বৈরী আবহাওয়ায় এলএনজি কার্গো ভিড়তে না পারায় আবারও গ্যাস সংকট

বৈরী আবহাওয়ার কারণে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আমদানি করা গ্যাসবাহী কার্গো বার্থিং করতে না পারায় দেশে আবারও গ্যাস সংকট দেখা দিয়েছে। সোমবার সন্ধ্যার পর থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ২৩৫ কোটি ২০ লাখ ঘনফুট থেকে কমে প্রায় ২১০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে। ফলে সরবরাহ কমেছে ২৫ কোটি ঘনফুটের বেশি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আগামী বুধবার সন্ধ্যার আগে সামিটের টার্মিনালে নতুন কার্গো যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে এর আগে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুযোগও কম।
জ্বালানি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, সামিটের এলএনজি টার্মিনালের জন্য সিঙ্গাপুরের আরামকো ট্রেডিং থেকে আমদানি করা একটি কার্গো রোববার বহির্নোঙরে পৌঁছায়। সোমবার সেটি টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত হয়ে জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ করার কথা ছিল। তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কার্গোটির বার্থিং সম্ভব হয়নি।
আরামকো পেট্রোবাংলাকে জানিয়েছে, আবহাওয়া পরিস্থিতির কারণে বুধবার বিকালের আগে কার্গোটিকে সামিটের টার্মিনালের সঙ্গে যুক্ত করা সম্ভব হবে না। এ অবস্থায় টার্মিনালে নতুন কোনো কার্গো না থাকায় মজুত ট্যাংকে থাকা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন করে সীমিত পরিমাণ গ্যাস জাতীয় গ্রিডে দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সামিটের টার্মিনাল থেকে বর্তমানে মাত্র প্রায় ২ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। আগে এই টার্মিনাল থেকে প্রায় ৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি কয়লা ও তেলের সংকটের কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সোমবার রাত ১টায় সারা দেশে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট লোডশেডিং হয়েছে।
পরবর্তীতে আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানোয় পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও ঢাকার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং অব্যাহত রয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান রেজাউল করিম জানান, লোডশেডিং কমাতে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি আদানি গ্রুপকেও উৎপাদন বাড়িয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য তাগাদা দেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের সুপারিশের পর সোমবার বিকাল থেকে বিদ্যুৎ খাতে গ্যাস সরবরাহ দৈনিক ৬৮ কোটি ৮০ লাখ ঘনফুট থেকে বাড়িয়ে ৭৪ কোটি ৪০ লাখ ঘনফুট করা হয়েছে।
তবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাস বাড়াতে গিয়ে অন্যান্য খাতে সরবরাহ কমাতে হয়েছে। শাহজালাল সার কারখানায় গ্যাস সরবরাহ ৪ কোটি ঘনফুট থেকে কমিয়ে ১ কোটি ঘনফুট করা হয়েছে। এতে শিল্পকারখানাসহ বিভিন্ন শ্রেণির গ্রাহক নতুন করে গ্যাস সংকটে পড়েছেন।
এদিকে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি বয়লার গত ৬ আগস্ট চালু হয়েছে। সোমবার দ্বিতীয় বয়লারটি চালু হওয়ার কথা থাকলেও তা হয়নি।
বর্তমানে গানভোরের একটি এলএনজি কার্গো ওই টার্মিনালের সঙ্গে সংযুক্ত রয়েছে এবং সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। দ্বিতীয় বয়লার চালুর জন্য টার্মিনালটি সাময়িকভাবে বন্ধ করতে হতে পারে। এরপর দুই বয়লারের সমন্বয়ে টার্মিনালটি পূর্ণ সক্ষমতায় চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একাধিক বৈঠক হয়েছে বলে জানা গেছে।
দুই এলএনজি টার্মিনালের পরিস্থিতির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজার থেকে নতুন কার্গো কেনা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে জ্বালানি বিভাগের। আগামী ১৭ আগস্টের জন্য নির্ধারিত এলএনজি কার্গো এখনো কিনতে পারেনি পেট্রোবাংলা। তবে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতার আলোচনা চলছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এদিকে সারা দেশে বিচ্ছিন্নভাবে বৃষ্টি হওয়ায় বিদ্যুতের চাহিদা কিছুটা কমেছে। তারপরও লোডশেডিং পরিস্থিতি অসহনীয় পর্যায়ে ছিল। বিদ্যুতের সরবরাহ বাড়াতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকেও সংশ্লিষ্টদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। এতে দেশে গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়। অগ্নিকাণ্ডের আগে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো। দুর্ঘটনার পর তা কমে প্রায় ২১৪ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে।
সাম্প্রতিক সময়ে সরবরাহ কিছুটা বাড়িয়ে ২৩৫ কোটি ২০ লাখ ঘনফুটে নেওয়া হলেও সামিটের টার্মিনালে কার্গো বার্থিং করতে না পারায় তা আবারও কমে ২১০ কোটি ঘনফুটে নেমেছে।
সোমবার বিকাল ৪টায় জাতীয় গ্রিডে মোট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয় ১৩ হাজার ৮৫৯ মেগাওয়াট। এর মধ্যে আদানি ও নেপাল থেকে এসেছে ২ হাজার ১০৪ মেগাওয়াট। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো থেকে উৎপাদন হয়েছে ৩ হাজার ৯০৬ মেগাওয়াট এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়েছে ৫ হাজার ৪৪৪ মেগাওয়াট। বাকি বিদ্যুৎ নবায়নযোগ্যসহ অন্যান্য উৎস থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (FSRU) হলো সমুদ্র বা উপকূলে ভাসমান বিশেষ জাহাজ বা কাঠামো। এর কাজ হলো বিদেশ থেকে আনা তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) সংরক্ষণ করা। এখানে মাইনাস ১৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় তরল রাখা গ্যাসকে গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে মূল জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
(ঢাকাটাইমস/১১ আগস্ট/আরজেড)
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন












































