র্যাবকে সাদা পোশাকে মুড়ে দিন

র্যাবের পোশাক নিয়ে বাংলাদেশে যা ঘটেছে গত দুই বছরে, সেটা একটু খেয়াল করলেই বোঝা যায় এই দেশের সংস্কারের গল্পটা আসলে কোথায় আটকে আছে। ২০২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের পর মানুষ রাস্তায় নামে, পুলিশ আর র্যাবের বিরুদ্ধে সরাসরি বিক্ষোভ হয়। দাবি ওঠে সংস্কারের, পোশাক বদলেরও। অন্তর্বর্তী সরকার সাড়া দেয়, সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় র্যাবের কালো পোশাক বদলে জলপাই রঙ আসবে, পুলিশের জন্য আয়রন রঙের পোশাক ও আনসারের জন্য সোনালী গম রঙের পোশাক নির্বাচন করা হয়। পুলিশের পোশাক পরিবর্তনও করা হয়। এরপর পুরো বিষয়টা কার্যত থেমে যায়। ২০২৬ সালের এপ্রিলেও পুলিশ সদর দপ্তর নতুন রঙের প্রস্তাব নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে, কারণ আগের রং নিয়ে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ সদস্যরাই খুশি নন। আর র্যাবের জন্য নতুন রঙের পোশাক গায়ে উঠেনি।
এই পোশাক-বিতর্কটাকে আমি তুচ্ছ মনে করি না। বরং মনে করি এই বিতর্কের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আসল প্রশ্নটা। পোশাক একটা প্রতীক। যে পোশাক পরে কেউ মানুষ গুম করেছে, মানুষ খুন করেছে, সেই পোশাকটার সঙ্গে একটা ভয়ের স্মৃতি তৈরি হয়ে যায় মানুষের মনে। সেই কারণেই আমি চাই র্যাবকে জলপাই নয়, সাদা পোশাকে মুড়ে দেওয়া হোক। কারণ, সাদা সবচেয়ে দৃশ্যমান রঙ, এই রঙে কিছুই লুকানো যায় না, লুকানো থাকে না। যে বাহিনী রাতের অন্ধকারে মানুষ তুলে নিয়ে যায়, কালো পোশাক পরে ঘাপটি মেরে থাকে, তাকে যদি সাদা পোশাক পরাতে পারা যায়, তাহলে একটা বার্তা যায়, এই বাহিনী এখন থেকে দেখা দিতে রাজি।
কিন্তু এই সাদা পোশাকের দাবিটা শুধু গায়ের রঙের প্রশ্ন নয়। এটা কাজের ধরনের প্রশ্নও। যদি সাদা পোশাক গায়ে দিয়ে একই কাজ করা হয়, তাহলে কোনো লাভ নেই। তাই পোশাকের সঙ্গে সঙ্গে একটু থামা দরকার, পেছনে ফিরে তাকানো দরকার।
র্যাব কতটা গভীরভাবে মানুষের জীবনে ক্ষত তৈরি করেছে, সেটা কিছু সংখ্যায় না বললে বোঝা কঠিন।
২০০৪ সালের মার্চে র্যাব গঠনের পর মাত্র আড়াই বছরের মধ্যে, অর্থাৎ ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের ডেটাবেইজে ৩৬৭টি র্যাব হত্যার রেকর্ড করে। এই তথ্য শুধু বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম আর মানবাধিকার সংগঠনের রিপোর্টের ভিত্তিতে, অর্থাৎ বাস্তব সংখ্যা আরও বেশি হওয়ার কথা। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৪ থেকে ২০০৬, এই দুই বছরে র্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা কমপক্ষে ৯৯১। মানে মাসে গড়ে প্রায় ৪১ জন মানুষ। হিসাবের বাইরে রয়ে গেছে আরও অনেক কিছু। বাংলাদেশের মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ২০০৪ সালের জুন থেকে ২০০৫ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত র্যাব ৭৩টি হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পরের বছর ২০০৫ সালে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়ায় ১০৯।
কিন্তু এই সংখ্যাগুলো কেবল সূচনা। এরপর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এসে ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিচারবহির্ভূত হত্যার সংখ্যা দাঁড়ায় ২ হাজার ৬৯৯। এই হিসাব দিয়েছে গবেষণাপত্র যেটি প্রকাশিত হয়েছে রিসার্চগেটে, একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য সংকলন করে। আইন ও সালিশ কেন্দ্র বলছে, শুধু গত পনেরো বছরে কমপক্ষে এক হাজার নয়শত ছাব্বিশটি বিচারবহির্ভূত হত্যা রেকর্ড করা গেছে। ২০১৮ সালে একটি মাদকবিরোধী অভিযানে মাত্র এক বছরে চারশো ছেষট্টি জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, যার বেশিরভাগই ছিল তথাকথিত ক্রসফায়ারে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল সেই বছরের ঘটনা তদন্ত করে দেখে, প্রতিটি ক্ষেত্রে একটি ধারাবাহিক প্যাটার্ন আছে, প্রথমে গুম বা তুলে নিয়ে যাওয়া, তারপর নির্যাতন, তারপর হত্যা, আর তারপর ক্রসফায়ারের গল্প সাজিয়ে প্রেস বিজ্ঞপ্তি।
সরাসরি গুমের হিসাব আরও ভয়াবহ। ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ শাসনামলে মোট ছয়শত সাতাত্তরটি গুমের ঘটনা নথিবদ্ধ। এর মধ্যে গুম কমিশনের কাছে আসা অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, মোট গুমের শতকরা সাতষট্টি ভাগের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ আছে র্যাবের। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে এই তথ্য রয়েছে। বাংলাদেশের কুখ্যাত আয়নাঘর, যে গোপন বন্দিশালার কথা নেত্র নিউজ ২০২২ সালে ফাঁস করেছিল, সেখানে মানুষকে মাসের পর মাস আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো। মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের ২০২১ সালের মানবাধিকার প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, আহমেদ কবির কিশোর নামে একজন কার্টুনিস্টকে র্যাব-৩ গ্রেফতার করার পর তার শরীরে বৈদ্যুতিক শক এবং মারধরের চিহ্ন নিয়ে ছাড়া পেতে দেখা গেছে।
এই প্রসঙ্গে নারায়ণগঞ্জের সাত খুন সবচে চাঞ্চল্যকর। ২০১৪ সালের এপ্রিলে নারায়ণগঞ্জের প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, তার তিন সহযোগী, একজন আইনজীবী এবং দুইজন চালককে দিনের আলোয় তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। এক সপ্তাহ পরে শীতলক্ষ্যা নদীতে ভাসতে দেখা যায় তাদের মৃতদেহ। তদন্তে বেরিয়ে আসে, স্থানীয় কাউন্সিলর নূর হোসেন র্যাব-১১-এর কর্মকর্তাদের ছয় কোটি টাকা দিয়েছিলেন এই হত্যার মজুরি হিসেবে। র্যাবের লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ (আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বীর বিক্রমের জামাতা), মেজর আরিফ হোসেন এবং লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা নিজেরাই আদালতে স্বীকার করেছিলেন এই ঘটনায় তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততার কথা। ২০১৭ সালে এই মামলায় ছাব্বিশ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়, যার মধ্যে তিনজনই ছিলেন র্যাবের শীর্ষ কর্মকর্তা। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। এটা ছিল সেই একটা লোমহর্ষক ঘটনা, যা আদালতে প্রমাণ করা গেছে। অপ্রমাণিত থেকে গেছে আরও কত শত ঘটনা।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের ২০০৬ সালের একটি রিপোর্টের শিরোনাম ছিলো জজ, জুরি অ্যান্ড এক্সিকিউশনার। অর্থাৎ বিচারক, জুরি এবং জল্লাদ, সবই একই বাহিনী। তাদের রিপোর্টে এসেছে, সেই সময়কার সরকারের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা গোপনে স্বীকার করেছিলেন যে সরকার একটি তালিকা তৈরি করেছিল সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ‘অপরাধীদের’, আর সেই তালিকাটা র্যাবকে দেওয়া হয়েছিল মেরে ফেলার জন্য। একজন প্রাক্তন মন্ত্রী পর্যন্ত প্রকাশ্যে বলেছিলেন, বিচারবহির্ভূত মৃত্যুগুলো হয়তো কাগজপত্রে বেআইনি কিন্তু মানুষ খুশি। এই মানসিকতাটা সেদিনও ছিল। আজও পুরোপুরি যায়নি।
এই পটভূমিতে বর্তমান সরকার কী করছে?
র্যাবের ২২তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, নতুন আইন প্রণয়ন করা হবে, মানবাধিকার সমুন্নত রাখা হবে, জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেছেন, এক অর্থে সেইভাবে র্যাব থাকছে না, নামও সম্ভবত পাল্টাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিজেই উচ্চপর্যায়ের একটি আইন প্রণয়ন কমিটি গঠন করেছে, যেখানে বিশেষজ্ঞরা রয়েছেন এবং মন্ত্রী নিজেই সরাসরি তদারকি করছেন। নতুন আইনে বাহিনীর ক্ষমতা, দায়িত্ব এবং জবাবদিহির কাঠামো নির্দিষ্ট করা হবে বলে জানানো হয়েছে।
এই উদ্যোগগুলোকে অস্বীকার করা ঠিক হবে না। র্যাব যে পনেরো থেকে বিশ বছর ধরে সুনির্দিষ্ট কোনো স্বাধীন আইন ছাড়াই চলেছে, সেটা সত্যিই একটা বড় কাঠামোগত সমস্যা। আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন অর্ডিন্যান্সের একটা পুরনো ধারার ওপর ভর করে একটা ক্ষমতাধর বাহিনী পরিচালনা করা হচ্ছিল, এটা একদমই ঠিক হয়নি। সেই শূন্যতা একটা স্বাধীন আইন দিয়ে পূরণ করতে চাওয়াটা যুক্তিসঙ্গত।
কিন্তু এখানেই আসল প্রশ্ন দাঁড়ায়।
অন্তর্বর্তী সরকারও এই পথেই হেঁটেছিল। স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স বা এসআইএফ নাম দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছিল, প্রধান উপদেষ্টা সেই নাম অনুমোদনও করেছিলেন। পোশাক বদলে জলপাই করার ঘোষণা এসেছিল। কার্যকর হয়নি কিছুই। প্রজ্ঞাপন আর জারি করা যায়নি। র্যাব সদস্যদের দায়মুক্তির ধারাটা আইন থেকে এখনো বাদ দেওয়া হয়নি। গুম কমিশন র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল, সেটা আমলে নেওয়া হয়নি। এই ইতিহাস সামনে রেখেই বর্তমান সরকারের ঘোষণাগুলো পড়তে হবে।
একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, র্যাব কী করবে আর কী করবে না, সেটার সীমানা কোথায় টানা হবে। এই মুহূর্তে র্যাব যেটা করছে সেটা অনেকটাই টহল-নির্ভর পুলিশি কার্যক্রম। পাড়ায় পাড়ায় টহল দেওয়া, চেকপোস্ট বসানো, এসব করে উপস্থিতি জানান দেওয়া। এই টহলের যে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব আছে মানুষের ওপর, সেটা গভীর। একটা কালো পোশাক পরা বাহিনীর গাড়ি পাড়ায় ঘুরতে থাকলে মানুষ নিজে থেকেই সন্ত্রস্ত হয়ে যায়। পুলিশের যে কাজ পুলিশ করতে পারে, সেটা র্যাব করলে বাহিনীটার কোনো বিশেষত্ব থাকে না।
র্যাব আসলে গঠিত হয়েছিল বিশেষ অপারেশনের জন্য। জঙ্গিদের ধরা, বড় সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ভাঙা, জটিল অপরাধ তদন্ত করা, যেসব জায়গায় সাধারণ পুলিশের সক্ষমতা কম। এই কাজটুকু বাদ দিলে র্যাবের দরকার নেই। তাই টহল কমাতে হবে, অপারেশন বাড়াতে হবে। অপারেশন মানে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যে যাওয়া, রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো বা রাস্তার পাশে নিরিবিলি বসে থাকা নয়।
মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন বলেছেন, সরকার যদি র্যাব রাখতেই চায়, তাহলে এটিকে শুধুমাত্র পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে একটি পেশাদার বিশেষ ইউনিট হিসেবে গড়তে হবে। এই কথাটার মধ্যে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। বর্তমানে র্যাবে সেনা, নৌ, বিমানবাহিনী, বিজিবিসহ অনেক বাহিনীর সদস্যরা আছেন। এই সামরিক উপস্থিতি বাহিনীটার মধ্যে একটা সামরিক মানসিকতা তৈরি করে। সন্ত্রাসীর সঙ্গে যুদ্ধের ভাষায় কথা বলা, নির্মূলের ভাষায় চিন্তা করা, এই সংস্কৃতিটা পুলিশি কাজের জন্য বিপজ্জনক। সামরিক সদস্যদের প্রভাব কমিয়ে বাহিনীটাকে সত্যিকারের পুলিশি চরিত্র দেওয়া দরকার। পুলিশ অপরাধী ধরে, মেরে ফেলে না।
আর দায়মুক্তির প্রশ্নটা সবচেয়ে জরুরি। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ তাদের ২০০৬ সালের রিপোর্টে লিখেছিল, র্যাব কর্তৃক নির্যাতন বা হত্যার জন্য একজন র্যাব সদস্যেরও ফৌজদারি সাজা হয়নি। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিচার হয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেটা ব্যতিক্রম, নিয়ম নয়। আজও র্যাব সদস্যদের দায়মুক্তির ধারাটা আইনে থাকলে নতুন আইন কতটা কাজ করবে সেটা নিয়ে সংশয় থাকে। নতুন আইনে এই ধারা থাকলে পুরো সংস্কারটাই প্রহসনে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা আছে।
আন্তর্জাতিক চাপটাও উপেক্ষা করার নয়। ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ গ্লোবাল ম্যাগনিটস্কি মানবাধিকার আইনের অধীনে র্যাবকে নিষেধাজ্ঞা দেয়। র্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালকসহ ছয়জন কর্মকর্তার সম্পদ জব্দ করা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা এখনো বহাল। ২০২৫ সালের জুনে জাতিসংঘের ওয়ার্কিং গ্রুপ র্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করে। ২০২৬ সালের মার্চে নয়টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে চিঠি দিয়ে র্যাব বিলুপ্তির আহ্বান জানিয়েছে। এতগুলো আন্তর্জাতিক কণ্ঠস্বর একই কথা বলছে। এটাকে পশ্চিমা রাজনীতি বলে উড়িয়ে দেওয়া সহজ, কিন্তু সঠিক নয়।
এখন প্রশ্ন হলো, র্যাব থাকবে কি থাকবে না?
আমার মত হলো, এখনই বিলুপ্তির দাবি না করাটাই বাস্তবসম্মত। কারণ বাংলাদেশে সন্ত্রাস দমনের জন্য বিশেষায়িত একটি বাহিনীর প্রয়োজন আছে। জঙ্গিবাদ, সংগঠিত অপরাধ, বড় মাদক চক্র, এগুলো মোকাবেলা করতে সাধারণ থানা পুলিশের সক্ষমতা যথেষ্ট নয়। র্যাব তার ইতিহাসে এই ধরনের কাজে সত্যিকারের সাফল্যও পেয়েছে। বাংলাভাই ধরা, জেএমবির নেটওয়ার্ক ভাঙা, সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করা, এই কাজগুলো অস্বীকার করার উপায় নেই। কিন্তু সাফল্যের পাশে যে গভীর অন্ধকারের ইতিহাস জমা হয়েছে সেটাও অস্বীকার করা যায় না।
তাহলে পথ হলো সংস্কার, তবে সত্যিকারের সংস্কার।
সেই সংস্কার মানে পোশাকের রঙ পাল্টানো নয়। সংস্কার মানে নতুন নাম দেওয়া নয়। এই দুটো কাজ করতে কোনো রাজনৈতিক সাহস লাগে না। সংস্কার মানে হলো, দায়মুক্তির ধারা বাতিল করা যাতে র্যাবের কোনো সদস্য অপরাধ করলে সেনাবাহিনীতে পাঠিয়ে দিয়ে রক্ষা করা না যায়, বরং বিচার হয়। সংস্কার মানে র্যাবের প্রতিটি অভিযানের তথ্য সংরক্ষণ এবং স্বাধীন তদারকির ব্যবস্থা রাখা। সংস্কার মানে বাহিনীতে সামরিক কর্মকর্তাদের প্রভাব কমিয়ে একটি সত্যিকারের পুলিশি ইউনিট তৈরি করা। সংস্কার মানে র্যাবকে টহল থেকে সরিয়ে অপারেশনে মনোযোগী করা।
আর সংস্কার মানে পোশাকটাও সাদা করা। শুধু প্রতীক হিসেবে নয়, একটা ঘোষণা হিসেবে। এই বাহিনী এখন থেকে আলোয় থাকবে, অন্ধকারে নয়। রাতে মানুষ তুলতে যাবে না, দিনে আদালতের পরোয়ানা নিয়ে যাবে। সাদা রঙটা সেই বার্তাটাই দেবে।
বাংলাদেশের মানুষ বেশ দীর্ঘ একটা পথ পেরিয়ে এসেছে। যারা গুম হয়ে গেছে তাদের স্বজনরা এখনও অপেক্ষায় আছে, এখনও জানে না লাশটা কোথায়। যারা ক্রসফায়ারে মরেছে তাদের পরিবার এখনও বলতে পারে না নিজের মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, বলতে হয় মারা গেছে। এই কষ্টগুলো একটা পোশাকের রঙ বদলে যাবে না, একটা নতুন আইনেও যাবে না। কিন্তু যদি সত্যিকারের সংস্কার হয়, যদি দায়মুক্তি শেষ হয়, যদি এই মাটিতে প্রতিষ্ঠিত হয় যে রাষ্ট্রের কোনো বাহিনী আইনের ঊর্ধে নয়, তাহলে হয়তো সেই মানুষগুলো না ফিরলেও তাদের মৃত্যু বা অন্তর্ধান একটা অর্থ পাবে।
সেই দিনটার অপেক্ষায় সাদা পোশাকের দাবিটা রইল।লেখক : সাংবাদিক
ঢাকা টাইমস অনলাইন এর সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি ফলো করুন













































