মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ: রোগের চিকিৎসা, নাকি উপসর্গের ব্যবস্থাপনা?

মোঃ সাইফুল ইসলাম মাসুম
  প্রকাশিত : ০৮ জুন ২০২৬, ১১:৩০
অ- অ+

বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এমন এক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে, যেখানে মূল্যস্ফীতি কেবল একটি অর্থনৈতিক সূচক নয়; এটি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা, ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত, বিনিয়োগ প্রবণতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক আস্থাকে প্রভাবিতকারী সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চলকগুলোর একটিতে পরিণত হয়েছে। গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য থেকে শুরু করে বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, জ্বালানি ও পরিবহন—প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আজ নীতিনির্ধারকদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকারের বিষয়।

এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক কঠোর মুদ্রানীতির পথ বেছে নিয়েছে। নীতিসুদ বৃদ্ধি, ঋণপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ এবং বাজারে অর্থের সরবরাহ সীমিত করার মাধ্যমে মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা চলছে। প্রচলিত অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী এ ধরনের পদক্ষেপ যৌক্তিক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বর্তমান মূল্যস্ফীতির প্রকৃতি কি এমন, যা কেবল মুদ্রানীতির মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব? নাকি আমরা এমন একটি সমস্যার সামনে দাঁড়িয়ে আছি, যার শিকড় অর্থনীতির আরও গভীরে প্রোথিত?

মূল্যস্ফীতির কারণ বিশ্লেষণ করতে গেলে প্রথমেই বুঝতে হবে, সব মূল্যস্ফীতি একই উৎস থেকে জন্ম নেয় না। অর্থনীতিতে সাধারণত দুটি ব্যাখ্যা দেওয়া হয়। প্রথমটি হলো চাহিদাজনিত মূল্যস্ফীতি, যেখানে মানুষের আয় ও ব্যয়ক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে পণ্যের চাহিদা সরবরাহকে ছাড়িয়ে যায়। দ্বিতীয়টি হলো ব্যয়জনিত বা সরবরাহ-পক্ষীয় মূল্যস্ফীতি, যেখানে উৎপাদন ব্যয়, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি মূল্য কিংবা সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে পণ্যের দাম বৃদ্ধি পায়।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতির বড় অংশটি দ্বিতীয় ধরনের। বাস্তবে অধিকাংশ মানুষের প্রকৃত আয় বাড়েনি; বরং মূল্যস্ফীতির কারণে তাদের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো ব্যয় কমাচ্ছে, নিম্ন আয়ের মানুষ প্রয়োজনীয় খরচও সংকুচিত করছে, ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে সতর্ক হচ্ছে। অর্থাৎ অর্থনীতিতে এমন কোনো অতিরিক্ত ভোগের উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে না, যা উচ্চ মূল্যস্ফীতির একক ব্যাখ্যা হতে পারে।

বরং মূল্যস্ফীতির পেছনে রয়েছে আমদানিনির্ভর অর্থনীতির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা।

বাংলাদেশের শিল্প ও ভোগ্যপণ্য খাতের একটি বড় অংশ বিদেশি কাঁচামাল ও আমদানির ওপর নির্ভরশীল। জ্বালানি তেল, ভোজ্যতেল, গম, ডাল, তুলা, রাসায়নিক পণ্য, সার এবং শিল্পের বিভিন্ন উপকরণ আমদানি করতে হয়। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি কিংবা ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন ঘটলেই তার অভিঘাত দেশের বাজারে এসে পড়ে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডলারের মূল্যবৃদ্ধি আমদানিকারকদের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে। ব্যবসায়ীরা স্বাভাবিকভাবেই সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। এর ফলাফল ভোগ করছে সাধারণ ভোক্তা।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য রয়েছে। মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সুদের হার বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু মূল্যস্ফীতির অন্যতম বড় কারণ—বিনিময় হারজনিত চাপ—রয়ে গেছে প্রায় একই জায়গায়। অর্থাৎ চাহিদা কমানোর চেষ্টা করা হলেও ব্যয় বৃদ্ধির উৎসগুলো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।

জ্বালানি খাতের বিষয়টিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আধুনিক অর্থনীতিতে জ্বালানি মূলত সব খাতের ইনপুট। কৃষিক্ষেত্রে সেচ, শিল্পে উৎপাদন, পরিবহনে পণ্য সরবরাহ—সব ক্ষেত্রেই জ্বালানি ব্যয়ের প্রভাব রয়েছে। যখন জ্বালানির দাম বাড়ে, তখন তার প্রতিক্রিয়া অর্থনীতির প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে মূল্যস্ফীতি কেবল বাজারের কোনো একটি অংশে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি একটি সামগ্রিক ব্যয় সংকটে পরিণত হয়।

তবে সমস্যার আরেকটি দিক রয়েছে, যা অর্থনৈতিক আলোচনায় তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব পায়। সেটি হলো বাজার কাঠামো ও সুশাসনের প্রশ্ন।

বাংলাদেশে কৃষক থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত একটি পণ্য পৌঁছাতে বহু স্তর অতিক্রম করতে হয়। এই দীর্ঘ সরবরাহশৃঙ্খলে কোথাও কোথাও প্রতিযোগিতার ঘাটতি, তথ্যের অসমতা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অতিরিক্ত প্রভাব মূল্যবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করে। অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমলেও স্থানীয় বাজারে তার সুফল দ্রুত প্রতিফলিত হয় না। আবার কোনো সংকটের আশঙ্কা দেখা দিলেই মজুতদারি বা কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগও সামনে আসে। এসব বাস্তবতা মূল্যস্ফীতিকে কেবল অর্থনৈতিক নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক ও শাসনব্যবস্থাগত সমস্যায়ও পরিণত করেছে।

এমন পরিস্থিতিতে কঠোর মুদ্রানীতির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অস্বাভাবিক নয়।

নিশ্চয়ই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্ব মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকলে অর্থনীতিতে অনিশ্চয়তা বাড়ে, সঞ্চয়ের প্রকৃত মূল্য কমে যায় এবং বিনিয়োগ পরিকল্পনা বাধাগ্রস্ত হয়। সেই অর্থে মুদ্রানীতি কঠোর করা একটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। কিন্তু যখন মূল্যস্ফীতির উৎস প্রধানত সরবরাহ-পক্ষীয়, তখন মুদ্রানীতির কার্যকারিতাও সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে।

কারণ সুদের হার বৃদ্ধি করে একজন ব্যবসায়ীর ঋণ গ্রহণ নিরুৎসাহিত করা সম্ভব, কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারে ভোজ্যতেলের দাম কমানো সম্ভব নয়। ঋণ ব্যয়বহুল করে চাহিদা কমানো সম্ভব, কিন্তু বন্দরের অদক্ষতা বা সরবরাহশৃঙ্খলের দুর্বলতা দূর করা সম্ভব নয়। অর্থাৎ মুদ্রানীতি মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তার মূল কারণগুলোকে সব সময় নির্মূল করতে পারে না।

ফলে একটি ঝুঁকি তৈরি হয়। মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আরও দ্রুত মন্থর হয়ে যেতে পারে।

বর্তমানে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা উচ্চ সুদের কারণে নতুন বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন। উৎপাদন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা পিছিয়ে যাচ্ছে। কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে পরিবারগুলোও ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে। এর অর্থ হলো, মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের খরচের একটি বড় অংশ বহন করছে সাধারণ মানুষ এবং উৎপাদনমুখী খাত।

এখানে নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো ভারসাম্য রক্ষা করা।

একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানও ধরে রাখতে হবে। কেবল চাহিদা সংকোচনের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করলে অর্থনীতি এমন এক অবস্থায় পৌঁছাতে পারে, যেখানে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ক্ষতি দীর্ঘমেয়াদি হয়ে দাঁড়াবে।

বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় তাই মূল্যস্ফীতিকে একটি বহুমাত্রিক সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে। এটি কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমস্যা নয়; এটি অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, জ্বালানি বিভাগ, কৃষি খাত এবং বাজার নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোরও সমন্বিত দায়িত্ব। মূল্যস্ফীতি মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনার সংস্কার, সরবরাহশৃঙ্খল উন্নয়ন এবং আমদানিনির্ভরতা কমানোর দীর্ঘমেয়াদি কৌশল।

অর্থনীতির ভাষায় বলা হয়, কোনো রোগের চিকিৎসা তখনই সফল হয়, যখন তার কারণকে চিহ্নিত করা যায়। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যদি সমস্যার বড় অংশ কাঠামোগত হয়, তাহলে তার সমাধানও কাঠামোগত হতে হবে। অন্যথায় আমরা হয়তো মূল্যস্ফীতির উপসর্গ কিছুটা কমাতে পারব, কিন্তু এর পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকেই যাবে।

অতএব, বর্তমান মূল্যস্ফীতি বিতর্কের কেন্দ্রীয় প্রশ্নটি হওয়া উচিত—আমরা কি কেবল অর্থনীতির তাপমাত্রা কমানোর চেষ্টা করছি, নাকি জ্বরের প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করছি? কারণ টেকসই অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জনের জন্য উপসর্গ নয়, রোগের শিকড়েই আঘাত করতে হবে।

লেখক: অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিশ্লেষক

google news ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন
শীর্ষ খবর সর্বশেষ জনপ্রিয়
সব খবর
হামে শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন
ইসরায়েলে নতুন করে আবারও ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ল ইরান
ব্রিটিশ ও চীনা প্রতিনিধি দলের সম্মানে ইএটিএল ইনোভেশন হাবের নৈশভোজ ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত
বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে আবারও পতন
বিশেষ প্রতিবেদন তথ্যপ্রযুক্তি বিনোদন খেলাধুলা