমে সম্ভব নয়। এটি মূলত একটি সমন্বিত নীতিগত প্রক্রিয়া, যেখানে মুদ্রানীতি, রাজস্বনীতি, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা, বাজার তদারকি এবং উৎপাদন সক্ষমতা—সবকিছুর ভূমিকা রয়েছে। যদি কৃষি উৎপাদন বাড়ে, সরবরাহ চেইন উন্নত হয় এবং বাজারে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি পায়, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে। অন্যথায় কাগজে নির্ধারিত লক্ষ্য বাস্তবে অর্জন করা কঠিন হবে।

বিনিয়োগ প্রসঙ্গে বাজেটের বার্তা মিশ্র। কিছু ক্ষেত্রে শিল্পায়ন উৎসাহিত করতে শুল্ক ও কর ছাড় দেওয়া হয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য আমদানি শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। স্বল্পমেয়াদে এটি স্থানীয় শিল্পকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে অতিরিক্ত সুরক্ষাবাদ প্রতিযোগিতা কমিয়ে দিতে পারে। ইতিহাস বলে, প্রতিযোগিতাহীন শিল্প কখনোই বিশ্ববাজারে টিকে থাকতে পারে না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের সাফল্যের পেছনে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার একটি বড় ভূমিকা রয়েছে। ফলে শিল্প সুরক্ষা এবং প্রতিযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।

অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রশ্নটি এখনও বাজেটের একটি দুর্বল দিক বলে মনে হয়। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছে। কিন্তু কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই অনুপাতে বাড়ছে না। অর্থনীতির প্রকৃত শক্তি নির্ভর করে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের ওপর। শুধু অবকাঠামো নির্মাণ কিংবা সরকারি ব্যয় বাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদে কর্মসংস্থান সংকট সমাধান করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন বেসরকারি বিনিয়োগ, প্রযুক্তিনির্ভর শিল্পায়ন এবং দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধিকে ইতিবাচক বলা যায়। কারণ মূল্যস্ফীতির সময়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার বড় সমস্যা বরাদ্দের পরিমাণ নয়; বরং বরাদ্দের কার্যকারিতা। অনেক সময় প্রকৃত দরিদ্র মানুষ সুবিধা পান না, আবার অযোগ্য ব্যক্তিরা বিভিন্ন সুবিধা ভোগ করেন। ফলে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি।

তবে এই বাজেটের সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা সম্ভবত সংস্কার প্রশ্নে। অর্থনীতির বর্তমান সংকট কেবল অর্থের সংকট নয়; এটি মূলত প্রতিষ্ঠানের সংকট। রাজস্ব প্রশাসন, ব্যাংকিং খাত, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান, ব্যবসা পরিবেশ, বিচারিক দক্ষতা—সব ক্ষেত্রেই কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা বহুদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। কিন্তু বাজেটে সেই সংস্কারের সুস্পষ্ট রূপরেখা খুব বেশি দৃশ্যমান নয়। বড় বাজেট ঘোষণা করা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু বড় সংস্কার বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিকভাবে অনেক বেশি কঠিন।

তবুও হতাশ হওয়ার কারণ নেই। বাংলাদেশের অর্থনীতির শক্তির জায়গাগুলো এখনও অটুট রয়েছে। দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী, শক্তিশালী রেমিট্যান্স প্রবাহ, রপ্তানি খাতের সক্ষমতা, কৃষির স্থিতিস্থাপকতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন ভবিষ্যতের সম্ভাবনার ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতি ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধারের পথে। নতুন বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। সঠিক নীতি সহায়তা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ আবারও উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে ফিরে যেতে পারে।

অতএব, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে শুধু একটি আর্থিক পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি মূলত একটি অর্থনৈতিক আস্থার পরীক্ষা। সরকার এই বাজেটের মাধ্যমে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং রাজস্ব আহরণের ওপর একটি বড় বাজি ধরেছে। সেই বাজি সফল হবে কি না, তা নির্ভর করবে বাজেট বক্তৃতার ভাষার ওপর নয়, বরং বাস্তবায়নের দক্ষতার ওপর। অর্থনীতির ইতিহাসে বহু বড় বাজেট এসেছে, আবার হারিয়েও গেছে। কিন্তু যে বাজেট মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এবং অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাগুলো দূর করতে পারে, কেবল সেই বাজেটই ইতিহাসে সফল হিসেবে বিবেচিত হয়।

আজ তাই বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন একটাই—আমরা কি শুধু বড় বাজেট করছি, নাকি বড় সংস্কারের পথেও হাঁটছি? কারণ সংখ্যার জাদু দিয়ে সাময়িক আলোড়ন তোলা যায়, কিন্তু টেকসই উন্নয়ন গড়ে ওঠে সুশাসন, উৎপাদনশীলতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ওপর। নতুন বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়নও শেষ পর্যন্ত সেখানেই হবে।

তবে এই বাজেটের মূল্যায়নে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উপেক্ষা করা যায় না। বর্তমান সরকার এমন এক সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণ করেছে, যখন অর্থনীতি বহুমাত্রিক চাপের মধ্যে রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব ঘাটতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি মোটেও সহজ ছিল না। সেই বাস্তবতায় সরকার যে একটি বৃহৎ, উচ্চাভিলাষী এবং উন্নয়নমুখী বাজেট প্রণয়নের সাহস দেখিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ রয়েছে। এই বাজেটের বিভিন্ন খাতে অবকাঠামো উন্নয়ন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তা সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির যে প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়, তা রাষ্ট্রকে দীর্ঘমেয়াদে আরও শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, সরকার শুধু ব্যয় বৃদ্ধির পথ বেছে নেয়নি; বরং রাজস্ব সক্ষমতা বাড়ানো, কর ব্যবস্থাকে আধুনিকায়ন করা, ডিজিটাল অর্থনীতিকে উৎসাহ দেওয়া এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠনের লক্ষ্যে একাধিক উদ্যোগের ইঙ্গিত দিয়েছে। অর্থনীতির ভাষায় উন্নয়ন কখনোই কেবল অবকাঠামো নির্মাণের নাম নয়; এটি প্রতিষ্ঠান নির্মাণেরও প্রক্রিয়া। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে এই বাজেটকে একটি "ট্রানজিশন বাজেট" বলাই যায়, যার মাধ্যমে সরকার স্বল্পমেয়াদি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা গড়ে তোলার ভিত্তি নির্মাণের চেষ্টা করছে।

একজন অর্থনীতিবিদের দৃষ্টিতে বাজেটের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক হলো সরকারের ভবিষ্যতমুখী চিন্তা। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার এই যুগে কেবল বর্তমান সংকট সামাল দেওয়া যথেষ্ট নয়; আগামী দশকের জন্য অর্থনীতিকে প্রস্তুত করাও জরুরি। অবকাঠামো, প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্পায়ন এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে বিনিয়োগের মাধ্যমে সরকার যে একটি দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন কৌশলের ইঙ্গিত দিয়েছে, তা প্রশংসার দাবিদার। কারণ রাষ্ট্র গঠনের প্রকৃত কাজ এক অর্থবছরে সম্পন্ন হয় না; এটি ধারাবাহিক পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং নীতিগত স্থিতিশীলতার মাধ্যমে ধীরে ধীরে অর্জিত হয়।

অবশ্যই এই বাজেটের সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। কিন্তু এটিও সত্য যে, সংকটের সময় সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাজনৈতিক সক্ষমতা সব সরকারের থাকে না। সেই বিবেচনায় বর্তমান সরকার যে অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি বজায় রাখা এবং দীর্ঘমেয়াদে একটি অধিক সক্ষম ও আত্মনির্ভর রাষ্ট্র নির্মাণের লক্ষ্যে বাজেটকে একটি নীতিগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে, সেটিকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। এখন প্রয়োজন ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার দক্ষতা, জবাবদিহিতা এবং সংস্কারের ধারাবাহিকতা।

লেখক: ব্যাংকিং ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
ফুটবল বিশ্বকাপ উপলক্ষে স্মারক ডাকটিকিট উন্মোচন করলেন প্রধানমন্ত্রীর
২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট মন্ত্রিসভায় অনুমোদন, সংসদে উপস্থাপন বিকেলে
বিশ্বকাপ ফুটবল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান তিন দেশে, কখন কোথায় কী থাকছে
নতুন সংঘাতের ঝুঁকি, বিশ্বকে সতর্ক করলেন জাতিসংঘ মহাসচিব
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা