রাজশাহীতে মাদক উদ্ধার অভিযানে ঘুষ নিয়ে আসামি ছাড়ার চাঞ্চল্যকর অডিও ফাঁস: নেপথ্যে সিন্ডিকেট

রাজশাহী মহানগরীর দামকুড়া থানাধীন কাদিপুর গ্রামে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) একটি অভিযানকে কেন্দ্র করে ১ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ, আসামি ছেড়ে দেওয়া এবং জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ পরিবর্তনের মিথ্যা আশ্বাসের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
অভিযানে আটক স্বামী-স্ত্রীকে বাঁচাতে নগদ অর্থ লেনদেনের একটি অডিও রেকর্ড ইতিমধ্যে গণমাধ্যমের হাতে এসেছে, যা নিয়ে পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ৮ জুন ২০২৬ তারিখে কাদিপুর গ্রামের বদর আলীর ছেলে শামীম আলী ও তার স্ত্রীর তিনকক্ষ বিশিষ্ট বাড়ির শয়নকক্ষের ড্রেসিং টেবিলের আয়নার পেছন থেকে ১৪ বোতল অবৈধ্য এসকাফ (ESKUF) সিরাপ এবং ৫০০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি) রাজশাহী জেলা শাখার 'খ' সার্কেলের পরিদর্শক হেলাল উদ্দীনের নির্দেশনায় উপ-পরিদর্শক আল আমিনের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়। ওই সময় অভিযানে কনস্টেবল সাদিকসহ অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
অভিযোগ রয়েছে, অভিযান চলাকালেই গ্রেপ্তারকৃত শামীমের স্ত্রীকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ কম দেখিয়ে হালকা ধারায় মামলা দেওয়ার শর্তে ২ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন কনস্টেবল সাদিক।
পরবর্তীতে ভুক্তভোগীদের অনুনয়-বিনয়ে 'হাসান' নামের এক মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নগদ ১ লাখ টাকা সরাসরি কনস্টেবল সাদিকের হাতে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। অর্থ হস্তান্তরের পর শামীমের স্ত্রীকে ছেড়ে দিয়ে কেবল শামীমকে থানায় নিয়ে যায় অভিযানকারী দল।
তবে পরদিন শামীমকে আদালতে সোপর্দ করা হলে দেখা যায়, পূর্বের প্রতিশ্রুত চুক্তির ব্যক্তয় ঘটিয়ে জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ বিন্দু পরিমাণও কমানো হয়নি; বরং সম্পূর্ণ মাদকের পরিমাণই মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘটনার পর মধ্যস্থতাকারী হাসান ও শামীমের স্বজনরা কনস্টেবল সাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে এক নতুন নাটকীয়তা উন্মোচিত হয়। ফাঁস হওয়া অডিও কথোপকথনে কনস্টেবল সাদিককে টাকা লেনদেনের বিষয়ে সাফাই গাইতে শোনা যায়। তিনি স্পষ্টভাবে দাবি করেন, সংগৃহীত অর্থ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, ফলে তা আর ফেরত দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। অডিওর শেষাংশে কনস্টেবল সাদিক আশ্বস্ত করে বলেন, আর্থিক সুরাহা না হলেও পরবর্তীতে তারা এলাকায় নির্বিঘ্নে ও প্রকাশ্যে মাদক ব্যবসা চালিয়ে যেতে পারবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে পুনরায় কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না।
কনস্টেবল সাদিকের এহেন বক্তব্যে প্রশাসনিক মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তার কথোপকথনে ইঙ্গিত করা ‘স্যার’ বলতে কি পরিদর্শক মো. হেলাল উদ্দীন, উপ-পরিদর্শক আল আমিন, নাকি অন্য কোনো প্রভাবশালী কর্মকর্তাকে নির্দেশ করা হয়েছে?
ফাঁস হওয়া অডিও রেকর্ড বিষয়ে সাংবাদিক কনস্টেবল সাদিকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এ সময় সাংবাদিক সরাসরি ঘুষ লেনদেন এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম জড়ানোর বিষয়ে প্রশ্ন করলে কনস্টেবল সাদিক বলেন,"এ বিষয়ে আমি ফোনে কোনো কথা বলতে পারব না। আপনারা যা শুনেছেন বা যা বলার আছে সরাসরি অফিসে আসেন, সামনাসামনি কথা হবে।"
ঘটনার সত্যতা যাচাই এবং ফাঁস হওয়া অডিওর বিষয়ে বক্তব্য নিতে ডিএনসি রাজশাহী জেলা শাখার 'খ' সার্কেলের পরিদর্শক মো. হেলাল উদ্দীনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য না দিয়ে কালক্ষেপণ করে যাচ্ছেন।
অপরদিকে, অভিযানের নেতৃত্বদানকারী ও মামলার বাদী উপ-পরিদর্শক আল আমিন মোবাইল ফোন রিসিভ করা থেকে বিরত রয়েছেন। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের এমন অসহযোগিতা ও রহস্যজনক নীরবতা স্থানীয় জনমনে গভীর সন্দেহের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি মাঠপর্যায়ের কনস্টেবল থেকে শুরু করে শীর্ষ কর্মকর্তা পর্যন্ত একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট এই অবৈধ অর্থ লেনদেন ও মাদক বাণিজ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত?
(ঢাকাটাইমস/১১ আগস্ট/এসএ)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন










































