মৃত্যুর মুখ থেকে বিশ্বকাপের মঞ্চে ক্রেইগ গর্ডন

ইনজুরি, সার্জারি আর অবসাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দুই দশকের লড়াই শেষে স্কটল্যান্ডের কিংবদন্তি গোলরক্ষক ক্রেইগ গর্ডন শেষবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপের মঞ্চে। ৪৩ বছর বয়সে যখন অধিকাংশ খেলোয়াড় অবসরের সুখস্মৃতি রোমন্থন করেন, তখন গর্ডন লড়ছেন ২০২৬ বিশ্বকাপের ময়দানে।
চলতি বছরের মার্চ মাস। লন্ডনের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক উসামাহ জানউনের চেম্বারে বসেছিলেন গর্ডন। ঘাড়ের গুরুতর ইনজুরি থেকে ফিরে আসার জন্য একটি বড় অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিতে হতো তাকে। চিকিৎসক কোনো রাখঢাক না করেই তাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, 'এই চিকিৎসার ঝুঁকি অনেক। ভুল কিছু হলে আপনি পক্ষাঘাতগ্রস্ত হতে পারেন, এমনকি আপনার মৃত্যুও হতে পারে।
পরিবার এবং নিজের ভবিষ্যতের কথা ভেবে গর্ডন সেই কঠিন সিদ্ধান্তটিই নিলেন। তিনি চেয়েছিলেন, সন্তানদের সাথে স্বাভাবিক জীবন কাটানোর মতো শারীরিক সক্ষমতা অর্জন করতে এবং শেষবারের মতো জাতীয় দলের হয়ে বিশ্বকাপে মাঠে নামতে।
গর্ডনের ক্যারিয়ার মানেই এক দীর্ঘ লড়াইয়ের নাম। গোড়ালি, হাত, পা, হাঁটু এবং কাঁধের ইনজুরিতে ক্যারিয়ারের প্রায় ২,০০০ দিন তাকে মাঠের বাইরে কাটাতে হয়েছে। প্রায় ২০০টি ম্যাচ মিস করেছেন তিনি। ২০১২ সালে হাঁটুতে গুরুতর ইনজুরি তাকে দুই বছর খেলার বাইরে রেখেছিল। সে সময় অনেক বিশেষজ্ঞ তাকে সরাসরি অবসরের পরামর্শ দিয়েছিলেন। এমনকি তার তৎকালীন ক্লাব সুন্দরল্যান্ড তার শারীরিক যন্ত্রণাকে ‘মানসিক সমস্যা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু অদম্য গর্ডন হার মানেননি। তিনবার অস্ত্রোপচারের পর ঠিকই ফিরে এসেছিলেন তিনি।
বিবিসি স্কটল্যান্ডের তথ্যচিত্র ‘আইকনস অফ ফুটবল’এ নিজের অনুভূতির কথা বলতে গিয়ে গর্ডন জানান, 'ইনজুরির যন্ত্রণায় আমি অনেক কেঁদেছি, কিন্তু সেই দুর্বলতা আমি সবার সামনে আসতে দিইনি।'
গর্ডনের ভাষ্যমতে, যদি গত বছর স্কটল্যান্ড বিশ্বকাপ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হতো, তবে তিনি হয়তো তখনই বুটজোড়া তুলে রাখতেন। ডেনমার্কের বিপক্ষে ৪-২ গোলের ঐতিহাসিক জয়ের ম্যাচটি ছিল তার ক্যারিয়ারের মোড় ঘোরানো মুহূর্ত। সেই ম্যাচ নিয়ে তিনি বলেন, 'আমি এতটাই মনোযোগী ছিলাম যে, আমাদের দলের দারুণ সব গোলের পরেও আমি উদযাপনে যোগ দিইনি। শুধু ভেবেছি, বল যেন আর জালে না জড়ায়। এটি আমার ক্যারিয়ারের শেষ মিশন।'
২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে বেশি বয়সী খেলোয়াড় ক্রেইগ গর্ডন। যদি শনিবার হাইতির বিপক্ষে তাকে মাঠে দেখা যায়, তবে তিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় বয়োজ্যেষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়বেন। বর্তমানে স্কটল্যান্ডের একাদশে জায়গা পেতে অ্যাঙ্গাস গানের সাথে তার তীব্র প্রতিযোগিতা চলছে। তবে ফুটবল বোদ্ধারা জানেন, গর্ডনকে যারা অবহেলা করেছেন, তাদের ভুল প্রমাণ করাই এই মানুষটির পুরনো অভ্যাস।
স্কটল্যান্ডের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ধৈর্যশীল এবং লড়াকু এই খেলোয়াড় শুধু একটি ট্রফির জন্য খেলছেন না; তিনি লড়ছেন নিজের অদম্য মানসিক শক্তির প্রমাণ দিতে। তার জীবনের এই হার না মানা গল্প এখন সারা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীদের কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম।
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































